ভরা মৌসুমে পদ্মায় মিলছে না ইলিশ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীর পদ্মায় ইলিশ না পাওয়ায় জেলেরা হতাশ-সোনার দেশ

এবার ভরা মৌসুমে রাজশাহীর পদ্মায় মিলছে না ইলিশ। ইলিশ শিকারে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। রাজশাহীর সংলগ্ন পদ্মা নদীসহ বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীর কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না ইলিশ।
মৎস্য কর্মকর্তারা বলেছেন, রাজশাহীর পদ্মায় কোনো অভায়াশ্রম নেই। তবে জলবায়ুর পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি ও নদীর গভীরতা কমে যাওয়া- ইত্যাদি কারণে কমেছে ইলিশের বিচরণ।
জানা গেছে, মূলত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইলিশের ভরা মৌসুম। এই সময় রাজশাহী সংলগ্ন পদ্মায় ইলিশ ধরা পড়ে। কিন্তু এ মৌসুমে জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ। ফলে ইলিশহীন মৌসুম কাটছে এই অঞ্চলের জেলেদের।
জেলেরা জানায়, প্রতিবছর এ সময়কে পদ্মায় ইলিশ ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এবছর তার উল্টো চিত্র। নদীতে জাল ফেলে দু’চারটার বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তাতে উঠছে না জেলে ও নৌকার খরচের টাকা। নগরীর শ্রীরামপুর এলাকা জেলে সাজু বলেন, এখন পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি পাওয়া যাচ্ছে বালিয়া ও চিংড়ি জাতের মাছ। মধ্য আশ্বিনের দিকে পাওয়া যাবে ইলিশ মাছ।
গতকাল রোববার দুপুরে বাঘার কালিদাশখালির চকরাজাপুর এলাকার দেখা যায়, পদ্মায় ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র’র ঘাটে নোঙর করা আছে ইলিশ শিকার করা নৌকাগুলো। নৌকায় ও আশে-পাশে বসে অলস সময় কাটাতে দেখে গেছে জেলেদের। জেলেরা জানায়, ‘এবছর বৃষ্টি কম। নদীতে তেমন স্রোত নেই। ইলিশ মূলত স্রোতের বিপরীতে উঠে আসা মাছ। নদীতে স্রোত না থাকায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।’
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলোক কুমার সাহা বলেন, রাজশাহীর পদ্মায় কোনো অভায়াশ্রম নেই। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা হয়েছে। গভীর নদী থেকে এই অঞ্চলে ইলিশ আসতে সময় লাগে। আগামি কিছুদিনের মধ্যে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়বে। তিনি বলেন, সম্ভবত আগামি ৯ অক্টোবর থেকে পরবর্তি ২২ দিন পদ্মায় মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হবে। এই সময় জেলেরা নদীতে কোনো প্রকারের মাছ শিকারে নামতে পারবে না। এছাড়া রাজশাহী জেলায় ১১ হাজার ৮০৭ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে মাছ শিকার বন্ধের সময় জেলেদের সরকারিভাবে অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এবছর মৎস্য অধিদফতরে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, মা ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রধান সময় হওয়ায় আগামী ৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। এই ২৩ দিন যে সমস্ত জায়গায় নিঝুম দ্বীপ, নদীর মোহনা, সমুদ্র মোহনায় ইলিশ মাছ পাওয়া যায়- সে সমস্ত এলাকায় এবং দেশের বিভিন্ন নদীতে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হবে। প্রধানত আশ্বিনের পূর্ণিমার চারদিন আগে এবং পূর্ণিমার পর ১৮ দিন পর্যন্ত সময়ে মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। যদিও আর সারা বছর ডিম ছাড়লেও এই সময়ে ৮০ শতাংশ ডিম ছাড়ে ইলিশ।
ইলিশ শিকার থেকে শুন্য হাতে ফিরেছেন বাঘার চকরাজাপুর চরের আবদুর রব খাঁ ও মহিদুল ইসলাম। তারা নৌকা নিয়ে পদ্মায় ইলিশ শিকারে গিয়েছিলেন। তারা জানায়, নদীতে দীর্ঘক্ষণ জাল ফেলে রেখেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। দু’চারটি ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ পাওয়া গেলেও তা আশানুরূপ নয়। গত বছর এই সময় জালে ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ পাওয়া গেছে। এবছর পরিশ্রম হচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে না মাছ।
এছাড়া আলাইপুর গ্রামের জেলে জহুরুল ইসলাম বলেন, মাছ ধরা আমার পেশা। এই মৌসুমে তেমন মাছ পাচ্ছি না। তিনি বলেন, বাড়িতে বৃদ্ধ-মাসহ ছয় সদস্যের পরিবার। মাছ না পাওয়ায় ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে। ভেবেছিলাম এই মৌসুমে মাছ বিক্রি করে তাদের টাকা পরিশোধ করবো। কিন্তু মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে সংসারে টানাপোড়েন অন্যদিকে ঋণের টাকার দায়। সবমিলে বেকায়দায় আছি। বাঘা উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৯৩৮ জন। এছাড়া চকরাজাপুরে ১২১ জন, মনিগ্রামে ৬০ জন, পাকুড়িয়ায় ৬০ জন, গড়গড়ি গ্রামে ৪০ জন ও বাঘার পৌর এলাকায় ৩০ জন জেলে রয়েছেন।
চকরাজাপুর চরের আফজাল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া নৌকায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে বেশ কিছু দিন ধরে নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আমার নিজের নৌকা নেই। নৌকা ভাড়া নিয়ে মাছ ধরতে আসি। কিন্তু মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নৌকার ভাড়াও দিতে পারছি না বেশ কিছু দিন ধরে।
বাঘা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ মৌসুমে পদ্মায় মাছের দেখা মিলছে না। আশা করছি আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে জেলেরা পদ্মায় ইলিশ মাছ পাবে।
এদিকে চারঘাট প্রতিনিধি জানান, ভরা মৌসুমে রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীতে নেই ইলিশ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মা নদীতে পাওয়া যাচ্ছে না ইলিশ। উপজেলার রাওথা ও টাঙ্গন এলাকায় জেলে বেলাল হোসেন বলেন, ভরা মৌসুমে রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীতে যমুনার ভাটি থেকে উজান মাছ না আসায় তারা অলস সময় পার করছেন। কোনো মাছ ধরা পড়ছে না।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, এবার ৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ। আবহাওয়ার অনুকূলে ও বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদীতে মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ