ভ্রমণ আলেখ্যের ওমে মুখর ছিল ‘বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, রাজশাহীর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও প্রকাশনা উৎসব

আপডেট: এপ্রিল ৬, ২০১৮, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

এমএ কাইউম


জীবনের মর্মমূলে আছে অর্জনের প্রণোদনা। যে কারণে আমরা সময়ের বিমূর্ত প্রবাহমানতায় দাগ কাটি, বিশেষ একটি ক্ষণকে সনাক্ত করি এবং এই বিশেষ ক্ষণটি আমাদের মননে অনুপ্রেরণাদায়ক অনুভূতি সঞ্চারিত করে। এমনই চাঞ্চল্যকর মুহূর্ত ছিল গত বুধবার ১৪ চৈত্র, ১৪২৪ বাংলা, (২৮ মার্চ, ২০১৮ খ্রি.)। যেখানে চৈত্রের মঞ্জুরিত মুকুলের মতো জড়ো হয়েছিল সেদিন ঝাঁক ঝাঁক বিক্রমশীলা কবি-সাহিত্যিকরা। বর্ণ দিয়ে, বাক্য দিয়ে সাজিয়েছিলেন কাব্যের হিরণ¥য় পৃথিবী। সেদিন সময় বদলের সমান্তরালে বদলেছিলো সবার মন ও মনন। কবিতায় কবিতায় ভরিয়েছিল সবার অন্তর। সামান্য সুরুচির স্পর্শে যে অসামান্য রূপ নেয় তাই সেদিন সভাপতি রাশেদা খালেকের ফুলের মুকুটে সাজানো ফুলপরী কবিদের শিল্পবোধ অপরিশীলতাকে করেছিল পরিশীলিত। শব্দের ভেলায় মান্যবর অতিথিরা সিক্ত হয়েছিলেন ফুলেল শুভেচ্ছায়। তাতে অনাদ্র মেঘেও কাব্যের বৃষ্টি ঝরেছিলো।
নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ রাজশাহী শাখার ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, গুণিজন সংবর্ধনা-২০১৮ ও ‘ভুবনের ঘাটে ঘাটে’ ভ্রমণ সংকলনের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। এ উপলক্ষে আনন্দ উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে সাহিত্যাঙ্গন। সেখানে কবিদের একে অপরকে দেখারও সুযোগ হয়েছিল হৃদয়ের ওমে। সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধ্যানে নিরন্তর পথিক কবি ও কথাশিল্পী রাশেদা খালেক আবহমান বাংলার যে মুখচ্ছবি, তা শুধু তিনি ল্যান্ডস্কেপ ফ্রেমে চারদেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে ভ্রমণ কাহিনীর ভেতর চলমান মূর্ত প্রতীক করে তুলেছিলেন তাঁর স্বপ্নে সাজানো সাহিত্যের বাগানে। অনুষ্ঠানে অধ্যাপিকা রাশেদা খালেকের সযতেœ সুচারুরূপে সম্পাদিত ‘ভুবনের ঘাটে ঘাটে’ ভ্রমণ সংকলনটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। তাতে ২৮ জন লেখিকার দেশ-বিদেশে ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কাহিনীগুলো অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সুখপাঠ্য হয়ে উঠে। বোধের বিবর্তনের অধ্যায়ে প্রায় সব কাহিনীতে অনেক অনেক নিরীক্ষাধর্মী বিষয় ছিল যা হয়তো কোনো সময় গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। সেখানে এমনও শিল্পবোধ রয়েছে যা মনে করিয়ে দেয় কলমের আঁচড়গুলো আসলে নিজস্ব জগৎ থেকে নেয়া শিল্পীর বয়ানভঙ্গি, ব্যক্তিগত অভিরুচি, দৃষ্টিভঙ্গি আর পারিপার্শ্বিকতার ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখা।
লেখার শৌর্যবীর্য অবলম্বন করে ভ্রমণের কাহিনীগুলো পড়লে লোমহর্ষক অনেক চমৎকার সংবাদ পাওয়া যায়। এছাড়াও দীর্ঘ আগ্নেয়গিরি লাভাস্্েরাতের মতো অশোধিত আবেগের ফিরিস্তি পাঠ করতে গিয়ে কোথায়ও কোথায়ও এমন কিছু জমাট অংশ পাওয়া যায়, যাতে মনে হয় নারীদের সবটাই যন্ত্রণা নয়, যন্ত্রণা অতিক্রম করার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। কণ্ঠমাধুরীর উপস্থাপনায় প্রথম পর্বে ড. নূরে এলিস আকতার জাহান ও দ্বিতীয় পর্বে কল্পনা রায় ভৌমিকের সঞ্চালনায় বর্ষিয়ান কবি ড. মাজেদা বেগমের কোরআন তেলওয়াতের ভেতর বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, রাজশাহীর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, গুণিজন সংবর্ধনা ও ‘ভুবনের ঘাটে ঘাটে’ ভ্রমণ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন করা হয় মিষ্টি সকালে। হিরন্ময় আলোয় মঞ্চ অলংকৃত করলেন লেখিকা সংঘ রাজশাহীর সভাপতি বিশিষ্ট নারীনেত্রী, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমান নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ প্রফেসর ড. আবদুল খালেক। এসময় তিনি বলেন, কোন দেশ কতটা সমৃদ্ধ তা সে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দুর্বলতার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ এখনো স্বাধীনতা লাভ করেনি। আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শেকড় অনেক গভীরে। অনেক সমৃদ্ধ। তা না হলে আমাদের স্বাধীনতা আসতো না। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাবির সাবেক উপ-উপাচার্য মনোবিজ্ঞনী প্রফেসর মুহম্মদ নূরুল্লাহ্, মূখ্য আলোচক লোকবিজ্ঞানী এনবিআইইউ’র উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, আলোচক শব্দ ভা-ারের কবি নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ফরিদা সুলতানা ও রাবির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল আলীম। ভ্রমণ সংকলনের লেখাগুলো ফালা ফালা করে অ্যানাটমি টেবিলে চিরেছিলেন তাঁরা।
এতে প্রথম পর্বে গুণিজন সংবর্ধনা পেলেন ১০ জন। সাহিত্যে বিশিষ্ট লেখিকা জায়তুনা খাতুন, ছোট গল্পে শেরিনা সরকার রোজী, অনু চৌধুরী, গবেষণায় ড. মাজেদা বেগম, শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রফেসর সাইদা বেগম, সাহিত্যে মনোয়ারা বেগ, কাব্যে শিরীন শরীফ, সাহিত্যে মমতাজ মহল বুলবুলি, তথ্য-প্রযুক্তিতে জামসেদ হোসেন টিপু ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য জনাব আলী সম্মাননা পান। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ডা. লুৎফা কাদেরের সভাপতিত্বে মহান স্বাধীনতা বিষয়ক কবিতা আবৃতিতে অংশ নেন কবি অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক, হামিদা হক, রেবেকা আসাদ, কল্পনা রায় ভৌমিক, ড. মাজেদা বেগম, মনোয়ারা বেগ, রোজালিনা সামআ, মমতাজ মহল বুলবুলি, ফাহমিদা ফেরদৌস, নূরে এলিস, জিনাত ফাতেমা তমা প্রমুখ। এ পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন শিরীন সুফিয়া খানম, বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি রেবেকা আসাদ। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন এনবিআইইউ’র প্রভাষক হাফিজুর রহমান ও হাসান ঈমাম সুইট।
সম্মোহনী প্রিয়ভাষ্যের কবি ও কথাশিল্পী লেখিকা সংঘ রাজশাহী শাখার সভাপতি অধ্যাপিকা রাশেদা খালেকের বক্তব্যে উঠে আসে ভ্রমণ আলেখ্য ‘ভুবনের ঘাটে ঘাটে’ ভ্রমণ সংকলনটি তাঁর অনেক কষ্টের ফসল। প্রাণের তাগিদ ও স্বপ্ন থেকেই সংকলিত। লেখিকা সংঘের লেখকদের ভ্রমণ আলেখ্য ভাষা ও সাহিত্যের ভা-ারে অমূল্য সংযোজন হয়ে থাকবে ‘অন্তরে অনির্বান শিখার’ মতো। মধ্যাহ্নে রোদেলা আলোয় উপস্থিত ছিল গল্প কবিতার পুনর্জাগরণের বার্তাবহ। উপাদেয় ভোজের পর ফটোসেশন তারপর কবিতা পিপাসুদের সরব উপস্থিতি আর মহিমান্বিত আয়োজনের একখ- শান্তির প্রপাতে কবিদের কবিতা পাঠের শব্দ ধ্বনিতে উদ্দীপ্ত হয়ে বাতাসের মায়াজালে মিশে গেলো শ্রবণ-ইন্দিয়। তারপর ডানাহীন সন্ধ্যায় ক্রমান্বয়ে কবিরা মিশে গেলেন লিফটের পাতাল কূয়ার নাগরিক কোলাহলে।