মন্তব্য প্রতিবেদন প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে এখনই

আপডেট: মার্চ ১১, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

ইখতিয়ার উদ্দীন আজাদ


জাতির গলার ফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। সারাদেশে সম্প্রতি একটি প্রধান আলোচিত বিষয় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। এটা একটা বড় ধরনের জাতীয় দুর্যোগ বলা যেতে পারে। জাতীয় দুর্যোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। দল-মত-নির্বিশেষে দেশে সব শ্রেণি পেশার মানুষ দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। এমনটা দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। কিন্তু, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এমনটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এটাকে এখনো জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে মেধা সংক্রান্ত দুর্যোগ আরো বড় ঘটনা। কারণ, এর ফলে একটা সময় জাতি মেধাশূন্য হয়ে যেতে পারে। সেটা একটা দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় মহাদুর্যোগের সূচনা করতে পারে। যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। জানা যায়, এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা স্বাধীনতা-পূর্ব কালে বেশ শক্ত পোক্ত ছিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে নকল করে পাস করার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ৯০ গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার সমূহ নকল প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো নকল প্রতিরোধে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়। ফলে নকল প্রবণতা হতে জাতি বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু, সম্প্রতি নতুন সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সরকার কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য শিক্ষকরাই দায়ী। কারণ, তারা নৈতিকতা বিবর্জিত, কোচিং বাণিজ্য মনোনিবেশ করেন। ক্লাসে পড়ান না, কম সময় দেন”। তিনি আরো বলেন, “শিক্ষমন্ত্রণালও যে শতভাগ দুর্নীতি কমাতে আমরা চেষ্টা করছি।” ইতোমধ্যে মন্ত্রী আরো বলেছেন, “ফেসবুক এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে এ সমস্যার সমাধান করা হবে।” অপরদিকে- প্রাথমিক ও গণ শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন,“একটি মহল সরকারকে অযোগ্য প্রমাণের জন্য প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছে।” এগুলো আসলে কোনো যুক্তিযুক্ত উক্তি নয়। এর মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে সরকারের অসহায়ত্বই ফুঠে উঠছে। কারণ, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ হলে তখন ফটোকপি বিক্রি হবে। অপরদিকে, সরকারকে বিব্রত করার জন্য বিরোধী পক্ষ তো সবসময়ই সক্রিয় থাকবেই। সেটা প্রতিহত করা তো সরকারের সক্ষমতার পরিচয়বাহী।
একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় যদি আগেই প্রশ্নপত্র পেয়ে পরীক্ষা দিয়ে এ প্লাস পায়, তাহলে ওই শিক্ষার্থীর বাঁকি জীবন কেমন হবে?
উল্লেখ্য, মিডিয়ার খবরে জানা যায়, গত ১৮ ডিসেম্বর নাটোর সদর উপজেলার আগদীঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বানু ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে উপজেলার ১২৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির গণিত পরিক্ষা স্থগিতের আদেশ দেন।
গত ১৬ ডিসেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক মাধ্যমে বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলায় ৩৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। পরে প্রশাসন পরিক্ষাগুলো স্থগিত করে দেয়।
২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, জেএসসি, পিএসসি পরীক্ষার অন্তত ৮০টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বা নিয়োগ পরিক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও অহরহ ঘটেই চলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ভাবে এসব বিষয় গুজব বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করলেও তা কাজে আসেনি। তবে এর পরিণতি কী হয়েছে সেটা না বললেও চলে। এখন প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসেও পরীক্ষা স্থগিত করতে হচ্ছে।
এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় হতে নির্দেশনা আসা দরকার। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। এমতাবস্থায় প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া দূরহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। অভিজ্ঞ মহল জানায়, একটু সজাগ হলেই এর সঙ্গে জড়িতদের আটক করা সম্ভব। শুধুমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে দুষ্কৃতিরা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাই এখনই উদ্যোগ নিতে হবে প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধে সবাইকে। বাঁচাতে হবে জাতির ভবিষ্যৎ।
লেখক- সাংবাদিক ও কবি, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি- নজিপুর প্রেস ক্লাব,
রশযঃরৎধুধফ@মসধরষ.পড়স