ভালো থেকো ‘থেকারি’ টেমস

আপডেট: জুন ১৮, ২০১৯, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


টেমস ইংল্যান্ডের একটি নদীর নাম। লন্ডন শহরের ভেতর দিয়ে কোন্ আদ্দিকাল থেকে সে নির্বিকারে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশে^র সকল সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীতীরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, যোগাযোগ, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি নদীকেন্দ্রিক। টেমসের তীরেও লন্ডনের গোড়াপত্তন। আজকে সেই অবোধ বালিকা টেমস পরিপূর্ণ যৌবনা, রূপসীও।
তার দুই তীরে নানা আয়োজন। ব্রিজ, লন্ডন টাওয়ার, পার্লামেন্ট ভবন, রানীর প্যালেস, তার ¯্রােতময় জলে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে ব্যবহৃত যুদ্ধ জাহাজ, দামী ও নামকরা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিচ্ছন্ন রাস্তা, মিউজিয়াম, লাইব্রেরিসহ ব্যাংক-বিমা এবং শিল্প কারখানা। অথচ এই টেমস আমাদের আত্রাই নদীর মতো আকৃতি নিয়ে ঘোলা জল বয়ে যাচ্ছে নিরন্তর। তার দিনের এবং রাতের সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা, বহুমুখি আয়োজনে দর্শনার্থী মুগ্ধ। অথচ টেমস কি এমন রূপসী ছিলো কখনো? বহুদেশ লুণ্ঠনে ইংল্যান্ড আজকে বিত্তশালিনী, রূপসী এবং গরবিনী মানে ‘থেকারি’ও। থেকারি মানে ‘দেমাক’। আগে ছিলো না কিছুই, এখন হয়েছে অনেক এবং অনেক, তাই গর্বে তার বুকের ছাতি নিয়ত ওঠা-নামা করে, ভ্রু-কুঁচকে পরিপাশর্^কে দেখে। দেখায় রূপ-গৌরব।
কোনো পরিবার তাদের মেয়েকে নানাবন্নির পোশাক-অলঙ্কারে সাজালে তার সৌন্দর্য আরো বিকশিত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। সেই সৌন্দর্যের স্পর্শ-গন্ধ পেতে উৎসাহীরা ব্যাকুল হয়। তার পরিপাশের্^ জুড়ে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে সম্মোহন করতে উদ্যত হয়, তাকে খাতির-যতœ করতে নানা আয়োজন করে। কাছে রেখে পরিতৃপ্তি অনুভব করার স্বপ্ন দেখে। সুন্দরী টেমসের দেহবল্লরী তার ¯্রষ্টারা সেভাবে সাজিয়ে বিশ^বাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও কৌতূহল বৃদ্ধি করেছে। তাকে সাজিয়ে আরো আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে তারা দেশে দেশে বল প্রয়োগ, কোথাও চৌর্যবৃত্তি ও চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে সম্পদ লুণ্ঠন, রাহাজানি, ডাকাতিসহ মানুষের সঙ্গে বর্বর আচরণ করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। সেইসব লুটেরা, ডাকাত-বর্বরদেরই তারা সসম্মানে ঠাঁই দিয়েছে সাধারণের অনেক ওপরে। তাদের ভাস্কর্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্মিত হয়েছে। টেমস তাদেরই আয়োজনে ক্রমাগত সৌন্দর্যের শিরোদেশে উঠে বিশ^বাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সেই লুটেরা-বর্বরেরা আজকে সাধু বটে। এ যেন রবীন্দ্রনাথের “দুই বিঘা” কবিতার উপেনের মতো, তারই ভূমি, আমগাছ জমিদার সাধের বাগান করতে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ভিটে ছাড়া করে। সেই উপেন এক যুগ পর নিজের ভিটেয় ফিরে এসে তারই পিতৃপুরুষের গাছতলায় বসে স্মৃতি চারণ করতে থাকে। ঠিক সেই মুহুর্তে তার কোলের কাছে খসে পড়া আম কুড়িয়ে নিলে তাকে চোর ঠাউরে জমিদারের কাছে নিয়ে যায় পেয়াদারা। বাবু তখন তাকে সাধু বেশ ধারী চোর হিসেবেই তিরস্কার করে। শাস্তির হুমকি দেয়। বাবুর পারিষদেরা তার চেয়ে বিশ্রি ভাষায় তিরস্কার করে। আমাদের মতো উপেনেরা যখন টেমস দেখতে লন্ডনে আসে, অনেকটা ওই রকম দুরাবস্থায় পড়ে। সুন্দরীকে উপভোগের কায়দা-কানুন না জানার ফলে পদে পদে বোকা বনে। নির্বোধের মতো যত্রতত্র পদচারণা করে। ঠকে, বিভ্রান্ত হয়। আমাদের সম্পদ লুট করে লুটেরা তাদের দেশ, দেশের নদী-নর্দমা সাজিয়েছে, আমরা সেখানে অবিশ^াসী-অনাবশ্যক। কেউ ইচ্ছে করলেই টেমসের তীরে জীবন ব্যয়ের সাধ পূরণ করতে পারবে না।
যখনই কেউ শারীরিক ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়, তখন তার সামাজিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। জোটে তার মোসাহেব-তোষামুদের দল। তার সিংহ-দুয়ারে প্রতিদিন হাজির হয় করুণাপ্রার্থীরা। আরেক দল থাকে তাকে তুষ্ট করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল নিয়ে। লুটেরা-বর্বরাই হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জার্মানি সে রকম দেশ। তারা বিশে^র অনুকরণীয়। তাদের চিন্তার আয়োজন আমাদের আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। তারা এখন পূজনীয় এবং ভজনীয়। আমাদের শিক্ষা-কর্ম যদি এই সব দেশে হয়, তাহলে সেটা অধিক অগ্রাধিকার পায়। দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি আর ভাষা তুচ্ছ। শিক্ষিত ও ক্ষমতাধরেরা তো কোনো কালেই দেশের মানুষের প্রতি যতœবান নন, নন চিন্তা ও কর্মে দক্ষ আর যোগ্য। বঙ্কিমচন্দ্রের “বাবু” কিংবা “কমলাকান্তের দপ্তর”-এ এ রকম পরদেশির অনুকরণ কতোটা আত্মবিধ্বংসী তা যিনি পড়েছেন, তিনিই আমার বক্তব্য অনুধাবন করতে পারবেন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার দুরাবস্থা, দৈনিক শত কোটি টাকা ব্যয় করেও দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং দক্ষ মানুষ গড়ে তুলতে ব্যর্থ। টেমস্-এর তীরের শিশুরা সর্বত্র নিরাপদ এবং অগ্রাধিকার পায়। পড়া না পারলে কোনো শিশুকে শিক্ষক তিরস্কার করেন না, শারীরিক শাস্তিও দেন না। সে কেনো পড়ায় মনোযোগী নয়, কেনো সবার সঙ্গে মিশছে না, তা খতিয়ে দেখেন শিক্ষক। প্রয়োজনে অভিভাবককে ডেকে পরামর্শ করে অমনোযোগী শিক্ষার্থীকে তার পছন্দ মতো কাজ করার সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এখানে বইয়ে পাহাড় চাপিয়ে দেয়া হয় না। শিশুদের তো নয়ই। প্রতিষ্ঠানেই তাদের পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে দেয়া হয়। বাড়িতে ফিরে কর্মস্থল থেকে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে, খেলাধুলা করে, গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতার বই পড়ে। পাঠসূচিভুক্ত বই ইশকুলেই রেখে আসে তারা। কেউ ক্লাশ চলাকালীন পড়া না পারলে তাকে হোমটাস দেয়া হয়। সে বাড়িতে এসে বাবা-মার কাছে বসে হোমটাস তৈরি করে পরেরদিন ইশকুলে নিয়ে যায়। শিশুদের ইশকুলে দুপুরে খাবার দেয়া হয়। সে খাবার অবশ্যই শিশুদের উপযোগী এবং পরিস্কার। তাদের খাবারের অর্থ ঠিকাদার -নেতা-প্রধানশিক্ষক সম্মিলিতভাবে আত্মসাৎ করে না। অপরিচ্ছন্ন খাবার পরিবেশন করলে পরিবেশনকারী ঠিকাদারের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে। শিশুকে চিকিৎসার ব্যবস্থাও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করেন। রাস্তা পারাপারে শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রয়োজনে শিশুকে সাহায্য করে সবাই। তাদের দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা আর আইনের সফল প্রয়োগই লুণ্ঠিত সম্পদ সুবিন্যস্ত ভাবে রাখতে সাহায্য করেছে। অপরাধী রানী বা প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হলেও প্রচলিত আইনে বিচার হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী তো অনেক বড়ো ব্যাপার, পাড়ার নেতার দাপটেই জনজীবন তটস্থ। তারাই শহরের রাস্তায় দোকানি বসিয়ে দৈনিক টাকা আদায় করে, বাস-ট্রাক আর অটো চালকের কাছে চাঁদাবাজি করে। ব্যবসায়ীদের দোকানের পণ্য প্রদর্শিত হয় ফুটপাথে। তাতে যে মানুষের যাতায়াতে অসুবিধের সৃষ্টি হয়, তাতে নেতা কিংবা দোকানির বয়েই গেলো। তিন টাকার পণ্যের মূল্য ন’ টাকা হাঁকিয়ে মানুষের পকেট ফক্কা করে দিচ্ছে, সেগুলো দেখার কেউ নেই। সম্প্রতি খাদ্যে ভেজাল, বিষাক্ত অসুধ মিশিয়ে মানুষকে দুরারোগ্য ব্যাধি আক্রমণের শিকারে পরিণত করছে, সে নিয়ে খানিকটা তোড়জোর শুরু হলেও ভেজালদাতা ও মূল্যবৃদ্ধিকারীরা জোট হয়ে নানা ষড়যন্ত্র করছে। ভ্রাম্যমান আদালতের দৌড়ঝাঁপ যাতে খানিকটা হ্রাস পায়, তার জন্যে সবাই মিলে চাঁদা তুলে আইন প্রয়োগকারীর হাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ গুজে দিতে তৎপর। টেমসের তীরে নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এই ঘৃণ্য ও স্বার্থমগ্ন দুরাচারবৃত্তির অনুশীলন হয় না। তাই টেমস সুন্দরী ও আকর্ষণীয়।
আগামী কোনো দিনে এ নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে। এদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। কিন্তু সবাই সব কিছু সবভাবে দেখেন না। মানুষের মতো তাদের দৃষ্টভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণ স্বতন্ত্র। তাই আবার লেখা হলে কারো ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আমি তাই লন্ডনকে ‘থেকারি’ বিশেষণে অভিষিক্ত করে লিখবো। আপাততঃ থাকো তুমি থেকারি টেমস, হয়তো আবার কখনো দেখা হবে, সে প্রতীক্ষায় থাকলাম। ভালো থেকো ‘থেকারি’ টেমস।