মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ : হতাশাই পুনর্ব্যক্ত হচ্ছে!

আপডেট: June 30, 2020, 12:13 am

মিথুশিলাক মুরমু:


সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৫ বছর অতিবাহিত হলেও আদিবাসী সাঁওতালরা অত্যাচার-নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, উচ্ছেদ-উদ্বাস্তুকে জীবনের অংশ হিসেবে হিসেবে মেনে নিয়েছে। না মেনে উপায় তো নেই, যাদের কাছে সাধারণ মানুষ আশ্রয় খোঁজে, নিরপেক্ষতামূলক আচরণ করবে, ন্যায্যতার জায়গা থেকে সঠিক কথা বলবে; এরূপ মানুষের সংখ্যা ক্রমশঃই কমে আসছে। সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় থেকে প্রায়শঃই পরিচিত-অপরিচত ভুক্তভোগীরা নানান ধরনের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট, ক্ষোভ ও ভাগ্যের নিমঅম পরিহাস হিসেবে বর্ণনা করেন। সবিস্তর শোনার পর হতাশা, নিরাশা এবং স্রষ্টার কাছে নিজেদেরকে সঁপে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না। আজ থেকে ১৬৫ বছর পূর্বে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলো সাঁওতালসহ আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তভ, সমরূপভাবেই এখনো পরিস্থিতি বিরাজমান।

অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান, প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় থাকা পেশীশক্তির ব্যক্তিরা তৎকালীন সময়ে নিরক্ষর আদিবাসী সাঁওতালদের চরমভাবে ঠকিয়েছে। দিনের পর দিন শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো। সহজ-সরল ও ঠাণ্ডা প্রকৃতির সাঁওতালরা খুব সহজে কারো প্রতি বিরূপ মানোভাব পোষণ করেন না। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েই বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছিলো। অর্থনৈতিকভাবে অবস্থাসম্পন্ন জমিদার-মহাজনরা কোনোভাবে একবার আদিবাসী সাঁওতাল গ্রামে ঢুকেছে; সেই গ্রামের প্রতিটি ব্যক্তিকে ছলে-বলে কৌশলে ঋণের খাতায় নাম লিখিয়েছে। আর যেই ঋণগ্রস্ত হয়েছে, একই ঋণের বোঝা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টেনেছে কিন্তু ঋণের দায়গ্রস্ততা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ঘরের ঘটি-বাটি, মাল-জাল, গরু-ছাগল থেকে নারীদের হাতের বালা পর্যন্ত জোরপূর্বক নিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে।

 

এই যে মান-সম্মানের, সম্ভ্রমের সীমারেখাকেও অতিক্রম করেছে। নারীরা সম্ভ্রম খুইয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে এবং হত্যার শিকার হয়েছে। আদিবাসীদের অব্যক্ত কথাগুলো প্রশাসনে থাকা ব্যক্তিবর্গরা আমলে না নিলে সংগ্রামের পথকে বেছে নিয়েছিলো। ১৬৫ বছর পর কী অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে? এখন আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করতে পারি, মোবাইলের সাহায্যে সাহায্যের আবেদন করতে পারি; কিন্তু প্রশাসন অনড়। লিখিত অভিযোগ দেবেন, তাতে কী হয়েছে; প্রশাসনের দায়িত্ববানরা অভিযোগটি টেবিলের ড্রয়ারে রাখেন। কোর্টে মামলা করবেন, মামলার তদন্ত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ দায়সারা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে অভিযুক্তদের পক্ষে সাফাই গাইবেন। সত্যিকারের বিষয়টি মিথ্যার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য।

 

সর্বশেষ বিগত ১৬ জুন অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আদিবাসী সাঁওতাল মেয়েকে দলগতভাবে ধর্ষণের ঘটনায় চুনারুঘাটে পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিতের পরও মামলা নিতে গড়িমসি করেছে; দীর্ঘ সাত সাতটি দিন খুইয়েছে। চুনারুঘাট থানা ওসি শেখ নাজমুল হোসেন স্বীকার করেছেন, ‘ঘটনাটি আমাকে অনেকেই ফোনে জানিয়েছে। এখনও থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে আমরা ঘটনাটি খোঁজখবর নিতে শুরু করেছি’ (কালের কণ্ঠ ২২.৬.২০২০)। আমার বাংলাদেশ প্রশাসনিকভাবে স্মার্ট কিন্তু যারা দুর্বল, অবহেলিত, অপাক্তেয় হিসেবে গণ্য, তাদের বিষয়ে উদাসীন হলে একদা তাদের হৃদয়ের কান্না স্রষ্টার দরবারে পৌঁছায়। মহান সাঁওতাল বিদ্রোহে ৩০ হাজার সাঁওতাল শহিদের পরেই ইংরেজ সরকার উপলব্ধি করেছিলো, সাঁওতালদের সমস্যা, অভিযোগ, অব্যক্ত কথাগুলো শ্রবণ করা খুবই দরকার ছিলো। ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের প্রতি প্রায়শ্চিত্তমূলক ‘সাঁওতাল পরগনা’ নামে নন রেগুলেটেড অঞ্চলের প্রবর্তন করে কিছুটা স্বস্তি পেতে চেষ্টা করেছে।

ইতিহাসে প্রতিটি বিদ্রোহের একটি ন্যায়ভিত্তিক মানদণ্ড রয়েছে। ক্ষমতার দাপটে হোক কিংবা বিত্ত বৈভবের অহমিকায় হোক; মাঠের মানুষের কথাগুলোকে দায়িত্বপ্রাপ্তরা তেমন গুরুত্বারোপ করেন না। আমার বাংলাদেশের সাঁওতালসহ আদিবাসীরা বার বার সরকারের কাছে তাদের কথাগুলো পৌঁছে দেবার মানসে প্রাণপণ করেন।

 

চলমান করোনা ভাইরাসের মতো দুর্যোগকালেও আদিবাসীদের ওপর আক্রমণ, নারী নির্যাতন, জমি দখল, উপাসনালয়ে হামলার প্রতিবাদ ও প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা ৩১ মে, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে স্বরাষ্টমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। প্রেরিত স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ‘এই দূর্যোগময় পরিস্থিতির মধ্যেও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা ও জখম, তাদের জমি জবরদখল ও জবরদখলের অপচেষ্টা, ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি, মন্দিরে হামলা ইত্যাদির মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। বিএনপি’র আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পর মন্ত্রীরা গণমাধ্যমের খবরকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করতেন। আওয়ামী লীগ আমলে সে রকমটি হয়নি। সরকার রামু ও নাসিরনগরে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে। কিন্তু বেদনার দিক হলো, কোনো ঘটনায়ই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যায়নি বা আনা হয়নি। রামুর ঘটনায় এখন নাকি সাক্ষীই পাওয়া যাচ্ছে না। আর নাসিরনগরের ঘটনা ঘটেছিল আওয়ামী লীগের উপদলীয় কোন্দলের জের ধরে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সংখ্যালঘুদের ‘গিনিপিগ’ বানানো হয়। অর্থাৎ ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে কিন্তু ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবন ও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।

 

সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৫ বছর পর আমার দেশের মানুষ শিক্ষিত হয়েছেন; প্রযুক্তির ব্যবহার করে তথ্যের লেনদেন সহজপ্রাপ্ত হয়েছে; বিচারিক কাজে ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে কিন্তু এখনো বিচারের বাণী এখনো নিরবে নিভৃতে কাঁদে। বহুল আলোচিত নওগাঁ ভীমপুরের আলফ্রেড সরেন, গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জের হত্যা মামলা, দিনাজপুর ফুলবাড়ির ঢুডু হেমরম হত্যা মামলাসহ অসংখ্য মামলা আদালতে ঝুলে আছে কিন্তু আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। রাজশাহী গোদাগাড়ীর মরিয়ম মুরমু হত্যার রায় আদালত কর্তৃক ও পীরগঞ্জ রাণীশংকৈল বিশাল সম্পত্তির রায় হাইকোর্ট থেকে ঘোষিত হলেও প্রশাসন কার্যকর করতে কালক্ষেপণ করে চলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন, আদিবাসী সাঁওতালদের শত বছরের হৃদয়ে সংগ্রোথিত বিশ^াসকে ভেঙে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও দৃষ্টান্তমূলক রায় কার্যকর করে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করবেন। সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসে এটিই আমাদের প্রার্থনা ও প্রত্যাশা।
লেখক: সংবাদকর্মি, কলামিস্ট