মহাদেবপুরে ধান খেতের পোকা দমনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পার্চিং পদ্ধতি

আপডেট: অক্টোবর ৪, ২০১৮, ১:২৫ পূর্বাহ্ণ

এম.সাখাওয়াত হোসেন,মহাদেবপুর


মহাদেবপুরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পার্চিং পদ্ধতিতে ধান খেতে পোকা দমন-সোনার দেশ

বরেন্দ্র অঞ্চলের খাদ্যগোলা বলে খ্যাত নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিনা খরচে পোকা দমনের পরিবেশ বান্ধব পার্চিং পদ্ধতি। ক্ষতিকর পোকা দমনে এক সময় জমিতে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। এখন সে প্রবণতা কমেছে। ধান খেতে পোকা খেকো পাখি বসার ব্যবস্থা করে পোকা দমন করা হচ্ছে। উপজেলার ধান খেতের মাঝে ১৫-২০ হাত দূরে দূরে বিভিন্ন গাছের ডাল, বাঁশের খুঁটি, বাঁশের কঞ্চি পুঁতে পাখি বসার পরিবেশ করে পোকা দমন করছেন কৃষকরা। সেখানে কিছুক্ষণ পরপর উড়ে এসে বসছে আর খেতের পোকা ধরে খাচ্ছে নানা জাতের পাখি। এভাবে কীটনাশক ছাড়া সহজেই দমন হচ্ছে পোকা।
পোকা দমনের পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতির নাম পার্চিং পদ্ধতি। পার্চিং ইংরেজী শব্দ। পাখি বসে এমন উঁচু ডাল বা খুঁটির নাম পার্চ। আর পার্চ থেকে পাচিং নামের উদ্ভব। ফসলের জমিতে ধৈঞ্চা গাছ, ডাল, কঞ্চি, বাশের খুঁটি এগুলো পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকা মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। ফসলের পোকা দমনের এই পদ্ধতিতে অত্যন্ত কমব্যয় এবং পরিবেশবান্ধব। পার্চিং পদ্ধতি দুই প্রকার- ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। মরা ডালপালা পুঁতে দিলে তা হবে ডেড পার্চিং এবং ধৈঞ্চা, কলা গাছ ইত্যাদি জীবন্ত পুঁতে দিলে তা হবে লাইভ পার্চিং। কীটনাশক ছাড়াই পোকা দমনের এই পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে ধানের জমিতে পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছেন এ উপজেলার কৃষকরা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ২৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কৃষকরা ২৮ হাজার ৯’শ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে এই উপজেলার অত্যন্ত জনপ্রিয় চিনি আতব ধান চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে পোকা দমন করছেন কৃষকরা। এতে ফসলের জমিতে কীটনাশক ব্যবহার অনেকাংশে কমে গেছে। উপজেলার এনায়েতপুর ইউপিতে কর্মরত উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুল ইসলাম জানান, পোকা দমনে এই পদ্ধতি শতকরা ৭৫-৮০ ভাগ কার্যকর। এ পদ্ধতি ব্যবহারে প্রতি একরে কীটনাশকের ব্যয় কমেছে দুই হাজার টাকারও বেশি। পাশাপাশি কৃষকেরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করায় পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। উপজেলাপর মহাদেবপুর সদর, এনায়েতপুর, উত্তরগ্রাম, খাজুর, হাতুড়, চান্দাশ, সফাপুর, ভিমপুর, রাইগাঁ ও চেরাগপুর ইউপির বিভিন্ন এলাকার ধান খেতে পার্চিং পদ্ধতির ব্যবহার দেখা গেছে। জমিতে পুঁতে দেয়া গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চিতে দিনের বেলা শালিক, ফিঙে, বুলবুলি ও রাতে পেঁচাসহ নানা জাতের পাখি এসে বসছে। যে জমিতে পোকা বেশি সেই জমিতে পাখির আনাগোনাও বেশি। এ বিষয়ে বাংরাদেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) নওগাঁ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ধান লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে জমিতে ডাল পুঁতে দিচ্ছেন কৃষকরা, ওই ডালে পাখি বসে পোকা ধরে ধরে খেয়ে ফেলছে। এ পদ্ধতি ব্যবহারে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না বিধায় উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাচ্ছে। ধান খেতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে। এবং উল্লেখযোগ্যহারে এই উপজেলায় পাখির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, পার্চিং পদ্ধতি ধান চাষে অত্যন্ত কার্যকরী ও পরিবেশ বান্ধব সুন্দর একটি পদ্ধতি। কৃষকদের মাঝে এ পদ্ধতি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কীটনাশক ব্যবহার না করে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করায় কৃষকদের ফসল উৎপাদনে খরচ কমে যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে মহাদেবপুর উপজেলায় ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।