বড়াইগ্রামে তামাকে কমছে ধান-গম-রসুনের আবাদ

আপডেট: February 12, 2020, 1:25 am

বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি


আবাদ মৌসুমভেদে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠগুলোতে কখনও দোল খায় গম ও ধানের পাকা শীষ, মাঠ ঘেরা থাকে রসুনের সবুজ পাতায় । ধান, গম, রসুনসহ রবি ফসল উৎপাদনে বড়াইগ্রাম উপজেলায় অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান। তবে নায্যমূল্য না থাকায় কয়েক বছর ধারাবাহিক লোকসানের কারণে স্থানীয় কৃষকরা ধান-পাটের বদলে তামাক চাষ শুরু করছেন। তামাক চাষ করে এর বিঘা প্রতি খরচের প্রায় ১৫ গুণ মুনাফা তুলছেন চাষিরা। এতে অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন তামাক চাষে।
উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি, মৃধাকুচুয়া, রাজাপুর, নরগ ইউনিয়নের ধানাইদহ, পাঁচবাড়িয়া, দাঁড়িখৈর, নিতাইনগর গ্রামে রবি মৌসুমে তামাক চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিসম্পন্ন তামাক চাষ বন্ধে উপজেলা প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নিলেও মাঠ পর্যায়ে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তেমন সাড়া মিলছে না। তাছাড়া জনসচেতনতা সৃষ্টি করে তামাক চাষ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
চাষীরা বলছেন, তামাক চাষে তাদের উৎসাহের নেপথ্যে সিগারেট কোম্পানীগুলোর চাষ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিশেষ প্রণোদনা রয়েছে। যেখানে এক বিঘা জমিতে তামাক চাষে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানী চাষিদের বীজ ও সার ক্রয়ের জন্য নগদ ৪ হাজার টাকা ও উৎপাদিত তামাক নায্যমূল্যে চাষিদের বাড়ি থেকে ক্রয় করার নিশ্চয়তা দেয় সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রণোদনা তো দূরের কথা নায্যমূল্যে নিশ্চিতের ব্যবস্থাও নেই। তবে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস ও তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষক্রিয়ার ফলে পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাবসহ নিজেদের শ্বাসকষ্টজনিত অসুখের কথা স্বীকার করেছেন চাষিরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, বড়াইগ্রামে চলতি মৌসুমে (২০২০ সালে) ৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এর আগে, ২০১৯ ও ২০১৮ সালে ৪৫ হেক্টর এবং ২০১৭ সালে ৩৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। তবে দাফতরিক হিসাবের চেয়ে প্রকৃত পরিমান আরও বেশি হবে।
সম্প্রতি উপজেলার নিতাইনগর, দ্বাড়িকৈর, ধানাইদহ, পাঁচবাড়িয়া, গড়মাটি, রাজাপুর, মৃধাকচুয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধান, পেঁয়াজ বা গমের খেতের পাশাপাশি সারি সারি চাষ হচ্ছে তামাক। আর কয়েক সপ্তাহ পর থেকে তামাক পাতা কাটা ও পোড়ানোর কাজ শুরু হবে। তাই শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তামাক পাতা সংগ্রহের পর পোড়ানোর জন্য চাষিদের বাড়িতে চুল্লী তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। সময়মতো তামাক বুঝে নিতে পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছেন চুক্তিবদ্ধ তামাক কোম্পানীর প্রতিনিধিরা।
নিশ্চিত বিক্রি, বেশি মুনাফা ও ক্রেতা কোম্পানী প্রদত্ত প্রণোদনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বড়াইগ্রামের চাষিরা তামাক চাষ করছেন। খাদ্যশস্যের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারেও তামাক চাষের মুনাফা অনেকগুণ বেশি। এক বিঘা জমিতে ধানের আবাদে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। জমি থেকে প্রায় ২০ মন ধান পাওয়া যায় যার প্রতিমন ৮০০ টাকা দরে বর্তমান বাজারমূল্য ১৬ হাজার টাকা। অপরদিকে, এক বিঘা জমিতে তামাক উৎপাদনে ব্যয় হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। চুক্তিবদ্ধ কোম্পানী চাষিদের এই উৎপাদন ব্যয়ও আগাম প্রদান করে। একই জমিতে তামাক চাষ করলে বিঘাপ্রতি ৪০০ কেজি তামাক পাতা উৎপাদন সম্ভব যা বর্তমানে প্রতিকেজি ১৫৫ টাকা হিসেবে প্রায় ৬২ হাজার টাকা বাজারমূল্য। এক বিঘা জমিতে ধানের তুলনায় তামাক চাষ করলে ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত মুনাফা পাওয়া যায়।
গড়মাটি গ্রামের তামাক চাষি সাজেদুল ইসলাম চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তামাক চাষের সব খরচই কোম্পানী দেয়। আমরা শুধু শ্রম দিই। বাড়ি এসে নগদ টাকা দিয়ে তামাক কিনে নেয় কোম্পানি।’
তামাক চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যখন তামাকের কাঁচা পাতা গুলো গাঁথি তখন গন্ধে খারাপ লাগে। কিন্তু যেহেতু তামাকেই আমাদের জীবিকা, তাই মেনে নিতে হয়।’
চার বিঘা জমিতে তামাক চাষ করছেন চাষি সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, উপকরণ, শ্রমসহ নানা খরচ করেও ধানের দাম পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় ধান চাষ করা যায় না। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ধান চাষের লোকসান কিছুটা হলেও পূরণ সম্ভব তামাক দিয়ে।
পাট চাষি সমিতি নাটোর জেলা শাখার সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য পাচ্ছেনা। তাই ক্ষতিকর জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইকবাল আহমেদ বলেন, বিনা পুঁজিতে লাভ বেশি পাওয়ায় কৃষকেরা তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তামাক চাষে কৃষি ও কৃষকের ক্ষতি জেনেও নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ লক্ষ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।