মনুষ্যত্বের অপমান, পশ্বাধমতার নামান্তর

আপডেট: জুন ১৯, ২০১৯, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে না পারলে কোনো ব্যক্তি মনুষ্যপদবাচ্য কিনা, তা ভাববার বিষয়। তর্কশাস্ত্র বলছে, মনুষ্যত্ব অর্থাৎ বিবেক এবং পশুত্বের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। তাই মানুষের আচরণে পাশবিকতা যেমন আছে তেমনি পশুত্বও বিদ্যমান। এদুয়ের সমন্বয়েই মানুষ বিদ্যাসাগর চরিত্রে মানবত্বের অপরিমাণ উপস্থিতি অবলোকন করেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অক্ষয় মনুষ্যত্বের অধিকারী বলে অভিহিত করেছিলেন।
১৮৯১ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগরের তিরোধানের কয়েকবছর পরে ১৩০২ সালের ১৩ই শ্রাবণ (১৮৯৫) এমারন্ড থিয়েটারে বিদ্যাসাগর স্মরণসভা অনুষ্টিত হয়। সভায় রবীন্দ্রনাথ গভীর আবেগ ও মনীষা দিয়ে বিদ্যাসাগর চরিত্র নামে যে অসাধারণ রচনা পাঠ করেন, বাঙালির ইতিহাসে তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
বিদ্যাসাগর তাঁর জীবন চর্যা, শিক্ষা ও শিক্ষকতা, মানব-দর্শন ও সমাজবীক্ষণে যে অসামান্য কীর্তি স্থাপন করেছিলেন তাকেই রবীন্দ্রনাথ অক্ষয় মনুষত্ব বলে মনে করেছেন। যেখান থেকে আজও আমাদের শিক্ষনীয় আছে বলে এই আলোচনার অবতারণা। দুখের বিষয় এমন একজন মানবসন্তান আজও বাংলার মাটি জন্ম দিতে পারলো না।
সামনের বছর (২০২০) বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী এবং ২৬ শে সেপ্টেম্বর প্রয়াণ দিবস। তার আগেই সম্প্রতি কলকাতায় তাঁর নিরীহ মূর্তি ভাঙচুর হয়েছে। মনুষ্যত্ব ও মানবতার এটা কতবড়ো অপমান, তা ওই ক্ষমতালোভীরা বুঝে না। তাই বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশায় প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থবাদীদের যে তা-ব পরিলক্ষিত হয়েছিলো তারই যেন পুনরাবৃত্তি।
ধর্মগ্রন্থে সেই যে নিজে করে অপরকে শেখানোর নির্দেশ আছে এবং বিবেকানন্দ যা প্রচার করে গেছেন, তা গ্রন্থের মলাট ভেদ করে মানব চরিত্রে খুব বেশি প্রবিষ্ট হয়নি কোথাও।
বিদ্যাসাগর নিরামিষাশী ছিলেন, এটা তাদের কৌলিক বিষয় ; কিন্দু দুধ খেতেন না, তার একটা মোজেজা আছে। সংস্কৃত কলেজে অবস্থান কালে ছুটিতে বীরসিংহে গিয়ে বাল্যশিক্ষক টোলের প-িত মশায়ের সাথে দেখা করতে যান তরুণ ঈশ্বরচন্দ্র। দেখেন, দুগ্ধ দোহনকালে প-িত মশায় গাভীর বাছুরের সাথে লুকোচুরি খেলা খেলছেন। এ ঘটনা অবলোকনের পর তিনি আমরণ দুগ্ধস্পর্শ করেন নি। ওই বয়সে এটা তার কাছে অধিকার হরণ বলে প্রতিভাত হয়েছিল। তাইতো দেখা যায়, সমস্ত জীবন তিনি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকে লোকধর্মের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন।
বাল-বিধবার ক্লিশিত জীবন তাঁকে দারুণভাবে বিচলিত করেছিলো। তিনি তাঁর একমাত্র পূত্র নারায়ণচ-ের সংগে অবোধবয়সের বিধবা ভবসুন্দরীর বিয়ে দিয়ে অতুল আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলেন (১৮৭০)। বিরুদ্ধসমাজ এমন কি জননী ভগবতীর মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি প্রবল মানবতাবোধের কাছে দায়বদ্ধতার বিশ্বাসে। বিদ্যাসাগরের এ উদ্যোগকে ঋষি অভিধায় অভিহিত বঙ্কিমচন্দ্র কটাক্ষ করেছিলেন। তিন তখনকার সব বিরুদ্ধকণ্ঠকে আমলে আনেন নি। কারণ তিনি পদ-পদবি লিপ্সু ছিলেন না কিংবা মতবাদের বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ করেন নি। ত্যাগী এই মানুষটি পঞ্চান্ন বছর বয়সে তাঁর পরিশ্রমলব্ধ সম্পদের যে উইল করেন সেখানে পঁয়তাল্লিশ জনের নাম ছিলো। বিস্ময়ের ব্যাপার এঁদের মধ্যে ছাব্বিশজন অনাত্মীয়। আরো বিস্ময়ের, একমাত্র পুত্র নয়, পুত্রবধূকে উইলের সিংহভাগ অংশীদার করেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের অশেষ মানবীয় গুণাবলী তখনকার কিছু শিক্ষিতজন শুভদৃষ্টিতে দেখেন নি। এটা তিনি বুঝতেন। বাইরের আহরণের শিক্ষা মানবচরিত্রে মহানুভবতা, সহনশীলতা ও পরদুঃখকাতরতা পূর্ণবিকশিত হয় না, তা তিনি জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন বলে শেষ জীবনে এতটুকু প্রশান্তির আশায় গ্রামে তথাকথিত সভ্যতার স্পর্শহীন সাঁওতাল পল্লীতে একখানা বাড়ি তৈরি করে সেখানে অবস্থানের ফলে কিছুটা হলেও প্রশান্তির দেখা পেয়েছিলেন। এই অকৃত্রিম মানববাদী মানুষটি স্বার্থান্ধদের পথের কাটা না হয়েও তার ভাস্কর্যটির হেনস্তা, প্রকান্তরে মনুষ্যত্ব ও মানবতার অপমান। এই মানবতাবাদী মানুষটিকে রবীন্দ্রনাথ ‘অজেয় পৌরুষ’ এবং ‘অক্ষয় মনুষ্যত্বের প্রতিভূ হিসেবে যথার্থই মূল্যায়ন করেছিলেন। মধুসূদন বিদ্যাসাগরের সকল কীর্তি অবলোকনের সময় পাননি। তবুও বিয়াল্লিশ বছর বয়সের বিদ্যাসাগরের চরিত্র মাহাত্ম্য অনুধাবন করে ১৮৬২ সালে ফ্রান্সে অবস্থান কালে লিখেছিলেন: ‘বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে। করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে, /দীনে যে, দীনের বন্ধু!’ লেখাবাহুল্য রবীন্দ্রনাথ তখন মাতৃক্রোড়ে।
সমকাল বিদ্যাসাগরকে স্বস্তি দেয়নি। জীবদ্দশায় কোনো কর্মিপুরুষ তাঁর প্রাপ্য সম্মান পান না সচরাচর। তাঁর তিরোধানের একশো আঠাশ বছর পরে আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজনে তাঁর চরিত্র মাহাত্ম্যের আংশিক দিক অবলোকনের চেষ্টা করেছি। পরিশেষে বিদ্যাসাগরের শিক্ষকতা, শিক্ষা বিশেষ করে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের প্রচেষ্টার প্রসংগ উল্লেখ করবো। এসব বিষয় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। বিনয়ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের সুলিখিত গ্রন্থাদি তার প্রমাণ। সে পথে যাবার দুঃসাহস আমাদের নেই।
বিদ্যাসাগর সামাজিক খ্যাতি, ক্ষমতার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির অভিলাষে শিক্ষাব্রত অবলম্বন করেন নি কিম্বা স্ত্রী শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগী হননি। তাঁর মহান ব্রতছিলো অবহেলিত মাতৃকুল যেন চোখখুলে অবহেলাকারী প্রতিষ্ঠানকে অবলোকন করতে শেখে। সেকালের প্রেক্ষিতে অনেক টাকা বেতনের অধ্যক্ষের চাকরি অবলীলায় ইস্তফা দিয়ে তিনি সহজবোধ্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় মনোনিবেশ করেন। শোনা যায় স্কুল পাঠ্য বই এর মধ্যে একটি নাকি তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় শতবার মুদ্রিত হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ বর্ণপরিচয় ১ম ভাগের ছন্দোবদ্ধ একটি বাক্য ‘জলপাড়ে পাতানড়ে’ পড়ে এমনি অভিভূত হয়েছিলেন যে, ‘জীবনস্মৃতি’তে উল্লেখ করতে ভুলেন নি। বাক্যটি তাঁর কাছে আদি কবির প্রথম কবিতা রূপে প্রতিভাত হয়েছিলো। বিদ্যাসাগরের চাকরি ছেড়ে দেয়ার প্রায় একদশক পরে শিক্ষাব্রতী মিস কার্পেন্টার ইংল্যান্ড থেকে বাংলার স্ত্রী শিক্ষার উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করতে এসে বিদ্যাসাগরকে খুঁজে বের করেন। উল্লেখ্য, মিস কার্পেন্টারের বাবার বাড়িতে সমাজসংস্কারক নারীমুক্তির পথিকৃৎ রাজা রামমোহনরায় একদা আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন।
দীর্ঘ-সময় আমি জীবিকার জন্য শিক্ষকতায় ছিলাম। শিক্ষাভাবনায় বিদ্যাসাগরের রেখে যাওয়া অনুভাবনা অনুসরণ করার চেষ্টা করে এসেছি। নিজের অক্ষমতার জন্য তা চরিতার্থ হয়নি। প্রত্যাশা, আজকের প্রতিভাবান শিক্ষক সমাজ বিদ্যাসাগরের শিক্ষাভাবনা অনুসরণ করে সমাজ ও জীবনকে অতুল গৌরবে ভরে তুলবে সেই সংগে মনুষ্যত্বের অপমানকারীদের ধিক্কার জানাবে।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ