বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার

আপডেট: January 20, 2020, 12:54 am

প্রশান্ত সাহা


১৯৭১ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ তথা পাকিস্তানে এবং ভারতে বিভিন্ন ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল। যে ঘটনাগুলো দ্বিধা-দন্দ্ব কাটিয়ে বাঙালি জাতির মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছিল। বাংলাদেশে তথা পাকিস্তানে ৭১ এর শুরু থেকে ২৫ মার্চের গণহত্যা পর্যন্ত ঘটনা প্রবাহে বাঙালি জাতি পরিস্কার বুঝেছিল পাকিস্তানকে না বলতে হবে। আর ভারতেও ঘটনা বসে থাকেনি।
অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন, ১৯৭১ এর ৩০ জানুয়ারি ভারতীয় একটি বিমান অপহরণ করে লাহোর বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। অপহরণকারী দুই যুবককে পাকিস্তানে বীরের সম্মান দেয়া হয়। যারা পরিচয় দেয় তারা কাশ্মীর লিবারেশন আর্মির সদস্য। এখানেই শেষ নয় তৎকালীন পিপলস্ পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বিমান বন্দরে উল্লসিত অভিনন্দন জানান এবং তাদের মহান মুক্তিযোদ্ধা বলে অভিহিত করেন। বিমানটি বিস্ফোরক দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয় এবং তাদের পাকিস্তানে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা হয়। এই ঘটনাটির ফলে পাকিস্তানকে ভারতীয় আকাশ সীমা ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তৈরি হয় চরম সংকট। যা অব্যাহত থাকে। এরপর ভারতে প্রায় এক কোটি শরর্ণার্থী আশ্রয় নেয়া সহ নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি হয়। লক্ষ্য করার বিষয়, ৩১ মার্চ ভারতীয় আইন পরিষদে বাংলাদেশের ঘটনার উপর যে প্রথম প্রস্তাবটি গৃহিত হয় তাতে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা হামলাকে গণহত্যার সাথে তুলনীয় বলে উল্লেখ করলেও প্রস্তাবের ভাষা সম্পর্কে ইংরেজ ঐতিহাসিক রবার্ট জ্যাকসনের মতে তা কিছুটা দ্বিধান্বিত ও সংযত। তিনি বলেন, লোকসভায় গৃহিত প্রস্তাবটির দু ধরনের তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত এতোদিন ভারত নিজের ভূখণ্ডের অখণ্ডতার স্বার্থে পাকিস্তানের সংহতির প্রতি যে সমর্থন দিয়ে এসেছে তা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলো। বাংলাদেশের বিযুক্তিকরণ অনিবার্য। সাথে পাকিস্তানে অখণ্ডতার ব্যপারে সে আর পূর্ব অবস্থানে ফিরে যাবে না তারও ইঙ্গিত দেয়া হলো।
এর আগে লোকসভায় বিতর্ককালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং যা বলেন তা শীতল ও আবেগ বর্জিত হওয়ায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনার মুখে পড়ে। এই সমালোচনার মুখে উভয় কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য দিতে বাধ্য হন কিন্তু লক্ষনীয় যে তিনি তার বক্তব্যে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে পূর্ব বাংলা ব্যবহার করেন। এবং পূর্ব বাংলার জনগণের গণতান্ত্রিক আশা আকাক্সক্ষার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। কিন্তু তড়িৎ কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখান। ৩১ মার্চ লোকসভায় বিতর্কের পর পাকিস্তানকে ভারতীয় আকাশ সীমা ব্যবহার করতে দেয়া হবেনা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের বিরাট পরিবর্তন আসে তখন, যখন ১৯৭১ সালের আগস্টের ২য় সপ্তাহে নয়া দিল্লিতে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কারণ ইতিপূর্বে খুলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পিংপং রাজনীতির দরজা। ১৯৭১ এর জুলাই মাসে পাকিস্তান হয়ে চীনে এক গোপন সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। এই কূটনীতির দূতিয়ালির ভূমিকা পালন করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ফলে বিশ^ রাজনীতির ক্ষেত্রে এক নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হলো। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অপরদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে কিন্তু ভারত বন্ধুহীন। পরবর্তীতে ঘটনা নতুন মোড় নেয় ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তিতে।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আঁতাতে শুধু ভারত নয় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। পরবর্তীতে ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি উভয়কে আশ্বস্ত করে যে, যদি বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাদে তাহলে একটি পরাশক্তি তাদের পাশে থাকবে।
১৯৭১ এর ৯ আগস্ট দিল্লিতে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকো ও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং দুদেশের মধ্যে এক শান্তি-বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। তাতে হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায় তা একটি বম্বশেল। ১০ এপ্রিলে প্রবাসী সরকার গঠনের পর মুক্তিসংগ্রামে সার্বিকভাবে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের যে অস্বস্তি ছিল এই চুক্তির ফলে তা বিদূরিত হলো।
কথাটি এতো সহজে বললেই হবে না কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিষয়টি প্রথম থেকেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে করতো। ভাবতো এই লড়াই একটি অঞ্চলের সামগ্রিক জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষা নয়, এক কথায় বললে বলা যায় এটি কোনো জনযুদ্ধ নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই চিন্তার ধারার পরিবর্তন আসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগের ফলে। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি শুরু থেকেই আত্মগোপনে ছিল। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ না থাকলেও ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করে। আর ১৯৭১ এর আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এ দলের অধিকাংশ নেতা নেত্রী আত্মগোপন করেন, কেউ কেউ ভারতের আগরতলায় আশ্রয় নেন। দলের পক্ষ থেকে অস্থায়ী কার্যালয় কোলকাতায় সরিয়ে আনা হয় এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাফল্য আসেনি। পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ডিপি ধর এর পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা এবং প্রবাসী সরকারের ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত রাজনৈতিক অন্যান্য দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর অবস্থার পরিবর্তন আসে। এবং ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই চুক্তি সামগ্রিকভাবে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি ভাবে ভারতের পক্ষে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সরকারের দূরভিসন্ধি নস্যাৎ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহরের হুমকিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ৯ম ফ্লিটের মাধ্যমে পাল্টা প্রতিরোধের হুমকি দেয়াতে বাধ্য হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার গতি রুদ্ধ করে। ফলে সকল ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
ইতিহাসকে যেমন অস্বীকার করা যায়না, তেমনি ভুলে যাওয়াটাও সঠিক নয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জানতে হবে মুক্তিসংগ্রাম কী? কেন? কীভাবে হয়েছিল? এ জানানোর দায়িত্ব যাদের ছিল তারাও বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জনগণকে বিপথগামী করেছে। এখন পর্যন্ত তা জাতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট