মাথাব্যথার নাম সঞ্চয়পত্র

আপডেট: ডিসেম্বর ১১, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বিত্তশালী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবার সঞ্চয়ের ভরসার বড় জায়গা হলো সঞ্চয়পত্র। এর সুদের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আইন লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগ করছে সঞ্চয়পত্রে। তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ বড় হচ্ছে। এতে সরকারের মাথাব্যথাও বাড়ছে।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমাতে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সুদহার কমানোসহ বেশকিছু প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর প্রস্তাব করেছে। অর্থমন্ত্রীও সুদহার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। কারণ সামনে নির্বাচন। নির্বাচনের আগে সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) এ ইস্যুতে হাত দিতে চায় না সরকার। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় সরকারের ঋণ বাড়ছে। এটা সত্য। কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের একটা বড় জায়গা। মানুষের সঞ্চয়কে গুরুত্ব দেয়া সরকারের দায়িত্ব। সেটাই করা হচ্ছে। আপাতত সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরে হয়তো নেয়া হতে পারে। বিষয়টা বিবেচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় বর্তমানে আমানতের সুদের গড় হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। শেয়ারবাজারের অবস্থাও নাজুক। ফলে টাকা বিনিয়োগের এ দুই বড় ক্ষেত্র থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য মানুষ সরকারি সঞ্চয়পত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্য যেকোনো খাতে বিনিয়োগের তুলনায় এখানে মুনাফার হার প্রায় দ্বিগুণ, গড়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ। এছাড়া এ খাতে বিনিয়োগে অর্থের উৎস সম্পর্কে এখনও কোনো প্রশ্ন করা হয় না। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা সরকারের।
মূলত সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা দেয়ার জন্য সরকার নিম্ন-মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এ প্রকল্প চালু করে। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের এ মুনাফার অধিকাংশ ভোগ করছে সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ কারণে এ খাতে বিনিয়োগে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর।
সব ব্যাংকের কাজ হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা কিন্তু অধিদফতরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিক্রির দায়িত্ব পেয়ে তারা উল্টো কিনে নিচ্ছে সঞ্চয়পত্র। যেমন- ইস্টার্ন ব্যাংক ১৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে রেখেছে, যার মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে নয় কোটি ১৫ লাখ টাকা। ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছে আইএফআইসি ব্যাংক। তাদের মুনাফা হয়েছে আট কোটি ৭৬ লাখ টাকা। পূবালী ব্যাংকের বিনিয়োগ আট কোটি টাকা। যার মুনাফার হার চার কোটি ৮০ লাখ টাকা। দুই কোটি ৯৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে সিটি ব্যাংক এনএ। তাদের মুনাফা হয়েছে ২০ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার বিনিয়োগের পরিমাণ দুই কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আর মুনাফা হয়েছে এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এইচএসবিসি ব্যাংক কিনেছে ২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। তাদের মুনাফা হয়েছে ১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর এবি ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ দুই কোটি টাকা, যার মুনাফার অংক হচ্ছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা।
সঞ্চয়পত্র কেনার দৌড়ে পিছিয়ে নেই বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও। ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। যার মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একই কর্ম করেছে লিভার ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এতে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৫ কোট ছয় লাখ টাকা।
বার্জার পেইন্ট কিনেছে ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। তাদের মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। একইভাবে পিপলস সিরামিক কিনেছে চার কোটি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, যার মুনাফার হার এখন ৬০ লাখ টাকা। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়েও স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক কিনেছে এক কোটি ৯০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ লাখ টাকা। এনজিও আশা’র নামও আছে সঞ্চয়পত্র ক্রেতার তালিকায়। প্রতিষ্ঠানটি কিনেছে চার কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। এর মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিএটিবি কোম্পানি লিমিটেড কিনেছে তিন কোটি ৮৬ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। মুনাফা হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা। নোকিয়া ইএ কিনেছে ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র। যার মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এছাড়া ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো কিনেছে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, যার মুনাফা হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মোট ১৬ প্রতিষ্ঠান কিনেছে ১৯০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। তাদের মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, এটা আইনের পরিপন্থী হলে করা ঠিকই হয়নি, বরং তাদের লভ্যাংশ ফেরত দিতে হবে। কারণ এটা আইনবহির্ভূত। এজন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। সঞ্চয়পত্র নিম্ন আয়ের বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের বিনিয়োগের জায়গা। এটার একটা সীমারেখা আছে, কারা কারা বিনিয়োগ করতে পারবে। সঞ্চয়পত্রের যে অপব্যবহার হচ্ছে এটা তার একটি উদাহরণ। এজন্য সুদহার কমানো হচ্ছে। কিন্তু এটা ঠিক না। সরকারের এ ব্যাপারগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনে টাকা ফেরত নিতে হবে। শুধু এসব প্রতিষ্ঠান নয়, অনেক ধনীও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা সুস্পষ্ট করতে হবে বলেও জানান তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গেল বছরের ২৩ মে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশ কমানো হয়। এতে পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ করা হয়। পেনশনার সুদহার সঞ্চয়পত্রের ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশে পুনর্র্নিধারণ হয়। পাঁচ বছর মেয়াদে বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের বর্তমান সুদহার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, আগে ছিল ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি ও সাধারণ হিসাবে বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ হারে সুদ দেয়া হচ্ছে। আগে দেয়া হতো ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে প্রবাসীদের জন্য ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের (পাঁচ বছর মেয়াদি) সুদের হার আগের মতো ১২ শতাংশই রাখা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা প্রিমিয়াম নামে আরও এক থেকে দেড় শতাংশ সরকার থেকে ভর্তুকি দেয়া হতো। সেটিও তুলে দেয়া হয়েছে। ফলে মুনাফার হার আরও কমে গেছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-অক্টোবর ২০১৭) প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট আয় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। চার মাসের একত্রিত হিসেবে বছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। আর চার মাসে মোট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ৪২ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।-জাগোনিউজ