বড়াইগ্রামে মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যায় লিখিত অভিযোগ নিয়ে অপমৃত্যু’র মামলা!

আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি


নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চান্দাই ইউনিয়নের গাড়ফা মৎসজীবী পাড়ার মাদরাসা ছাত্রী হালিমা খাতুনের (১২) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার রাত সাড়ে দশটায় গাড়ফা দাখিল মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। সে ওই মাদরাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
মাদরাসা ছাত্রী হালিমাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দাবি করে স্থানীয়রা লাদেন দেওয়ান (২৩) ও ছোটন মিয়াকে (১৯) দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সোমবার দুপুরে বড়াইগ্রাম থানায় লাদেন ও ছোটনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হালিমার বাবা হাসেন আলী। তবে অভিযোগের রিসিভ কপি দেয়নি পুলিশ। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসায় যাতায়াতের পথে হালিমাকে উত্যক্ত করতো বখাটে লাদেন দেওয়ান। এ বিষয়ে বারবার গ্রাম প্রধান ও লাদেনের পরিবারের কাছে বিচার দিয়েও কোন লাভ হয়নি। গত জুন মাসে লাদেনকে বিয়ে দেয় তার পরিবার। বিয়ের কয়েকমাস পর থেকে লাদেন আবারো হালিমাকে উত্যক্ত করা শুরু করে। সবশেষ গত রোববার সন্ধ্যারাতে লাদেন হালিমাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণের পর ছোটনের সহায়তায় হত্যা করে বটগাছে লাশ ঝুলিয়ে রাখে।
তবে পুলিশের দাবি, তারা কোন লিখিত অভিযোগ পাননি। তাই ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে ধরে ইউডি মামলা রেকর্ডভুক্ত করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে সপরিবারে পলাতক রয়েছে অভিযুক্ত লাদেন ও ছোটন।
হালিমার প্রতিবেশীরা জানান, হালিমাদের বাড়ি থেকে ত্রিমোহনী বিল যেখানে বটগাছে হালিমার মৃতদেহ ঝুলছিলো, তার দুরুত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার। বিলটি পানিতে ডুবে থাকায় নৌকা ছাড়া সেখানে যাবার উপায় নেই। যে বটগাছের ডালে মরদেহটি ঝুলে ছিলো তা মাটি থেকে ৬-৭ ফুট উচুঁ। হালিমা আত্মহত্যা করলে নিচে থেকে কোনভাবেই গাছের ডালের নাগাল পাওয়া সম্ভব না। ঘটনাস্থল থেকে আরো আধা কিলোমিটার দুরে গিয়ে পরিত্যক্ত একটি সেতুর এককোণে পাটের বস্তা ও রক্তের দাগের চিহ্ন রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হালিমার পরিবার।
হালিমার বাবা হাসেন আলী গত সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় জানান, তিনি থানায় গেলে একজন উপ-পরিদর্শক অভিযোগটি লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু কোন রিসিভ কপি ফেরত না দিয়ে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশের আচরণ রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
নিহত হালিমার বড় বোন রহিমা খাতুন জানান, মৃতদেহ গাছ থেকে নামানোর পর হালিমার সালোয়ারে রক্ত দেখা যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় হালিমাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।
হালিমার মা মোমেনা বেগম বলেন, হালিমা পড়াশোনায় ভাল ছিল। লাদেন তাকে প্রায়ই উত্যক্ত করলেও মাদরাসা ছাড়েনি সে। আমরা মেয়ের নিরাপত্তার জন্য অনেকবার গ্রামের মুরুব্বীদের বলেছি। তারা আমার মেয়ের জন্য কিছুই করতে পারেনি। চলে গেল মেয়েটা। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
হালিমার ফুফাতো ভাই স্থানীয় ১নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আনতাজুল ইসলাম বলেন, হালিমাকে হত্যার পর ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ হালিমাকে সেতুর উপর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে যার আলামত রয়েছে। আমরা পুলিশের রহস্যজনক আচরণে অবাক। ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আমাদের অভিযোগ গ্রহণ করছেনা পুলিশ। এছাড়া অভিযুক্তদের ধরতে এখনও পুলিশের দৃশ্যমান কোন তৎপরতা নেই।
বড়াইগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিলীপ কুমার দাস মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইল ফোনে বলেন, একজন অভিযোগ দিলেই তো হবে না। হালিমার লাশ ময়না তদন্তের সময় একজন এসআইকে উপস্থিত থেকে গুরুত্ব সহকারে কাজ করানোর জন্য বলেছি। ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পেলেই তা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা প্রমাণিত হবে। তিনি আরো বলেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা বা বড়কোন আঘাতে রক্তক্ষরণ হয়। তাই রক্ত দেখেই কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তাই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রতিবেদন পেতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে।
বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুন-অর-রশীদ জানান, যে কোন মৃত্যুর ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যদি ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া যায় তবে অপমৃত্যু মামলা হত্যা মামলায় রুপান্তর হবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনাটি দেখা হচ্ছে। এসময় তিনি আরো বলেন, আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনেছি প্রাথমিক ভাবে লাশ দেখে মনে হয়েছে এটা আত্মহত্যার ঘটনা। তার শরীরে জখমের কোন চিহ্ন নাই। তবু প্রকৃত সত্য জানতে ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।
উল্লেখ্য, হালিমা দীর্ঘদিন থেকে উত্যক্ত করে আসছিলো অভিযুক্ত লাদেন। গত রোববার সন্ধ্যার দিকে জরুরী কথা বলার নাম করে হালিমাকে বাড়ির বাইরে ডাকে লাদেন ও তার বন্ধু ছোটন। বাড়ির লোকজন কিছুক্ষণ তাদের কথাবার্তা শুনতে পেলেও একসময় তা থেমে যায়। তখন বাড়ির বাইরে গিয়ে হালিমাকে না পেয়ে খোঁজাখুজি শুরু করে তারা। ভোররাতে মাছ শিকারে যাবার পথে কয়েকজন জেলে বাড়ির অদূরে গাড়ফা ত্রিমোহনী বিলের মাঝে বটগাছে একটি মৃতদেহ ঝুলতে দেখে কাছে গিয়ে হালিমাকে সনাক্ত করে।