মহাকাশে অপরাধ-বিচার কী হবে?

আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


প্রশ্নটি সামনে এসেছে সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা (নাসা)’র কাছে দেয়া একটি অভিযোগ কেন্দ্র করে। সেখানে মার্কিন মহাকাশচারী অ্যানি ম্যাক্লেইনের বিরুদ্ধে তাঁর সাবেক জীবনসঙ্গী সামার ওর্ডেন অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ অ্যানি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ অবস্থান করার সময় শক্তিশালী কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মহাশূন্য থেকে ওর্ডেনের ব্যাংক একাউন্টে অনধিকার প্রবেশ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওর্ডেনের ব্যাংক লেনদেন গোপনে নজরদারি করেছেন! অভিযোগ পাওয়ার পর মহাকাশে ঘটা প্রথম ‘অপরাধ’-এর তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু করছে নাসা।
পৃথিবীর ভূমিতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীকে গ্রেফতার করার জন্য প্রত্যেক দেশে পুলিশ আছে, বিচারের জন্য ফৌজদারি আইন ও আদালত আছে। কিন্তু মহাকাশে কেউ অপরাধ করলে সেক্ষেত্রে কোন আইন ও আদালতে বিচার হবে-এই প্রশ্নের উত্তর মোটেই সরল নয়। প্রথমেই মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী মহাসাগরের মতো মহাকাশ ও ‘Res Communis. অর্থাৎ পৃথিবীর সবার মালিকানাধীন বা কারো একক মালিকানাধীন নয়-কোনো দেশ এই মহাকাশ বা মহাকাশস্থিত চাঁদ-সূর্য বা কোনো গ্রহ-নক্ষত্রের একক মালিকানার দাবিদার হবে না।
তবে মহাকাশে অভিযান পরিচালনা, মহাকাশযানের মালিকানা এবং মহাকাশযানের অভ্যন্তরে নভোচারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য পাঁচটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বলবৎ আছে যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১৯৬৭ সালের ‘Outer Space Treaty.’ এই চুক্তি অনুসারে কোনো মহাকাশযানের ভেতরে কোনো নভোচারী দ্বারা যদি অপরাধ সংঘটিত হয় তাহলে সেই মহাকাশযানের মালিকানা যে দেশের সেই দেশ ওই অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার রাখবে। বলাবাহুল্য মহাকাশে যেহেতু কোনো পুলিশ বা আদালত নেই তাই নভোচারী পৃথিবীতে ফেরত আসার পরেই তার বিচার শুরু হবে। বিষয়টা ঘোঁট পাকাবে যদি মহাকাশযানের মালিকানার দেশ আর নভোচারীর দেশ ভিন্ন হয়। যেমন একটি মার্কিন মহাকাশযানে একজন অস্ট্রেলিয়ান নভোচারী কোনো অপরাধ করলো এবং অস্ট্রেলিয়া নিজের নাগরিকের বিচার নিজ দেশে করতে চাচ্ছে। বিষয়টি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন অপরাধটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন-এ সংঘটিত হয়। কারণ এটি একক কোনো দেশের মালিকানায় নেই। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এর মালিকানা পাঁচটি দেশের- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান এবং ক্যানাডা।
এখানে ইউরোপকে একটি দেশ হিসেবে দেখা হয়। মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়ে ১৯৯৮ সালে এই পাঁচটি দেশের মধ্যে যে আন্তঃসরকার চুক্তি হয় সেখানে বলা আছে- আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, এর যন্ত্রপাতি এবং এই স্টেশনে অবস্থান করা নভোচারীদের ওপর এই দেশগুলোর নিজস্ব আইন নভোচারীদের জাতীয়তার ভিত্তিতে কার্যকর হবে। সুতরাং, কোনো ক্যানাডিয়ান নাগরিক যদি মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে অপরাধ ঘটান, তাহলে তিনি ক্যানাডিয়ান ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়বেন। একইভাবে রুশ নভোচারীরা রাশিয়ার আইনের অধীন থাকবেন। এটি স্পষ্ট যে, উপরে উল্লেখিত ঘটনায় অভিযুক্ত অ্যানি ম্যাক্লেইন এবং অভিযোগকারী সামার ওর্ডেন দুজনেই যেহেতু মার্কিন নাগরিক তাই এই ঘটনার বিচার যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি আইনেই হবে। যদি দুজনের একজন ভিন্ন দেশের নাগরিক হতো সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজের দেশে বিচারে আগ্রহী না হলে অপর দেশের ফৌজদারি আইন প্রযোজ্য হতো। মুশকিল হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বিভিন্ন পার্ট বা মডিউলের মালিক ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি দেশ। এখন নভোচারীদের দেশ আর স্টেশনের যে পার্টে অপরাধ সংঘটিত হলো সেই পার্টের মালিকানা যদি ভিন্ন কোনো দেশের হয় তাহলে কোন দেশের আইন প্রযোজ্য হবে? উদাহরণস্বরূপ ‘ক’ নামের নভোচারী ‘ক’ নামক দেশের নাগরিক। সে ’খ’ দেশের ‘খ’ নামের আরেক নভোচারীর মোবাইল চুরি করলো মহাকাশ স্টেশনের এমন একটি অংশ হতে যেটির মালিকানা আবার ‘গ’ দেশের। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, পার্টনার দেশগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু কোনো নভোচারী যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব ধারণ করে সেক্ষেত্রে তার বিচার কোন দেশে হবে? সমস্যা আরো আছে-পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের ভূখণ্ড নির্ধারিত কিন্তু মহাকাশে তো আর এমন কোনো বাউন্ডারি নেই। তাহলে আকাশের ঠিক কোন উচ্চতা থেকে মহাকাশ বা স্পেস- জুরিসডিকশান শুরু হবে- সেই প্রশ্নেও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীর কারো ব্যাংক একাউন্টে বেআইনি অনুপ্রবেশ মহাকাশে সংঘটিত প্রথম অপরাধ এবং প্রকৃতি বিবেচনায় হয়তো খুব গুরুতর অপরাধ নয়। কিন্তু সেটি আরো গুরুত্বপূর্ণ যেসব প্রশ্নের দরোজা খুলে দিয়েছে তা হলো- মহাকাশে কেউ খুন, ধর্ষণ, আকাশ-দস্যুতা বা মানবাধিকার লংঘনের মতো অপরাধ করলে কী হবে? অথবা মহাকাশে বসে পৃথিবীতে অপরাধ পরিচালনা করলে এটির আইনি পরিণতি কী? এখনো হয়তো মহাকাশে বিচরণ নাসা এবং মহাকাশ স্টেশনের গুটিকয়েক নভোচারীদের মধ্যে সীমিত আছে। কিন্তু মহাকাশ পর্যটন বা স্পেস ট্যুরিজম এর সম্ভাবনা দিন দিন উজ্জ্বলতর হচ্ছে।
২০০১ সালে মার্কিন ধনকুবের ডেনিস টিটু প্রথম মহাকাশ-পর্যটক হিসেবে মহাকাশ থেকে বেড়িয়ে এসে স্পেস-ট্যুরিজমের যে দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন তারপর এই অব্দি সাতজন পর্যটক মহাকাশে নিজের টাকায় ঘুরে এসেছেন। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়বে: স্পেস-রিসোর্ট, স্পেস-রেস্টুরেন্ট, স্পেস-পার্ক গড়ে উঠবে, কেউ কেউ হয়তো মহাকাশে বিয়ে করতে চাইবে, কেউ সন্তান জন্ম দেবে মহাকাশে, কেউ চাইতে পারে বিচ্ছেদ, কেউ মঙ্গল গ্রহে কিংবা চাঁদে বসতি গাড়তে চাইতে পারে। এই নিয়ে মহাকাশে লাগতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সূচনা হতে পারে নানান ফৌজদারি অপরাধের। স্পেস-পুলিশ, স্পেস-জেল, স্পেস-কোর্ট ইত্যাদির সম্ভাবনাও কি উড়িয়ে দেওয়া যাবে? ‘No One is Above the Law’ পাতাল থেকে অন্তরীক্ষ- আইন কোথায় নেই! আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটিই আইনের সৌন্দর্য।