ভারতের বিপক্ষে চিন্তা ছিল, সুযোগ পেলে ছাড়বো না : হাবিবুল বাশার

আপডেট: মে ২২, ২০১৯, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আরিফুর রহমান বাবু


২০০৭ সালে সেরা আটে জায়গা করে নেয়া। আর গতবার মানে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টারফাইনাল খেলেছিল টিম বাংলাদেশ। কোনটা বড়। সাফল্যের মানদন্ডে কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন আপনি? একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আগের বার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাতেই এগিয়ে রাখেন।
তাদের মাথায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাটাই বড় হয়ে আছে। কিন্তু তারা ভাবেন না, মাথায় আনেন না আসলে ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’ আর সেরা আটের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। খালি চোখে মনে হয় কোয়ার্টার ফাইনাল হলো সেমিফাইনালের ঠিক আগের ধাপ। মানে ঐ কোয়ার্টারের প্রাচির টপকাতে পারলেই সেমির দেখা মেলে। সে কারণেই কোয়ার্টার ফাইনালকে আপাতঃদৃষ্টিতে একটু বড় মনে হয়। সেটা আসলে ফরম্যাটের কারনে। কিন্তু এমনিতে সেরা আট বা সুপার এইটের সাথে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার কোনই ফারাক বা পার্থক্য নেই।
সেই আলোকে বিচার করলে বাংলাদেশ ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের পারফরমেন্স, প্রাপ্তি-অর্জন আর অবস্থান- কোনটাই কম ছিল না। বরং সেবারও দারুণ উজ্জিবীত ও মাঠ অলোকিত করা ক্রিকেট উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবারই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একবার ফেবারিটের তকমা গায়ে থাকা দুই দলকে একই আসরে হারিয়ে হই চই ফেলে দিয়েছিল হাবিবুল বাশারের দল।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে গা গরমের ম্যাচে অন্যতম ফেবারিট এবং ওই সময়ের খুব সফল ও আলোচিত দল নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল বাংলাদেশ। এরপর মূল আসরে মাঠে নেমে প্রথম দিনই শচিন, শেবাগ, সৌরভ, দ্রাবিড়, যুবরাজ ও ধোনির ভারতের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল হাবিবুল বাশারের দল।
আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট যে পাঁচ স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর তিন ‘পান্ডব’ তামিম, সাকিব ও মুশফিকের সেটাই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ। প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ভারতের বিপক্ষে একসাথে তামিম , সাকিব আর মুশফিক হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে শুধু ক্রিকেট বিশ্বকে চমকেই দেননি, নিজেদের আগমনি বার্তাও দিয়েছিলেন। আমরা এসেছি সব অন্ধকার দুর করে দলকে আলোয় পৌঁছে দিতে।
মাশরাফির বিশ্বকাপের সেরা বোলিং ফিগার (৪/৩৮) আর দুই বাঁ-হাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক (৩/৩৮) ও মোহাম্মদ রফিকের (৩/৩৫) সাঁড়াসি বোলিংয়ে ভারতের বিশ্বসেরা ব্যাটিংকে দু’শোর নিচে মাত্র ১৯১ রানে বেঁধে ফেলে টাইগাররা। আর তারপর তিন তরুণ তামিমের (৫৩ বলে ৫১) ঝড়ো সূচনা, মাঝে সাকিব আল হাসানের (৮৬ বলে ৫৩ রান) সাবলিল ব্যাটিং এবং মুশফিকের দুর্দান্ত ফিনিশিং (১০৭ বলে ৫৬)- সব মিলে রাহুল দ্রাবিড়ের ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ে সারা ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন জাগিয়ে তোলা।
সেটাই শেষ নয়। তারপর সেরা আটে গিয়ে আবার আসরের হট ফেবারিট এবং তখনকার র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে আবার হই চই ফেলে দেয়া। তারপরও সেরা আটে গিয়ে মোহাম্মদ আশরাফুলের বিশ্বকাপের সেরা ইনিংস (৮৩ বলে ৮৭), তামিম (৫৯ বলে ৩৮), আফতাব (৪৩ বলে ৩৫) আর মাশরাফির ব্যাটিং নৈপুণ্য (১৬ বলে ২৫) এবং সৈয়দ রাসেল (২/৪১), রাজ্জাক (৩/২৫), রফিক (১/২২) আর সাকিবের (২/৪৯) সাঁড়াসি বোলিংয়ে প্রোটিয়াদের ৬৭ রানের বড় ব্যবধানে হারানোর মধ্য দিয়ে সাফল্যর ষোলকলা হয় পরিপূর্ণ।
ইতিহাস পরিষ্কার জানাচ্ছে সেই ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৫- পাঁচবারের অংশগ্রহণে শুধুমাত্র ওই একবার মানে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপেই এই টাইগাররা দু’দুটি বিশ্বমানের দল বা পরাশক্তির বিপক্ষে জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে। এছাড়া ১৯৯৯’এ পাকিস্তান, ২০১১ সালে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড এবং ২০১৫ সালে শুধু ইংলিশদের হারানোর রেকর্ড আছে।
ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার মত সেরা চারের দুই দলকে সর্বক্ষণ চাপে রেখে পুরো সময় কর্তৃত্ব ও প্রভাব খাটিয়ে অনায়াসে হারিয়ে বিশ্বে তোলপাড় করার পিছনের গল্প কি? তিন তরুণ তুর্কি তামিম, সাকিব ও মুশফিকের একসাথে বিশ্বকাপ আবির্ভাবে জ্বলে ওঠার কাহিনীটাই বা কি?
পাশাপাশি সেই দারুণ বিশ্বকাপ মিশনের যিনি সফল অধিনায়ক, সেই হাবিবুল বাশার সুমন ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে কি ভাবেন, পুরো আসরে দলের দুর্দান্ত পারফরমেন্স, দারুণ প্রাপ্তি, অর্জন আর তার নিজের অনুজ্জ্বল ব্যাটিং পারফরমেন্স সম্পর্কে কি ভাবেন? তার মূল্যায়নই বা কি?
জাগোনিউজ : সাফল্যের বিচারে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ২০১৫ সালের বিশ্বকাপকেই এগিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ভয়াবহ ভরাডুবির পর ২০০৭ সালে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়ে প্রথমবার সেরা আটে জায়গা করে নেয়া। একজন অধিনায়ক হিসেবে আপনি এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এমন সাফল্যের পেছনের রহস্যটা কী ?
হাবিবুল বাশার : ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে তো আসলে বলার কিছু নেই। ভয়াবহ খারাপ কেটেছে। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের কথা বললে, আমরা সে বিশ্বকাপের আগে অনেকগুলো ম্যাচ জিতেছিলাম। অনেক বেশি সিরিজ খেলা হয়েছে, ম্যাচ জিতেছি। তখন কেনিয়া, স্কটল্যান্ডের মতো নন টেস্ট প্লেয়িং দেশগুলোর সঙ্গে অনেক খেলেছি।
তখন কথা উঠেছিল যে, আমরা শুধু দুর্বল দলের বিপক্ষে খেলে খেলে জিতেছি। কিন্তু যত যাই বলা হোক না কেন, শক্তি ও সামর্থ্যে কম দলগুলোর বিপক্ষে জয়টাও আমাদের অনেক উপকার করেছিল। তাদের হারাতে হারাতে একটানা জেতার অভ্যাস জন্মেছিল আমদের। সেটাই পরবর্তীতে বিশ্বকাপের মত আসরে আমাদের অনেক সাহায্য করেছে।
সে বিশ্বকাপের আগে আমরা অনেক ম্যাচ জিতেছি। তো ব্যাপারটা হয়েছে যে টানা জয়ের ফলে নিজেদের মধ্যেই একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, আমরাও ভালো খেলতে পারি। ফল আমাদের পক্ষে রাখতে পারি। এছাড়া ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতেও কিন্তু আমরা বড় দলকে (ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬ উইকেটের জয়) হারিয়েছিলাম। ২০০৬ সালে আমরা নিয়মিতভাবে যে ম্যাচগুলো জিতেছিলাম, সেগুলোই আমাদের সাহস দিয়েছে, অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
আবার মনে করে দেখেন, ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচেও আমরা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছিলাম। সে জয়টা আমাদের খুব বড় বুস্টআপ ছিলো। সে বিশ্বকাপের বিচারে ওরা (নিউজিল্যান্ড) কিন্তু বেশ ভালো দল ছিল। সবাই ওদের অনেক হাই রেট করেছিল তখন। তো আমরা যখন ওদের বিপক্ষে গা গরমের ম্যাচ জিতলাম, তখন সবার মধ্যেই একটা বিশ্বাস চলে আসে যে, বাংলাদেশ যে কোন বড় দলকেও হারাতে পারে।
জাগোনিউজ : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সে প্রস্তুতি ম্যাচে জয়ের পর শিরোনাম হয়েছিল ‘গা গরমের ম্যাচে বিশ্বকাপের বাজার গরম করলো বাংলাদেশ।’ ওই ম্যাচে তামিম, মুশফিক, সাকিবের মতো নবীনদের উঠিয়ে আনা, একঝাঁক তরুণদের সামনে নিয়ে আসা এবং বাজিমাত করা- এটার পেছনের গল্পটা কি?
হাবিবুল বাশার : ক্যাপ্টেনসি কেমন করেছি, কীভাবে করেছি তা তো সবাই দেখেছেনই। তবে আমার মনে হয় সে সময় আমি দলের মধ্যে খুব ভালো একটা পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলাম। সবাই তখন খুব নির্ভার থাকতো এবং নিজেদের সঙ্গটা খুব উপভোগ করতো। নতুন যারা ছিলো তাদেরকেও আমরা বড়রা সাহায্য করতাম, সবাই মিলে একসাথে পরিবারের মতো থাকার বিষয়টা ছিলো পুরো সফরে।
একটা নতুন জায়গায় গেলে হয় না যে, কোথায় আসলাম, কীভাবে থাকবো, কী হবে? আমাদের মধ্যে তখন এটা একদমই ছিলো না। আমরা একসাথে খেতাম, ঘুরতাম, অনুশীলন করতাম, আড্ডা মারতাম, নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতাম। একটা দারুণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। যেখানে সবার জন্য সবাই উজাড় করে দিতাম। সবাই সবার সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিয়েছিলাম।
সেবারের বিশ্বকাপে তো আমরা প্রায় ২ মাসের বেশি সময় দেশের বাইরে ছিলাম। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজে যোগাযোগের ব্যবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। বাইরের কিছুর সঙ্গে আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না। অন্যসব দেশে গেলে দেখা যায়, বাঙালি পাওয়া যায় অনেক; কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজে তেমন একদমই ছিল না, কিচ্ছু নেই।
তবুও আপনি সে দলের যে কাউকে জিজ্ঞেস করেন, সবাই বলবে যে ওই আড়াই মাসের সফরটা তাদের অন্যতম সেরা ছিল। হয়তো অনেকেই আপনাকে বলেছেও যে, ২০০৭ সালের বিশ্বকাপটা তারা অনেক উপভোগ করেছে। এর পেছনে কারণ একটাই, তখন আমাদের দলের পরিবেশটাই তেমন ছিল। তবে তাই বলে যে আলাদা কিছু করা হয়েছিল- এমন নয় কিন্তু। সবাই সবার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, নিজেদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। এটাই আসলে অনেক ইমপ্যাক্ট ফেলেছিল দলের ওপর।
জাগোনিউজ : এটা তো গেলো মাঠের বাইরের কথা। যদি মাঠের খেলায় নজর দেই…!
হাবিবুল বাশার : মাঠের কথা যদি বলেন, তখন দলে কিছু নতুন খেলোয়াড় এসেছিল। তামিম, মুশফিক, সাকিব- ওরা এসেছিল দুটো জিনিস নিয়ে। প্রথমত হলো তারুণ্যের যে শক্তিটা প্রয়োজন হয়, ওরা সেটা দিয়েছিল দলে। পরে আপনার, আমাদের দলে তখন যে পারফরম্যান্সের প্রয়োজন ছিলো, ওরা তিনজন ঠিক সেটাই দিয়েছে দলকে।
তামিম আসার আগে শুরুর ১৫ ওভারের সুবিধা নেয়ার জন্য আমরা মাঝেমাঝে আফতাবকে ব্যবহার করতাম; কিন্তু তামিম আসায় আমাদের ওপেনিংয়েই সে কাজটা হয়ে যেত। আবার উইকেটরক্ষক হিসেবে আমাদের তখন পাইলট (খালেদ মাসুদ) ছিল, তবে আমাদের দরকার ছিলো অলরাউন্ডার অর্থাৎ ব্যাটেও সমান পারদর্শী। সেদিক থেকে ব্যাটিংয়ে মুশফিক এগিয়ে ছিলো তখন। আর সাকিব তো পিউর অলরাউন্ডার। যদিও ব্যাটিংটাই বেশি ছিল তখন, তবে সাথে বোলিংও করতো।
এছাড়া দলে রফিক ছিল, আশরাফুল ভালো খেলছে, রাজ্জাক ছিল। মাশরাফি তখন তুখোড় ফর্মে। সবমিলিয়ে দলটা তখন দারুণ শেপে, সবাই নিজের রোলটা বুঝতো এবং সে অনুযায়ী ডেলিভারি করেছে সময়মতো।
জাগো নিউজ : ভারতের সঙ্গে ম্যাচের সময় যখন টস করলেন, ফিল্ডিংয়ে নামলেন- তখন ওই ম্যাচের লক্ষ্যটা কি ছিল? মানে তখন আপনি নিজে কী ভাবছিলেন?
হাবিবুল বাশার : সে ম্যাচে আমরা নামার সময়ই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। বললাম না, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিতে আমাদের মধ্যে সাহস চলে এসেছিল, সেটিই ভারতের বিপক্ষে কাজে লেগেছিল। আমাদের বর্তমান দল এখন মানসিকভাবে যতোটা এগিয়ে থাকে, তখন ততোটা না হলেও আমরা বিশ্বাস করতাম, যেদিন ভালো খেলবো সেদিন যে কোনো দলকেই হারাতে পারবো। আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সে জয়টা আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ভারত তখন খুব বড় দল, সব লিজেন্ড তখন ওদের দলে; কিন্তু ওদের বিপক্ষে নামার আগে হারার চিন্তাটা আমাদের মনে ছিলো না। এমন না যে, আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে জিতবো। তবে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসটা ছিলো যে, আমরা ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সুযোগটা পেলে সেটা হাতছাড়া করবো না। ম্যাচের আগে সবার মধ্যে এই বিশ্বাসটা ছিল। আর সে বিশ্বকাপের ফরম্যাটটাই এমন ছিলো যে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটা ভালো না করলে পরের যাত্রা অনেক কঠিন হয়ে যেত। আমি জানি না, এর আসল ব্যাখ্যা কি? তবে সেদিন সত্যিই সবাই বেশ কনফিডেন্ট ছিলাম।
জাগোনিউজ : সে ম্যাচে ভারতকে ১৯১ রানে আটকে ফেলার পর ড্রেসিংরুমে আপনার বার্তাটা কী ছিল?
হাবিবুল বাশার : (এক মুহূর্ত সময় নিয়ে) তেমন বিশেষ কিছু নয়। এমন ১৯০ রান আমাদের তাড়া করার সামর্থ্য ছিলো। যদি ৫০ ওভার খেলতে পারি তাহলে জেতাটা কঠিন হবে না। তখন আমাদের পরিকল্পনা ছিলো যে, স্বাভাবিক ব্যাটিংটাই করবো। অনেক সময় হয় না যে ১৯০-২০০ রানের টার্গেটে ব্যাটিংটা ঠিক পরিকল্পনামাফিক হয় না। আমরা সে ঝুঁকিটা নিতে চাইনি।
আমরা সে ম্যাচেও তামিম-আফতাবকে দিয়ে প্রথম ১৫ ওভারের পাওয়ার প্লে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিলাম। তো আমাদের পরিকল্পনাটা ছিলো, শুরুতেই ধাক্কা দিবো ওদের। আমরা যদি ৫০ ওভার খেলে ম্যাচ শেষ করার কথা ভাবতাম, তাহলে হয়তো ভারতের পক্ষে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগটা থাকতো। তখন তামিম যে শুরুটা এনে দিয়েছিল, তা খুব কাজে দিয়েছে। সেখান থেকে ভারতের পক্ষে ম্যাচে ফেরত আসাটা সম্ভব হয়নি।
জাগোনিউজ : এক ম্যাচ নিয়েই অনেক কথা হচ্ছে। আরেকটা কথা বলুন, সে ম্যাচে মাঠে কিংবা ড্রেসিং রুমে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
হাবিবুল বাশার : সেরকম কিছু না। তবে শুরুটা করেছিল মাশরাফি। প্রথমেই (বিরেন্দর) শেবাগকে বোল্ড করে দিল। নতুন বলে উইকেট পাওয়ার পর পুরনো বলেও সে (মাশরাফি) ভালো করেছিল। আবার স্পিনারদের কাছ থেকে যখন উইকেট চেয়েছি তখন রফিক, রাজ (আব্দুর রাজ্জাক) সময়মতো উইকেট দিয়েছে। সাকিবও ছিলো। তবে ও কিন্তু তখন আমার থার্ড স্পিনার। রফিক আর রাজই সে ম্যাচে অনেক ভালো বল করেছিল।
জাগোনিউজ : সব অধিনায়কই আসলে একটা বিশেষ কিছু রাখে নিজের দলে। আপনার দলে যে তিন বাঁ-হাতি স্পিনার (রফিক, রাজ্জাক ও সাকিব) নিয়ে খেলার দৃঢ় পদক্ষেপ, এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
হাবিবুল বাশার : তিন বাঁ-হাতি স্পিনার খেলানোর পেছনে আলাদা কোনো কারণ ছিলো না। ওরা তিনজনই তখন আমাদের সেরা তিন স্পিনার। আপনি যেটা বললেন, তখন আমাদের তেমন ভালো অফস্পিনার ছিলো না সত্যিই। তবু আমার দলের তিন বাঁ-হাতি স্পিনারই সেরা ছিলো তখন। আর সাকিব তো মূলতঃ ছিলো ব্যাটসম্যান হিসেবে। সে তখন এমন একজন ছিলো যে আসলে ব্যাটসম্যান, তবে বোলিংটাও পারে দারুণ।
সত্যি বললে আমি সাকিবের সেই ব্যাটিংটা এখনো মিস করি। আমি তো ওর শুরু দেখেছি। সন্দেহ নেই এখনো সাকিব অনেক ভালো ব্যাটিং করে; কিন্তু তখন যে ও ব্যাটিং করতো সেটা অন্য পর্যায়ের ছিলো। তখন সাকিব সোজা ব্যাটে খেলতো অনেক, উইকেটের সামনের দিকে। আমি ওর শুরু থেকেই দেখেছি তো! তখনের ব্যাটিংটা আমি আসলেই অনেক মিস করি। তখন সে ছিলো মূলতঃ ব্যাটসম্যান, যে বল হাতেও ভালো অবদান রাখতে পারত।
সে সময় রফিক এবং রাজ্জাক ছিলো বাংলাদেশের সেরা স্পিনার। তাই একাদশে একজন অফস্পিনার না থাকলেও আসলে সমস্যা হতো না। আমার মাথায়ও এমন কিছু ছিলো না যে ভ্যারিয়েশন লাগবে, অফস্পিনার নিতে হবে। অফস্পিনার নেয়ার কথা আমি ভাবিইনি। কারণ আমার দলের ওরাই ছিলো তখন দেশের তিন সেরা স্পিনার।
জাগোনিউজ : ভারতের বিপক্ষে জয়ের পাঠ শেষ। সুপার এইটে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালেন, সে ম্যাচের ব্যাপারে শুনতে চাই।
হাবিবুল বাশার : আমি সবসময় অনুভব করি, সেবার সুপার এইটে আমরা একটা ম্যাচ জিতেছি, তবে আরও অন্তত ২টি ম্যাচ জিততে পারতাম আমরা। আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড অথবা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো উচিত ছিলো আমাদের। সুপার এইটে আমাদের বেশিরভাগ খেলা পড়ে বার্বাডোজে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সবচেয়ে বেশি বাউন্সি ও ফাস্ট উইকেট সে মাঠে। যদি ত্রিনিদাদ কিংবা গায়ানাতে ম্যাচ পড়তো, আমাদের সম্ভাবনা বেড়ে যেত। আরও বেশি ম্যাচ জিততে পারতাম।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটা শুধু জিতেছি। তবে আমরা কিন্তু সুপার এইটে খারাপ খেলিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ভালো খেলেছি, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্লোজ ম্যাচ ছিলো। তবে গায়ানায় স্লো উইকেট পেয়েছিলাম, তাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সহজেই জিতে গেছি। সে মাঠে আমাদের বেশি খেলা পড়লে আমরা অন্তত ২টা ম্যাচ বেশি জিততাম।
জাগোনিউজ : আপনি যেটা বললেন, বার্বাডোজে কন্ডিশন আমাদের পক্ষে ছিলো না। এমন অবস্থায় দলের মধ্যে বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে আমরা যে কোনো দিন যে কারো বিপক্ষে জিততে পারি। এক্ষেত্রে আপনার ভূমিকাটা ঠিক কেমন ছিল?
হাবিবুল বাশার : এখানে ব্যাপারটা হলো যে, আমি আমার দলে শক্তি এবং দুর্বলতাটা বেশ ভালোভাবে বুঝতাম। এটা আসলে সব ক্যাপ্টেনকেই বুঝতে হবে যে আপনার শক্তির জায়গা কোনটা, দুর্বল জায়গা কোনটা। দলের সবার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ছিলো বেশ ভালো। হোটেল রুমে আমার দরজা সবসময় খোলা থাকত। যে কেউ যখন খুশি এসে কথা বলতে পারতো। কারো কোনো সমস্যা হলে আমার সাথে আলোচনা করে নিত। তবে কঠিন কিছু নয়। আমি নিশ্চিত করেছিলাম যে দলের পরিবেশটা যাতে ভালো থাকে, কেউ যাতে নিজের ব্যাপারে জড়তা না রাখে।
জাগোনিউজ : এখন কোন প্রশ্ন আসবে তা হয়তো অনুমান করতে পারছেন। জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে-টেস্টে যে খেলোয়াড় সবসময় রান করতেন, সে হাবিবুল বাশার সুমন বিশ্বকাপে কেমন যেন খোলসে ঢুকে পড়লেন। ব্যাটটা তেমন কথা বলেনি। দল ভালো করছে, আপনি রান পাননি। এটা কতটা যন্ত্রণার, কষ্টের বা দুঃখের ছিল?
হাবিবুল বাশার : ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় পারফরম্যান্সকে এগিয়ে রাখি। রান না করতে পারলে আমার ভালো লাগত না। কাউকে হয়তো বুঝতে দিতাম না। কিন্তু নিজে রান করতে না পারলে আমার ভীষণ কষ্ট লাগত। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দ বা ভালো লাগার বিষয় হলো ব্যাটিং করাটা। সেই ব্যাট করতে নেমে রান করছিলাম না। খারাপ লাগছিল অবশ্যই।
সে বিশ্বকাপে রান পাওয়াটা কষ্টদায়ক ছিলো তবে তখন একটা জিনিস মনে হতো যে, আমি যদি সেখানে কিছু রান করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমরা আরও ম্যাচ জিতে যেতাম। তবে আমি রান না পেলেও যে কষ্ট পেতাম, সেটা কাউকে বুঝতে দিতাম না। আমার যন্ত্রণা নিজের ভেতরে রেখে দিতাম যাতে দলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
তখন দল ভালো খেলায় আসলে আমার দুঃখ কম লাগছিল, মনে হচ্ছিলো যে দল তো ভালো করছে। খুব আপসেটিং ছিল। খুব খারাপ লাগতো; কিন্তু আমি সে যন্ত্রনা যতটা সম্ভব সযতেœ লুকিয়ে আর ঢেকে রাখতাম, যাতে কেউ বুঝতে না পারে।
জাগোনিউজ : ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে একঝাঁক তরুণ নিয়ে সাফল্যের বন্দরে তরি ভেড়ানোর পরও অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের যাত্রা আর দীর্ঘায়িত হয়নি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার অধিনায়কত্ব চলে গিয়েছিল। সেটা কতটা দুঃখের, যন্ত্রনা আর কষ্টের ছিল? আপনার কি মনে হয় না, একটু তড়িঘড়ি করেই অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে আপনাকে? কোন আক্ষেপে পোড়ায় কি না এ বিষয়টা?
হাবিবুল বাশার : সত্যি কথা বলতে কি ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে আমি দলকে অনুপ্রাণিত করতে, চাঙ্গা রাখতে এবং মাঠে সবার সামর্থ্যের সেরাটা বের করে আনতে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। হ্যাঁ, হয়ত আমি নিজে রান পাইনি। কিন্তু দলতো খুব ভাল খেলছিল। আর সে কারণেই সত্যিকার ক্রিকেট বিশ্লেষক, সমালোচকরা কিন্তু সেভাবে আমার কোন সমালোচনা করেননি।
আমার এখনো মনে আছে, ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের শেষাংশে বার্বাডোজে ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ ১০-১৫ জনের একটি বিদেশি সাংবাদিক বহর আমার ইন্টারভিউ করেছিল। সেখানে তাদের মূল জিজ্ঞাসাই ছিল, ‘আপনার অধিনায়কত্বে দল এত ভাল খেলছে, এ ভাল খেলার পেছনের কাহিনী কি? আমার নেতৃত্ব গুণের সত্যিকার উপকরণ কি? আমি কিভাবে মাঠে সফল নেতৃত্ব দিচ্ছি? এর পিছনের কাহিনীই বা কি?
কিন্তু একই সময়ে দেশে আমার গোষ্টি উদ্ধার পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আমি যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রশংসা ধন্য, ঠিক তখন আমার দেশে আমার সমালোচনা ও বক্র কথাবার্তার ঝড়!
কাজেই মনোকষ্ট বলবো না। তবে একটা চাপা বা অস্ফুট আক্ষেপ কিছুটা আছে। তা যন্ত্রনার কাঁটা হয়ে প্রতিনিয়ত বিধে বা রক্তক্ষরণ হয়- তা নয়। তবে একটা চাপা খারাপ লাগা আছে। আসলে বিশ্বকাপের পরের সময়টায়ও কিন্তু আমরা খুব খারাপ খেলিনি। আমি এখনো মনে করি আরও কিছু দিন দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে ভাল হতো।
ঠিক নিজের অধিনায়কত্বের ক্যারিয়ারের শেষটা অন্যরকম হতো কিংবা বিদায়টা আরও সন্মানজনক হতো- সেই চিন্তায় বলছি না। আমার মনে হয় দলে যেহেতু এক ঝাঁক তরুণ উদীয়মান ও নবীন ক্রিকেটারের সংখ্যা তখন বেশি ছিল। তাদের সাথে আমার বোঝাপড়া আর রসায়নটাও ছিল বেশ ভাল। তাই আমি আর এক বছর বলবো না, আর মাস ছয় মাস যদি অধিনায়ক থাকতে পারতাম, তাহলে দলের জন্য ভাল হতো। কারণ কয়েকজন অমিত সম্ভাবনাময় তরুণের তখন সবে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। আমি যদি তাদের সাথে বিশ্বকাপের পরে আর মাস ছয়েক থাকতে পারতাম, তাহলে ওদের জন্য ভাল হতো।’