ভরসা এখন ছোট উদ্যোক্তারাই

আপডেট: জুলাই ১৭, ২০১৭, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


যেসব ব্যাংক বড় উদ্যোক্তাদের পেছনে না ছুটে ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়েছে, তারা ভালো আছে। আর বড় উদ্যোক্তাদের ঋণদাতা ব্যাংকগুলো এখন বিপদে পড়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণায় এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা আরও বলা হয়েছে, ঋণের টাকা পরিশোধে এগিয়ে রয়েছেন ছোট উদ্যোক্তারা। একইভাবে সব ব্যাংকের ছোট অংকের ঋণের আদায়ও সন্তোষজনক। বিআইবিএমের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বড় অংকের ঋণের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকও বড় গ্রাহকদের বদলে ছোট উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রাম বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কমপক্ষে ২০ শতাংশ ঋণ এসএমই খাতে বিতরণ করতে হবে। এছাড়া নির্দেশনায় মোট এসএমই ঋণের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করার কথা বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে এখন বেশি অবদান রাখছে। ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোও স্বস্তি পাচ্ছে। তিনি বলেন, ছোট উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ঋণের টাকা আদায় বেশ সন্তোষজনক হলেও বড় ঋণ ব্যাংকের জন্য অনেক সময় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে এসএমই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। আগের বছরের তুলনায় যা সাড়ে ২২ শতাংশ বেশি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় বলে এ খাতে ঋণ বাড়ানোর ওপর বেশি জোর দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সারাদেশের পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ২৯৯ প্রতিষ্ঠান এই ঋণ পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অর্থনীতির মূল শক্তি ছোট ছোট উদ্যোক্তারা। ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে একদিকে ব্যাংক স্বস্তি পায়, অন্যদিকে ছোট ছোট ব্যবসায়ীদেরকে সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যাংকখাত অর্থনীতির মূল জায়গায় উন্নতি আনছে। তিনি বলেন, বড় ব্যবসায়ীদের তুলনায় ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণ খেলাপি কম হয়। ফলে ব্যাংকের ছোট ঋণের বিপরীতে প্রভিশনও কম রাখতে হয়। ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলোর আদায়ও ভালো হয়। এসব কারণে অধিকাংশ ব্যাংকই এখন ছোট উদ্যোক্তাদের দিকে বেশি নজর দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও বলছে, ছোট উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে অর্থনীতিতে। গেল কয়েক বছর ধরে বড় শিল্প উদ্যোক্তারা যেখানে নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন, সেখানে ক্রমেই উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। ২০০৯ সালে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ১৯ শতাংশ ছিল এসএমই ঋণ। ২০১৫ সাল শেষে মোট ঋণের ২৪ শতাংশ ঋণ গেছে এসএমই খাতে।
এদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএই) খাতে বিতরণের নির্দেশনা বহাল রাখার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বেশি জোর দিতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া জাতীয় শিল্পনীতির আলোকে এসএমইর সংজ্ঞা ও ঋণ সীমা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সার্কুলারের মাধ্যমে জাতীয় শিল্পনীতির আলোকে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংজ্ঞা সংশোধন করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনও ব্যবসায় কী পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা যাবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণের অলস অর্থ কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে যাওয়া শুরু হয়েছে। আসন্ন নতুন মুদ্রানীতিতেও বিষয়টি উল্লেখ থাকতে পারে। এরই অংশ হিসাবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই বিভাগ মাস্টার সার্কুলারের পরিবর্তন এনেছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬ এ প্রদত্ত শিল্প ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞার আলোকে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংজ্ঞা পুনঃ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে গত মার্চ মাসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ঋণের খরচ কমাতে এর চার্জ নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো কোন নামে কী হারে চার্জ নিতে পারবে তা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এসএমই ঋণের আবেদন বাবদ সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ফি নেওয়া যাবে। এতদিন ব্যাংকগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো চার্জ বা মাসুল আরোপ করতো।-বাংলা ট্রিবিউন