মরিচে ভাগ্য ফিরেছে পঞ্চগড়ের চাষিদের

আপডেট: জুলাই ৩১, ২০১৭, ১:২১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মরিচের ঝালে মুখ জ্বলে এ কথা ঠিকই, কিন্তু এই ঝাল মরিচই পঞ্চগড়ের অনেক কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। অল্প খরচে চাষ করে ভালো ফলন ও তুলনামূলকভাবে বেশি দাম পাওয়া যায় বলে মরিচ চাষ করে জেলার অনেক কৃষকই স্বাবলম্বী হয়েছেন । এমনকি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও বাজারজাত হচ্ছে পঞ্চগড়ের মরিচ। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মরিচের চাষ তাই পঞ্চগড়ের অনেক কৃষকের ভাগ্য ফিরিয়েছে।
পঞ্চগড় জেলার বিস্তৃর্ণ এলাকায় মরিচ চাষ করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ মৌসুমে মরিচ চাষ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বাজারে ভালো দাম ও চাহিদার বিবেচনায় চাষিরা এগিয়ে এসেছেন মরিচ চাষে। আগে  নিজের প্রয়োজনে বাড়ির আশপাশের কিছু জমিতে মরিচ চাষ  থাকলেও এখন অনেক কৃষকই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মরিচ চাষ করছেন। অল্প জমিতে বেশি ফলন এবং অধিক মুনাফা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে মরিচ উৎপাদনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে ক্ষেত থেকে তুলে কাঁচা-পাকা মরিচ  পাশের রাস্তায়, রাইস মিলের চাতাল, আর বাড়ির উঠোনে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। উঁচু যেসব জমিতে অন্য ফসল ভালো জন্মে না, সেসব জমিতে কৃষকেরা মরিচ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে ২৫-৩০ মণ কাঁচা মরিচ উৎপাদন হয়। আর কাঁচা মরিচকে শুকনা করলে বিঘা প্রতি পাওয়া যায় ৮-১০ মণ। বিঘা প্রতি মরিচ উৎপাদনে খরচ হয় ১০-১৫ হাজার টাকা। উৎপাদিত মরিচ বিক্রি করলে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কাঁচা বা শুকনো দু’ভাবেই মরিচ বিক্রি করা যায়। শুকনো মরিচ বিক্রিতে লাভ একটু বেশি হয়। অন্য যেকোনও ফসলের তুলনায় মরিচ চাষে লাভ বেশি, একারণে কৃষকরা মরিচে ঝুঁকেছেন বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে এ জেলায় ১০ হাজার ১শ’ ৩০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছিল। এ মৌসুমে মরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ২৫০ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও চাষাবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৭শ’ ৯০ হেক্টর জমিতে। পঞ্চগড় জেলায় স্থানীয় জাতের পাশাপাশি বাঁশগাইয়া, মল্লিকা, বিন্দু, হট মাস্টার, সুরক্ষাসহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাতের মরিচ আবাদ করা হয়েছে। জেলার উঁচু জমিতে অন্যান্য ফসল চাষাবাদে ফলন ভালো না হলেও মরিচ চাষে বাম্পার ফলন হয়। এমন জমিই মরিচ চাষে বেছে নিয়েছেন কৃষকরা। জেলার পাঁচ উপজেলাতেই কমবেশি মরিচ চাষাবাদ হয়ে থাকে। তবে আটোয়ারী, তেতুলিয়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলায় মরিচের চাষ হয় সবচেয়ে বেশি।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট এলাকার কৃষক মো. শহিদুল্লাহ, আটোয়ারী উপজেলার মনোজ রায়, তরিকুল ইসলাম, সফিয়ার রহমান, বোদা উপজেলার হকিকুল ইসলামসহ অনেকেই মরিচ চাষ করে ভাগ্য ফিরিয়েছেন।
শহিদুল্লাহ জানান, এ বছর দেড় বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। মরিচ বিক্রি করেছি প্রায় সোয়া লাখ টাকার।
জেলার আটোয়ারী উপজেলার নলপুখুরী গ্রামের মরিচ চাষি মনোজ রায় জানান, তিনি এবছর ২ একর জমিতে মরিচ আবাদ করেছেন। তার ক্ষেত থেকে প্রায় ৮০ মন মরিচ উৎপাদন হয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে লাখ টাকার বেশি আয় হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। একই এলাকার কৃষক সফিয়ার রহমান বলেন, ‘প্রতি মণ মরিচ ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।’
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্য ফসলের চেয়ে মরিচ লাভজনক ফসল। আমি গত পাঁচ বছর ধরে মরিচ চাষ করে আসছি। বলতে পারেন মরিচ চাষ করে আমি এখন স্বাবলম্বী।’
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা এলাকার কৃষক নাজমুল হক জানান, মরিচ দুই সময়ে চাষ করা যায়। গ্রীষ্মকাল আর বর্ষাকাল। বর্ষাকালে মরিচ চাষে লাভ একটু বেশি হয়।
বোদা উপজেলার মাঝগ্রাম এলাকার কৃষক হকিকুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প সময় ও অল্প খরচ এবং কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ার ফসল মরিচ। এ ফসল আবাদে আমাদের হয়রানি কম। যে কোনও স্থানেই মরিচ বিক্রি করা যায়।’
মরিচ চাষে শুধু চাষিরাই নয়, শ্রমিকরাও লাভবান হচ্ছেন। মরিচ ক্ষেতে কাজ করে সংসারে বাড়তি আয় করতে পারছেন নারী শ্রমিকরা। আটোয়ারী উপজেলার ধামোর এলাকার নারী শ্রমিক জবেদা খাতুন বলেন, মরিচ চাষের কারণে আমাদের কাজের অভাব নেই। প্রতিদিন ক্ষেত থেকে মরিচ তুলি। ঢাকি (বাঁশের পাত্র) প্রতি ৪০ টাকা করে পাই। দৈনিক ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা পাই। এ টাকা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলে যায়।
টাঙ্গাইল থেকে মরিচ কিনতে আসা ব্যবসায়ী একাব্বর আলী বলেন, ‘এ জেলার পাতলা (চিকন) ও শুকনা মরিচ অনেক ভালো। প্রতি মণ শুকনা মরিচ ৪-৫ হাজার টাকা এবং অন্য মরিচ ৩-৪ হাজার টাকা মণ দরে ক্রয় করি। পরে এসব মরিচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে থাকি। এতে আমার সংসার বেশ ভালোই চলে।’
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক জানান, পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে মরিচের আবাদ বাড়ছে। জেলার পাঁচ উপজেলাতেই মরিচ চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয় আটোয়ারী উপজেলায়। প্রতি হেক্টরে মরিচের ফলন হয় ৭০-৭৫ টন। টুকটুকে লাল রং ধারণ করায় পঞ্চগড়ের মরিচের চাহিদাও বেশি।’ কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রান্তিক চাষিদের নানারকম প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ায় দিন দিন মরিচের আবাদ বেড়ে চলেছে বলেও জানান তিনি।-বাংলা ট্রিবিউন