ভ্যাট নিয়ে বিভ্রান্তি

আপডেট: জুন ১১, ২০১৮, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ভ্যাটের স্তর নয় থেকে পাঁচটিতে নামিয়ে এনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এতে সর্বনিম্ন ভ্যাটের হার ঘোষণা করা হয়েছে ২ ও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, ভ্যাটের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশ রেখেই স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে ছয়টি। এ হারেই ভ্যাট আহরণ করবে তারা। অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের দুই ধরনের তথ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ৪ শতাংশ টার্নওভার ভ্যাট দেয়া প্রতিষ্ঠানের ভ্যাটহার নিয়েও।
পণ্য ও সেবাভেদে বর্তমানে নয়টি স্তরে সর্বনিম্ন দেড় থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট আদায় করে এনবিআর। বাজেট প্রণয়নের আগে ভ্যাটের হারকে দুটি স্তরে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। একটি ১৫ শতাংশ ও অন্যটি ৫ কিংবা ১০ শতাংশ করার কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় ভ্যাট বহুস্তর রেখেই মূল্য সংযোজন কর নীতিমালা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআরের আহরিত রাজস্বের মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। আগামী অর্থবছরেও ভ্যাট খাতে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভ্যাট বর্তমানে নয়টি সংকুচিত হারে আরোপ করা আছে। এবার এ হার হ্রাস করে পাঁচটিতে নামিয়ে এনেছি। হারগুলো হলোÍ ২, সাড়ে ৪, ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ।
যদিও প্রকৃতপক্ষে ভ্যাটের হার ছয়টি বলে জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ভ্যাটের বিদ্যমান ১৫ শতাংশ সর্বজনীন হারের পাশাপাশি সংকুচিত মূল্যের ক্ষেত্রে বাজেটে ঘোষিত হার প্রযোজ্য হবে। এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভ্যাটহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নয়টি স্তরের স্থলে পাঁচটি ঘোষণা করা হলেও ভ্যাট মূলত হবে ছয় স্তরে। ১৫ শতাংশের সর্বজনীন হারের পাশাপাশি নতুন পাঁচটি স্তরে ২, সাড়ে ৪, ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আহরণ করা হবে। বিদ্যমান ১ দশমিক ৫, ২ দশমিক ৫, ৩, ৪, ৪ দশমিক ৫, ৫, ৬, ৭ দশমিক ৫ ও ১০Í এ নয়টি হারকে মূলত পাঁচটিতে একীভূত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় প্রস্তাবিত সংকুচিত পাঁচটি স্তরের ঘোষণা এলেও সর্বজনীন স্তরটি ভুলক্রমে আসেনি।
জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সাধারণভাবে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। ভ্যাটের সংকুচিত যে হার বাজেট বক্তৃতায় এসেছে, তাতে ১৫ শতাংশের বিষয়টি হয়তো ভুলবশত আসেনি। আমরা স্বাভাবিকভাবে ১৫ শতাংশ হারেই ভ্যাট আদায় করব। এর বাইরে বাকি যে পাঁচটি স্তর ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে পণ্য ও সেবাভেদে সংকুচিত হারে এ ভ্যাট আদায় করা হবে। এ বিষয়ে এসআরও জারি করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় ১৫ শতাংশের বিষয়টি হয়তো কোনোভাবে বাদ গেছে।
অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের দুই ধরনের তথ্যে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করা হয় মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনসাপেক্ষে। এখানে যে ঘোষণা আসে, তা নিয়েই ব্যবসায়ীরা তাদের পরিকল্পনা সাজান। বাজেট প্রস্তাবনায় কোনো কিছু উল্লেখ না করে এসআরওর মাধ্যমে আরোপ করলে তা ঠিক হবে না। তবে কর ও ভ্যাটের ক্ষেত্রে এনবিআরের এসআরও প্রধান বিবেচ্য বলে মানছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা ও বাজার প্রভাব বিশ্লেষণ ছাড়াই অর্থমন্ত্রী অনেক ঘোষণা দিয়ে থাকেন। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য দেন, তা এক ধরনের দলিল হিসেবে চিহ্নিত। দেশে ভ্যাটের হার কোনোভাবেই ১০ শতাংশের উপরে হওয়া উচিত নয়। বিশ্বের সব দেশই তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ভ্যাটহার নির্ধারণ করে। আমাদের দেশেও তাই হওয়া উচিত।
এদিকে ভ্যাটের হারের পাশাপাশি এটিভির হার বাড়ানোর কারণে টার্নওভার ট্যাক্স নিয়েও এক ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সুপারশপ ও রিটেইল ব্যবসায়ীরা ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স প্রদান করেন। এনবিআর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টার্নওভার ট্যাক্স এটিভি হিসাবে আদায় করে বিধায় এর হার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। এনবিআরকে ৫ শতাংশ হারে এটিভি প্রদান করলে চূড়ান্তভাবে ভ্যাটও তাই হয় এসব ক্ষেত্রে। যদিও টার্নওভার বাড়ানো হয়নি এবারের বাজেটে।
চেইনশপ মীনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহীন খান বণিক বার্তাকে বলেন, সুপারশপগুলোর কাছ থেকে বর্তমানে ভ্যাট বাবদ ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স আদায় করে এনবিআর। এটিও অগ্রিম ব্যবসায় ভ্যাট বা এটিভি হিসাবে আমাদের কাছ থেকে কেটে রাখা হয়। এখন এটিভি বাড়ানোর কারণে আমাদের টার্নওভার ট্যাক্স কী হবে, তা নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। কর ও ভ্যাটের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার চেয়ে এনবিআরের এসআরও আমাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য। এনবিআর কী নির্দেশনা দেবে, তা রোববার (আজ) জানতে পারব আমরা।
উল্লেখ্য, ভ্যাট নিয়ে জটিলতা এবারই প্রথম নয়। চলতি অর্থবছর থেকেই ১৫ শতাংশের একক ভ্যাটহার চালু করতে চেয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। এক স্তরের ভ্যাটহারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়ার যুক্তি দেখিয়ে এর বিরোধিতা করতে থাকেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত নতুন আইন কার্যকর ২০১৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয় সরকার। একই সঙ্গে একক ভ্যাট হারের স্থলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ দশমিক ৫, ২ দশমিক ৫, ৩, ৪, ৪ দশমিক ৫, ৫, ৬, ৭ দশমিক ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশের পৃথক নয়টি স্তর নির্ধারণ করা হয়। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ