ভারতে হিন্দুত্ববাদ বিরোধী সাংবাদিক খুন

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

কলকাতা থেকে দীপঙ্কর দাশগুপ্ত


শত চেষ্টা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদীদের ফ্যাসিস্ট কাজকর্মের প্রতিবাদ বন্ধ হচ্ছে না। এবার তাই যুক্তিবাদী সাংবাদিককে খুন করে গোটা দেশের কাছে বার্তা পাঠাতে চাইলো হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের আক্রমণে প্রাণ গেলো বাঙ্গালোরের নির্ভীক সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুত্ব নীতির কট্টর বিরোধী এই সাংবাদিককে মঙ্গলবার রাত আটটা নাগাদ তার বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামামাত্র অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতিরা গুলি চালিয়ে তাঁকে মেরে ফেলে। তাঁকে তিনটি গুলি করা হয় বলে খবর। ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। গোবিন্দ প্রানেসর, এমএম কালবর্গি এবং নরেন্দ্র দাভোলকারের পর আরো একজন নির্ভীক যুক্তিবাদী ও কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিরোধী মানুষকে হুমকি দিয়ে থামাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হত্যা করে স্তুব্ধ করতে হল। একসময় তিনি লিখেছিলেন, ‘ভারতের একজন নাগরিক হিসাবে আমি বিজেপির ফ্যাসিস্ট এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করছি। হিন্দু ধর্ম নিয়ে বিজেপির ভুল ব্যাখ্যার বিরোধিতা করছি।’ এ হেন গৌরীকে আগেই হিন্দুত্ববাদীরা সাবধান করে দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি শোনেননি। উল্লেখ্য কর্মজীবনের গোড়ায় গৌরী কলকাতার আনন্দবাজর গোষ্ঠির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গৌরীর বাবা প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক পিলঙ্কেশ ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’ নামে একটি কন্ড ভাষার সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। গৌরী সেই পত্রিকাটিকেই দেখভাল করতেন। তিনি কর্নাটকের কংগ্রেস সরকারের একটি কমিটিরও সদস্য ছিলেন। ওই কমিটির কাজ নকশালপন্থীদের বুঝিয়ে সুজিয়ে আত্মসমর্পণ করানো ও তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। এমনিতে মিষ্টভাষী হিসাবে পরিচিত নারী সাংবাদিক গৌরীর লেখনি কিন্তু কোনো কিছুর সঙ্গে কখনো আপোষ করেনি। বিভিন্ন সময় তিনি আরএসএস বিজেপির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় প্রতিবেদন লিখেছিলেন। তার এই মতাদর্শগত অবস্থানের জেরে বারেবারে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। কন্ড ও ইংরেজি দুটি ভাষাতেই তিনি দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কলম লিখতেন।
বাঙ্গালোরের পুলিশ কমিশনার টি সুনীল কুমার জানিয়েছেন, মোটর সাইকেলে করে চারজন অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতি ঘটনাস্থলে আসে। তারা গৌরীকে লক্ষ্য করে আচমকা গুলি চালাতে শুরু করে। কোনোটা তার গলায়, কোনোটা পেটে, কোনোটা ঘাড়ে লাগে। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র বিশাল পুলিশ বাহিনী গিয়ে সমস্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। বাঙ্গোলোরের এক টিভি চ্যানেলে গৌরীর এক বন্ধু জানিয়েছেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন। তারপর বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছেই পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে গেট খোলা মাত্র গা ঢাকা দিয়ে থাকা দুষ্কৃতিরা তাকে কাছ থেকে গুলি করে।
বছর দুয়েক আগে ঠিক এভাবেই খুন হতে হয়েছিলো কর্ণাটক বিশ্যবিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য যুক্তিবাদী এম এম কালবর্গিকে। পরে সোশাল মিডিয়ার উগ্র হিন্দুত্বপন্থীরা এই নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। বিশিষ্ট কন্ড লেখক ইউ আর অনন্তমূর্তিকেও হিন্দুত্ববাদীরা একসময় খুনের হুমকি দিয়েছেলো। গৌরী একসময় মোদিভক্তদের আক্রমণ করে লিখেছিলেন, ‘কর্ণাটকে আমরা এমন একটা সময়ে রয়েছি যখন মোদিভক্ত ও হিন্দুত্ব ব্রিগেড হত্যাকাণ্ডকেও স্বাগত জানাচ্ছে। এমএম কালবর্গির হত্যাকাণ্ডে ও ইউআর অনন্তমূর্তির মৃত্যুতে উৎসব করছে। এরা যে কোনো উপায় আমাকেও চুপ করাবে।’ যাদের বিরুদ্ধে গৌরীর এই শাণিত লেখনি গর্জে উঠেছিলো তারাই যে তাকে খুন করেছে তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিছুদিন আগে নারদ নিউজে এক সাক্ষাৎকারে তিনি হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতির বিরোধিতা করেন। গত বছরই গৌরীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন বিজেপি সাংসদ প্রহ্লাদ যোশী এবং বিজেপি নেতা উমেশ যোশী। তখনই লঙ্কেশ আশঙ্কা করেছিলেন এবার হয়তো তাকে খুন করা হবে। সিপিআই (এম) সাংসদ সীতারাম ইয়েচরি এই হত্যাকাণ্ডের তার নিন্দা করেছেন। নিন্দা করেছেন কর্ণাটকের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধাবামাইয়া। তিনি দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এটি গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রয়াস। টুইট বার্তায় নিন্দা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কীভাবে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ ভুয়ো সংঘর্ষে নিযুক্ত ছিলেন তা ‘গুজরাট ফাইলস’ বইতে তুলে ধরেছিলেন রানা আইয়ুব। সেই বইটির কন্ড ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন গৌরী। রানা আইয়ুব তার ক্ষোভ জানিয়ে কট্ররপন্থী হিন্দুত্ববাদীদেরই দায়ী করেছেন। কঠোর প্রতিবাদ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই। বুধবার দিল্লি প্রেস ক্লাব ও কলকাতা প্রেস ক্লাব জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবাদ সভা ডেকে সন্ধ্যা ৬টায় এই জঘন্য বর্বরোচিত হত্যকাণ্ডের নিন্দা করে মোমবাতি মিছিল বের করে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ