বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

মর্যাদাসহ এগিয়ে যেতে দরিদ্র মানুষকে সুযোগ করে দিতে হবে সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জামান

আপডেট: January 25, 2020, 1:00 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


সেমিনারে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জামান আহমেদ-সোনার দেশ

পল্লি কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ বলেন, মর্যাদাসহ এগিয়ে যেতে দরিদ্র মানুষকে সুযোগ করে দিতে হবে। সুযোগ উন্মুক্ত করা না গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হবে না। খারাপ দিকে যেসব মানুষের ঝোঁক তাদের মর্যাদার জায়গায় নিতে হবে। আমাদের কথা ও আচরণে এক হতে হবে। মানুষের মধ্যে প্রত্যয়টা জাগাতে পারলে অন্তর্ভুক্তিটা খুবই সম্ভব হবে। এরজন্য সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি গতকাল শুক্রবার সকালে ইন্সটিটিউট অব সোসাল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাপলায়েড অ্যানথ্রোপলজি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইনক্লুসিভ ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ষষ্ঠ জাতীয় সেমিনারের সেমিনার বক্তা হিসেবে ভাষণ দিচ্ছেলেন। রাজশাহীর আশ্রয় সেন্টারে দুদিনব্যাপি প্রধান অতিথি হিসেবে সেমিনারটির উদ্বোধন করেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম. আব্দুস সোবহান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর এবং ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনের আহবায়ক ড. মো. আহসান আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অতিথি বক্তা ছিলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এএইচএম জিহাদুল করিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মিজান উদ্দীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কাজী তবারক হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. জাহিদুল ইসলাম।
সেমিনার বক্তব্যের উপর আলোচনা করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মনিরুল ইসলাম খান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগের প্রফেসর একেএম মাজহারুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. এম. ইলিয়াস হোসেন ও উইনরক ইন্টারন্যাশনাল বিডি-এর ফরমার কান্ট্রি রিপ্রেজেটিটিভ নাজমুল হান্নান খান।
সেমিনারের উদ্বোধনীতে সঞ্চালক ছিলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. বখতিয়ার আহমেদ।
সেমিনার বক্তা ড. খলীকুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, অন্তর্ভুক্তিটা মানবাধিকারের জায়গা থেকে দেখতে হবে। আর এটা কাউকে অবজ্ঞা করে করা যায় না। অন্তর্ভুক্তি স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। ব্যক্তির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থাকতে হবে। স্বাধীনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগটাই হবে অন্তর্ভুক্তি।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপি অর্থনৈতিক উন্নত হচ্ছে। সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আকাশচুম্বি। পৃথিবীতে যা উৎপাদন হয়- তাতে করে ক্ষুধা থাকার কথা নয়। কিন্তু ব্যাপকভাবে বৈষম্য বিরাজ করছে। প্রযুক্তি গুটিকয়েক মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ১ শতাংশ মানুষের হাতেই পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ।
বৈষম্যের জন্য পৃথিবীব্যাপি অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। বিশ্বে নেতৃত্ব সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। এটা সর্বনাশেরই ইঙ্গিত দেয়।
সেমিনার বক্তা বলেন, বাংলাদেশেও বৈষম্য প্রকট। প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে, গড় আয় বেড়েছে। কিন্তু এই গড়ের পিছনে বিশাল বৈষম্য রয়েছে। অনেকেই গড় আয় নিয়ে, প্রবৃদ্ধি নিয়ে মাতামাতি করে, তারা এই বাইরে যেতেও পারে না।
ড. খলীকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের পর অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়েছে। অবশ্য এর দুটো কারণ আছে। অগ্রগতির জন্য নীতি সহায়ক হয়েছে এবং দেশের মানুষ কর্মমুখি হয়েছে এবং মানুষ আশাবাদী।
তিনি বলেন, সামাজিক সূচকে বাংলােেশর অগ্রগতি হয়েছে, প্রত্যাশিত জীবন ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছেÑ এসব বড় অর্জন। এর আগেও উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সেটার ধারাবাহিকতা ছিল না। এখন ধারাবাহিকতায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা সম্প্রসারিত হয়েছে যদিও এর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।
পিকেএসএফ- এর চেয়ারম্যান খলীকুজ্জামান বলেন, ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনি ইশতেহারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। বৈষম্য ও দুর্নীতির বিষয়টি ইশতেহারে স্বীকৃত হয়েছে। দুর্নীতির কারণে সম্পদ বিদেশে পাচার হচ্ছে, অপচয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, নীতি ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে সমস্যা নাই। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাফলতি হচ্ছে। যারা গাফলতি করছে তাদের বিচারের সম্মুখিন করা দরকার এবং যারা ভাল কাজ করছেন তাদের পুরষ্কৃত করা দরকার। পুরষ্কার অমূলক জায়গায় চলে যাচ্ছে।
মূল্যবোধ ও নৈতিকতকার সঙ্কট আছে। নিজের অধিকার বুঝবো কিন্তু অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করবো- এই মূল্যবোধহীনতা আছে। এর ফলে লোভ-লালসা উৎসাহিত হচ্ছে।
প্রধান বক্তা বলেন, প্রাকৃতিক দুযোগ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতগুলো সমন্বিতভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। এটা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়Ñ মানুষকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। যে যার অবস্থান থেকে কাজ করলে ওদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, দেশে অতিদরিদ্র ১০ শতাংশ, দরিদ্র সীমার নিচে ২০ শতাংশ মানুষ আর ৩০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ঝুঁকিতে আছে। অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনটা এখানেই। এদের দিকেই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আর এটা করতে হলে মানুষের কাছে যেতে হবে। তাদের মত করেই তাদের সমস্যা বুঝতে হবে এবং তাদের সমক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতিটা কোথায় সেটাই আগে পূরণ করতে হবে। বহুমাত্রিক দারিদ্র আমলে নিয়েই অন্তর্ভুক্তিটা ন্যায্যভাবেই করতে হবে এবং সেটাই হবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন।
দক্ষ মানুষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। ২০১১ সালে দক্ষতা উন্নয়ন নীতি হয়েছে। ২০১৭ সালে কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। এটা নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রক্রিয়ায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যুরোক্রেসি এখন সর্বত্রই- বিশ্ববিদ্যালয়েও।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য আত্মিক উন্নয়নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে উন্নয়নটা করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু যা বলতেন সেটা নিজে করেছেন সাহসের সাথে। তিনি সেটা পেরেছিলেন বলেই এই দেশটা স্বাধীন হয়েছে।
তিনি বলেন স্বাধীনতার অর্থ তার নিজের কাছে অধীন থাকা। জবাবদিহিতাটা নিজের কাছে। মূল্যায়ণটা নিজেকেই করতে হবে। এটা না হলে জবাবদিহিতা ও মূল্যায়ণটা কোনো ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা যায় না। যারা উঁচু অবস্থানে আছেন তারা যদি নিচের দিকে না তাকান তা হলে কাক্সিক্ষত উন্নয়নটা হবে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ