মহাদেবপুরে আবাসন প্রকল্পের বেহাল অবস্থা

আপডেট: অক্টোবর ৮, ২০১৯, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

এমদাদুল হক দুলু, বদলগাছী


দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বসবাসের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে মহাদেবপুরের নাটুয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প-সোনার দেশ

নড়বড়ে ঘর, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিম্নমানের জীবনযাপন ও জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যার মধ্যদিয়ে দিন কাটছে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার খাজুর ইউনিয়নের নাটুয়াপাড়া (বড়বিলা) আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের। জরাজীর্ণ আশ্রয়ণ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি সংকট, নাজুক স্যানিটেশন ও বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
জানা যায়, অপরিকল্পিতভাবে বিলের মধ্যে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পটি গত ১০/১২ দিন পূর্বের বৃষ্টিতে প্লাবিত হওয়ায় বাসিন্দাদের চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্লাবিত হওয়ার ছয় দিন পরেও এ আবাসনের প্রায় ৫০টি ঘরের কাদা-পানি এখনো শুকায়নি। নরী-শিশুসহ শত শত বাসিন্দারা পানি দিয়ে চলাচল করছে। এদিকে প্রকল্পের এক যুগ অতিবাহিত হলেও ফিরে যাওয়া পরিবারগুলো আর আবাসনে ফিরে আসেননি। বর্তমানে ২’শ ২০টি পরিবারের মধ্যে বসবাস করছে ১’শ ৬০টি পরিবার। বাঁকি পরিবারগুলো তাদের বরাদ্দকৃত ঘরে তালা ঝুলিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় , ঘরের টিনের ছাউনি ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি পড়ে মাটির মেঝে ভিজে একাকার। টিনের ছিদ্র বড় হয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে। এ কারণে ঘরে কর্দমাক্ত আর বাইরে হাঁটু জল। অনেকটা ঘরের মধ্যেই বন্দি জীবন কাটাতে হয় তাদের। মরিচা ধরে দরজা জানালাও ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এগুলো বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ছাউনির ওপর পলিথিন, ইট, কাঠ, মাটি দিয়ে কোনোরকম বৃষ্টির পানি ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ বাসিন্দারা। বিছানা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভেজার ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। বৃষ্টি হলে বিছানা গুটিয়ে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাতভর বসে থাকতে হয়। ভোর হলেই তাদের যেতে হয় দিন-মজুরের কাজে। এভাবেই অতিকষ্টে তারা জীবনযাপন করছে। তবুও গরীব মানুষেরা অনোন্যপায় হয়ে এতেই বসবাস করছে। কোটি টাকা ব্যয়ে দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করলেও বর্তমানে বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্প নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব সমস্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কাছে বারবার ধরনা দিলেও মিলছে না কোনো সমাধান। ফলে কোনো কোনো বাসিন্দা আশ্রয়ণ ছেড়ে চলে গেছেন অন্যত্র। অতিদ্রুত সংস্কারের দাবি এখানকার পুনর্বাসীতদের।
আবাসনের বাসিন্দা রওসন, মকলেছার, ইমান সরদার ও গহের আলী বলেন, ‘ঘরের চালের ভাঙা টিন দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। তখন বিছানা ও জামা কাপড় পানিতে ভিজে যায়। বৃষ্টির কারণে রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারি না। নাট-স্ক্রু ও সিমেন্টের খুঁটি খসে পড়েছে। একটু ঝড় হলেই ঘরগুলো দোলে। তখন ভীষণ ভয় লাগে। এই ভাবে কষ্ট করে আমাদের দিন-রাত কাটাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে কখনো হাটু পানি আবার কখনো বন্যা আমাদের ঘর-বাড়ি তছনছ করে ফেলে। সরকার তা ঠিক করে দিচ্ছেন না। টাকার অভাবে আমরাও ঠিক করতে পারছি না।’
আবাসনের সাধারণ সম্পাদক বাবলু আলী বলেন, এ আবাসনে ১’শ ৬০টি পরিবারের পাঁচ শতাধীক মানুষ বসবাস করে। অধিকাংশ ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহের সোমবার-মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে আবাসনের ২’শ ২০টি বাড়ির মধ্যে ১’শ ৮০টি বাড়ি ও তিনটি পুকুর প্লাবিত হয়েছে। কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও সরকারি কোনো সহযোগীতা না পাওয়ায় বাসিন্দাদের বড় কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পুনর্বাসিত পরিবারের লোকজন প্রথম দিকে আনন্দের সঙ্গে ঘরগুলোতে বসবাস শুরু করলেও বর্তমানে নানা সমস্যার কারণে বিভিন্ন পরিবার আবাসন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটু নজর দিলে আশ্রয়নবাসীর কষ্ট থাকবে না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল করিম বলেন, ‘এ এলাকাটি প্লাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
এবিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মো. বেলাল উদ্দিন জানান, অল্প বৃষ্টিতেই আবাসন ডুবে যায়। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। টিনের ছাউনি নষ্ট হয়ে পানি পড়ে ঘরে। জরাজীর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে লোকজন। সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না তারা। আমি বর্তমান এমপিসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি যাতে পুনর্বাসিতরা কিছু ত্রাণ সহায়তা পায়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মুলতান হোসেন বলেন, ‘আমাদের কিছুই করার নাই। সরকার একবার ঘর করে দিয়েছে বাঁকিটা এখন নিজেদের করতে হবে। সরকার সংস্কার করে দিবে না।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘নাটুয়াপাড়া (বড়বিলা) আবাসনটি বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হওয়ার বিষয়ে আমি গতকাল শুনেছি। বর্তমানে পানি নামছে। বন্যার কারণে জেলা থেকে যে বরাদ্দ দিয়েছিল তা আর নেই। বিষয়টি আমরা জেলা প্রশাসনকেও জানিয়েছি। তিনি আমাদের সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ