ভেজাল বিরোধী অভিযান

আপডেট: জুন ১৩, ২০১৯, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


বেশ কিছুদিন যাবত আমাদের দেশে ভেজাল বিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। ইতিপূর্বেও যে এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে সেটি সর্বজনবিদিত। এ অভিযানের ফলে বেরিয়ে আসে সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনেক তথ্য এমনই অভিনব যা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। এসব অভিযানের ফলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু উপকার পাই। কিন্তু কিছুদিন পরে যখন এ অভিযানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় তখন এর পরিণতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
আমাদের দেশে নানা আইন আছে। এ আইনগুলো পুরনো, যার সংস্কার দরকার। যে আইন প্রচলিত আছে তাতে শাস্তির বিধান অতি নগন্য। শুধু তা-ই নয় এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে হাট-বাজার অধ্যাদেশে আইন, দোকান ও প্রতিষ্ঠান আইন, ওজন ও পরিমাপ বিষয়ক আইন, ভেজাল বিরোধী আইনসহ নানা রকম আইন আছে। কিন্তু কার্যতঃ এগুলোর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সম্প্রতি পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযানের পরিণতিতে এটি আমাদের কাছে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, এদেশের প্রায় ৯০% বা তারও বেশি খাবারে ভেজাল আছে। বিস্ময়কর এ তথ্যের আলোকে এটাও আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে মানুষের জীবনাশকারী এতবড় অপরাধের সাথে যুক্ত হয়েও তাদের কিছু অংকের অর্থ-জরিমানার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আইন ও আইনের প্রয়োগ কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশে এখন আমরা অনেক ব্র্যান্ডের মসলা খাই। দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি ‘প্রাণ’ কোম্পানি যাদের বিশে^র একশ’র বেশি দেশের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে- তাদের মসলায়ও ভেজাল। একমাত্র রাঁধুনী অর্থাৎ স্কয়ারের পণ্য মসলা ভেজালমুক্ত। এ চিত্রটি উদ্বেগজনক।
কতভাবে যে ক্রেতা বা ভোক্তাকে ঠকানো হয় তা বিস্ময়কর। ব্যবসার একটাই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনো প্রকারেই হোক লাভের অংকটা বাড়ানো। অথচ মার্কেটিং সবশেষ মতবাদ সমাজ কল্যাণমুখি। প্রথমে যে মতবাদটি ছিল শুধুই উৎপাদনমুখি সেটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী করা হয়েছে। সর্বশেষ মতবাদে শুধুমাত্র মুনাফাই নয় ক্রেতা/ভোক্তার সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ করাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ভোক্তাদের যে ভাবে ঠকানো হচ্ছে সেটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। ব্যবসার নৈতিকতা বিরোধী।
ভোক্তাদের ঠকানোর যে অভিনবত্ব তা রীতিমতো শ^াসরুদ্ধকর ও ভয়ংকর। বিচিত্রভাবে ঠকানো হচ্ছে ভোক্তাদের। ওজনে ঠকানো একটি অতি পরিচিত ও প্রচলিত উপায়। অনেক সময় বাটখারায় কম থাকে, কখনো বা দাঁড়িপাল্লায় কারসাজি থাকে। আগে অনেক জিনিসই হালি, গন্ডা, ডজন হিসেবে বিক্রি হতো। এখন সেসব জিনিস ওজনে বিক্রি হচ্ছে। কারণ ওজনে বিক্রি করলে লাভ বেশ হয়। যেমন কলা, আনারস ইত্যাদি। খাবারে রং মেশানো হয়, সেগুলো খাবারের রং নয় বরং নানা রাসায়নিক উপাদান সংবলিত। ওজন বাড়ানোর জন্য খাদ্যশস্যে পাথর বা ইটের টুকরো মেশানো হয়। পোড়া মবিল দিয়ে শর্ষের তেল বানানো হয়। সব্জিতে রং মিশিয়ে তাকে টাটকা দেখানো হচ্ছে। ফরমালিন দিয়ে ফল পাকানো হচ্ছে। ্েস্প্র করে ফলের রং পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। মাছসহ পশু-পাখিদের যেসব খাবার খাওয়ানো হচ্ছে তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। পশু মোটাতাজাকরণের নামে যা করা হয় তাতে পশুর কিডনি নষ্ট হয়ে পশুগুলো ফুলে উঠে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেগুলোর সদ্ব্যবহার না হলে সেগুলো মারা যায়। চাষের মাছ ছাড়া আজকাল বাজারে মাছ প্রায় মেলেই না। সে মাছকে যে খাবার দেওয়া হয় তা খেতে যেমন রুচি হয় না তেমনি সেগুলো খাবার পর ব্যবহার্য্য পাত্র কিংবা মানুষের হাত-মুখ থেকে সে উৎকট গন্ধও দূর করা কঠিন। সর্বোপরি রয়েছে মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। আজকাল নানা প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু সেগুলোও তো একইভাবে আবাদ করা হয়। কৃষিজ অন্যান্য পণ্য ধান, তিল, তিসি, শর্ষে, পাট এসবের যে জাতের বীজ আপনি কিনতে যাবেন সেখানেও পাবেন ভেজাল। তার যেসব সার, বীজ ব্যবহার করা হয় তা সঠিক মানের নয়। শুধু তাই নয়, দামের ক্ষেত্রেও থাকে নানা কৌশল। মানুষ ভেদে নানা জনের নিকট থেকে নেওয়া হয় নানা দাম। এখানে বিএসটিআই ও ক্যাব আছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সঠিক নয়। ফলে ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ঠিকই পার পেয়ে যায়। বিএসটিআই-র অনুমোদন ছাড়া কোনো পণ্য বাজারে আসার কথা নয়- একথা সত্যি। কিন্তু বাস্তবে এ অনুমোদনহীন বহু পণ্য বাজারে পাওয়া যায়। অথবা বাজারে পাওয়া যায় নকল সিলযুক্ত পণ্য।
প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ। আইন অনুযায়ী প্যাকেটের গায়ে যেসব তথ্য থাকা উচিৎ- যেমন উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, উপাদান, তাদের পরিমাণ, ব্যবহার বিধি, সতর্কতা, পণ্যের লেবেল, কোম্পানির নাম, ব্র্যান্ড ইত্যাদি অনেক সময় যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয় না। ফলে ভোক্তারা বিভ্রান্ত হয়।
এছাড়া রয়েছে নকল পণ্যের দৌরাত্ম। সুকৌশলে এ নকলগুলো করা হয় যা সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। যেমন Bata-কে নকল করে করা হচ্ছে Bala বা Rata ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এটাতো সহজেই ধরা যায় কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অনেকেই ঠকে। কারণ বানানগুলো প্রায় একই রকমের।
প্রসাধনী পণ্যের নকল সহজে ধরা যায় না। বিদেশি পণ্য বা ব্র্যান্ডেও পণ্যের কৌটা বা বোতলগুলো কিনে নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্য ওইসব পাত্রে ভরে বিক্রি করে। খুব দক্ষ লোক ছাড়া এ জাতীয় নকল অনেকের পক্ষেই ধরা কষ্টকর। আমার নিজস্ব একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। একদিন আরডিএ মার্কেট থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে এক ছেলে একটা শ্যাম্পু ও একটা পারফিউম দিয়ে বলছে ৪০০/- টাকা হলেই দিয়ে দেব। ব্র্যান্ডের পণ্য এবং পরিচিতি ব্র্যান্ড। প্রথমটা অবাক হলাম। পরে ও যখন বললো না খেয়ে আছি মনটা নরম হলো। শুরু থেকেই ওকে বলে যাচ্ছি ওগুলো নেবো না, দরকার নেই। কিন্তু ও নাছোড়বান্দা। একসময় কেঁদে ফেললো। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। জিনিস দু’টো নিলাম। সুন্দর প্যাকেট করা, কোনোভাবে সন্দেহ করবার সুযোগ নেই। মনে কোনো দ্বিধা না রেখেই পণ্য দু’টো নিলাম, মুহূর্তে ছেলেটি ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলো। আমিও সব কাজ সেরে বাড়ি এলাম। বাড়ির অন্য সব বাজার গুছিয়ে রেখে ওই জিনিস দুটো নিয়ে ঢাকনা খুললাম এবং যথারীতি শ্যাম্পুর বোতলটা নিয়ে নাড়া দিতে বোঝা গেলো ভেতরে কিছু আছে কিন্তু সেটা বেশ পাতলা। তখন সন্দেহ হলো। বোতল থেকে কিছু তরল হাতে নিয়ে দেখি পাতলা এক ধরনের জলীয় পদার্থ যাতে শ্যাম্পু হয়তো সামান্য ছিল। পারফিউমেরও একই ঘটনা। অবাক হলাম ছেলেটির অভিনয় কুশলতা দেখে। এতক্ষণে মনে হলো ও ছিল একজন প্রতারক। এভাবে প্রতিদিন প্রতিক্ষণে মানুষ যে কতরকম প্রতারণার শিকার হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।
একটু খেয়াল করে যদি দেখি প্রতিদিনের ব্যবহার্য্য আবশ্যকীয় পণ্যগুলোর ভেতরে কত ভেজাল। ভেজাল খাদ্য খেয়ে বা ভেজাল জিনিস ব্যবহার করে মানুষ অসুস্থ হয়ে থাকে, অকালে মৃত্যুবরণ করছে। এখন মানুষ নানা রকম রোগ-ব্যাধিতে ভুগছে। অকালে বার্ধক্য বরণ করছে। এসব কিছুর পেছনে আছে খাবারে ভেজাল।
যাঁরা খাবারে ভেজাল মেশান তাঁরা কি একবারো ভেবে দেখেছেন তাঁদেরও খাবার কিনে খেতে হয়? সব খাবার তাঁরা তৈরি করতে পারেন না। সুতরাং, তাঁরা নিজেরাও ভেজাল খাদ্য কিনে খাচ্ছেন। তাঁরা যদি একটু সচেতন হন তাহলে সহজেই ভেজালের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। তাঁদের সদিচ্ছায় তাঁরা নিজেরা যেমন সুস্থ থাকতে পারেন তেমনি অন্যদেরও ভালো থাকতে সাহায্য করতে পারেন। ভেজালমুক্ত সমাজে সবাই সুস্থভাবে বেঁচে থেকে রোগবালাই থেকে দূরে থাকতে পারেন। ভেজাল খাবার যে সবার জন্য ক্ষতিকর এ সহজ কথাটি বুঝলেই সমাজ থেকে ভেজাল নামক ব্যাধিটি দূর হবে। আমরা নিশ্চিন্তে কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই জিনিস কিনতে পারবো। সেদিন আমাদের দুশ্চিন্তা কমে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ভেজাল। ভেজাল ওষুধ ব্যবহার করে (নাপা) একবার অনেক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এবারের এ অভিযানে ভেজাল ওষুধ তৈরির মতো মরণঘাতি কর্মকাণ্ডও পরিলক্ষিত হয়েছে। যে ওষুধ মানুষকে নানা রোগব্যাধি থেকে মুক্ত করবে সে ওষুধ যদি ভেজাল হয় তার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে? সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানো উচিৎ। কোনো জরিমানার বিনিময়ে এসব নরখাদকদের ছাড় দেওয়া উচিৎ নয়। যারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার হওয়া উচিৎ যেটা দেখে অন্য কেউ ওই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ করার আগে বারংবার ভাবে।
সম্প্রতি আড়ং-এর মতো প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে কোনো একটা পণ্যের দাম সপ্তাহখানেক আগে যা ছিল সপ্তাহখানেক পরে তা প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ফলস্বরূপ এ অভিযানের দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোকের রাতারাতি বদলি করা হয় খুলনায়। এ হচ্ছে ভালো কাজের পুরষ্কার। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সৎলোকেরা নিরুৎসাহিত হয়, অসৎ কাজ প্রসারিত হয়।
ভেজালে আমরা আকন্ঠ নিমজ্জিত। এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারের পাশাপাশি আমাদের অর্থাৎ দেশের নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। আইন ভঙ্গকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। কেউ এ বিষয়ে গাফিলতি বা অবহেলা করলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। বিএসটিআইকে যথাযথভাবে কাজ করতে হবে। ক্যাব (কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) যাতে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে সেদিকে সচেতন ভোক্তাদের খেয়াল রাখতে হবে। ভেজাল বিরোধী অভিযান সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রচার ও প্রচারনার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। প্রতারকরা যাতে সামান্য জরিমানার বিনিময়ে ছাড় না পায়- সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ হতে হবে।