ভাল নেই শিবগঞ্জের রবিদাস সম্প্রদায়ের ৮শ পরিবার

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১:১২ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


বর্তমানে আমাদের দূর্দিন চলছে। সারাদিন রাস্তার পাশে পেশাগত কাজ করার জন্য সরঞ্জাদি নিয়ে বসে থাকি। কোন দিন ১শ টাকা উপার্জন হয়। কোন দিন ১শ ৫০ টাকা হয়। আবার কোন কোন দিন কাজ না পাওয়ায় কোন উপার্জনই হয় না। হিসেব করে দেখেছি গড়ে প্রতিদিন ৭০/৮০টাকা উপার্জন করি। দ্রব্যমূল্য বেশী হওয়ায় ওই টাকা দিয়ে ৮ জন সদস্যের পরিবার নিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছি। শুধু তাই নয় কোন কোন দিন না খেয়েই থাকতে হয়। আবেগ জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের আইড়ামারী গ্রামের মৃত বলরাম রবিদাসের ছেলে হারাধন রবিদাস।
গতকাল শুক্রবার সকালে মনাকষা বাজারে মুচির কাজ করার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বর্তমানে জুতা সেন্ডেল মেরামত করে কোন রকমে চলছি। কিন্তু কিছুদিন পর হয়তো এটাও আর থাকবে না। কারণ এখন যেখানে সেখানে ৫শ টাকা থেকে শুরু করে নিম্নে ৫০/৬০ টাকা জোড়া জুতা সেন্ডেল ক্রয় করতে পারায় গ্রামের মানুষ আর পুরাতন জুতা সেন্ডেল মেরামত করতে চায় না। আর আমরা অন্য কোন কাজ করতে পারি না। কেউ আমাদের কামলা হিসেবে ডাকেও না। এভাবেই আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
অতীতের কথা স্মরণ করে হারাধন বলেন আগে আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য একেক জনের একেক এলাকা আলাদা আলাদা এলাকা ভাগ করা থাকতো। ওই নির্দিষ্ট এলাকা যার ভাগে থাকেতো সে ছাড়া অন্য কেউ যেতে পারতো না। ওই এলাকার গৃহস্থরা সারা বছর তাদের জুতা সেন্ডেল মেরামত করতো । কিন্তু নগদে কোন টাকা না দিয়ে ফসল মৌসমে কেউ ১ মন, কেউ আধামন কেউ বা ১০ কেজি করে ধান, গম, কলাই, খেষাড়ি, মটর নানা ধরনের ফসল দিতো। ফসল মৌসুমে আমাদের ঘরে উঠতো ৪০/৫০মন করে। বছরে দুই মৌসুমে আমাদের ঘরে উঠতো প্রায় ১শ মন ধান, কলাইসহ অন্যান্য ফসল। তাছাড়া অনেকেই নতুন করে জুতা সেন্ডেল আমাদের কাছে নগদ টাকায় তৈরি করিয়ে নিতো। তাছাড়া সে সময় আমরা এলাকার হাটে হাটে কৃষক বাদে অন্যান্য পেশার মানুষের জুতা সেন্ডেল মেরামত করে ভাল টাকা উপার্জন করতে পারতাম। কালের প্রবাহে সেটিও আর নেই । বিভিন্ন কারণে সেই প্রথা গত বিশ বছর আগে থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু হারাধনই নয়, একই পেশার শিবগঞ্জ বাজারের মদন রবিদাস, দূর্লভপুরের গুধা রবিদাস, শ্যামপুরের তারাপদ রবিদাস, শাহাবাজপুরের শ্রীপতি রবিদাস, নয়ালাভাঙ্গার পালানু রবিদাস, ঘোড়াপাখিয়ার দয়াল রবিদাস ও ধাইনগরের ফনি রবিদাস সহ অনেকেই একই কথা বলেন।
রবিদাস সম্প্রদায়ের নারীরাও এখন বেকার হয়ে পড়েছে। মনাকষা ইউনিয়নের দিলীপ রবিদাসের স্ত্রী মুনেকা রানী দাসী, দুর্লভপুরের অঞ্জলী রানী দাসীসহ অনেকে বলেন, আগে অমাদের সম্প্রদায়ের জন্য এলাকা ভাগ করা থাকতো। একেক এলাকায় একেকজন নারী দাই হিসেবে কাজ করতো। সন্তান প্রসবের পর সেবা করে কাপড়, জামা, চাল, ডাল, আটা ও ভাল অংকের টাকা বকশিস হিসেবে পাওয়া যেত। বতমানে গর্ভবতী মায়েরা হাসপাতালে বা ক্লিনিকে গিয়ে সন্তান প্রসব করায় আর কেউ আমাদেরকে ডাকে না।
এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পবিরবার পরিকল্পনা অফিসার আখতার হোসেন বলেন, সরকার রবিদাস সম্প্রদায়ের নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য দাইয়ের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের সে দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে।
রবিদাস সম্প্রদায়ের দাবি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা হোক। দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়ের উপজেলা শাখার সভাপতি নিবারণ রবিদাস বলেন, আমাদের পুরাতন পেশার মাধ্যমে পূর্নবাসন করা হোক।
রবিদাস মানবিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক প্রফুল্ল কুমার রবিদাস বলেন, আমরা এ সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস বলেন, দলিতদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। তারাই ধারাবাহিকতায় শিবগঞ্জে রবিদাস সম্প্রদায়ের অনেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুবিধাভোগী ভাতা দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে বেত, বাঁশের কাজ, নকশী কাঁথা সেলাই জুতা স্যান্ডেল তৈরি ও মেরামত সহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ