মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান: দিনাজপুরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ

আপডেট: মে ৩০, ২০১৮, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

কুরবান আলী, দিনাজপুর


সারাদেশজুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনায় দিনাজপুর জেলার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিলেও অনেকেই বন্দুকযুদ্ধ থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ ও কারাবরণ করছে। এসব কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম কিছুটা কমলেও একেবারেই বন্ধ হয়নি বলে জানা যায়।
১৯ মে এ জেলায় প্রথম এক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। এরপর ২১ মে ও ২৬ মে মারা যায় আরও ২জন। এছাড়াও নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের গুলিতে অপর ১ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। পর পর সব বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় এবং নিয়মিত পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা আটক হওয়ার ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে। তবে এখনও এসব এলাকায় মাদক পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অতি গোপনে এ ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছেন বলে জানা যায়।
এই প্রতিনিধিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার মাস্তানবাজার এলাকার একজন জানান, গাবুড়া ও বলতৈড় এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের প্রভাব এতটুকু কমেনি। প্রতিদিনই মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এলাকার কিছু মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের সহযোগিতায় শহর থেকে লোকজন এসব স্থানে এসে মাদক সেবন করে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জেলার রামসাগর, গাবুড়া, কালুরমোড়, রাজবাটী, নয়নপুর, বিরল শালবাগান, তেঘড়া, কমলপুর, ডাইলের মোড়, হাজির মোড়, বালুয়াডাঙ্গা, কাঞ্চন মোড়, কাঞ্চন কলোনি, মাসিমপুর, মোহনপুর, স্টাফ কোয়ার্টার, ৮নম্বর রেলঘুমটি, দশমাইল, হঠাৎপাড়া, হিলির মংলা, বিরামপুরের কাটলাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদকের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা হয়। এসব এলাকায় খুব সহজেই মাদক পাওয়া যায়।
অন্যদিকে দিনাজপুর জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, অভিযানের পর মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের হিড়িক পড়েছে। দিনাজপুর জেলার একজন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী হচ্ছে সুফিয়া বেগম। শুধু তিনিই নন, তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১০ জন। তার পরিবারের সবাই মাদকের সঙ্গে জড়িত। ২১ মে তিনি আদালতে গিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছেন। সেই সঙ্গে তার সঙ্গী ও লোকজন স্বেচ্ছায় কারাবরণের জন্য আবেদন করেছে। এছাড়াও কয়েকজন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
পুলিশ সুপার হামিদুল আলম জানান, এরই মধ্যে বড় মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই আটক করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের হিড়িক পড়েছে। সেই সঙ্গে অনেকেই আদালতে গিয়ে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করছে।
তবে গডফাদারদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে স্বীকার করে তিনি জানান, ব্যবসায়ীদের ধরলেও তারা গডফাদারদের নাম বলছে না। তবে পুলিশ নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে তাদের ধরার জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। অভিযানের ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এবং মাদকের ভয়াবহতা কিছুটা কমে এসেছে।
তিনি জানান, যারা মাদক ব্যবসা করছেন তারা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তাদের আটক করলে ৫ বোতল থেকে ৫০ বোতল ফেন্সিডিল ও কিছু মাদক মিলছে। তবে যারা বড় ব্যবসায়ী তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ধরা পড়েছে। বাকিরা এলাকাতে নেই। তিনি আরো বলেন, মাদকের কারণে অনেক পরিবার ধংস হয়ে গেছে, কোনোক্রমেই মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
দিনাজপুর জেলা পুলিশের তালিকা মোতাবেক প্রায় এ জেলায় ৩ হাজার মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় দেড় হাজার মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেছে বলে দাবি পুলিশের। তবে পুলিশ জানিয়েছে, যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদের মধ্যে অনেকে আবারও মাদক ব্যবসায় ফিরে গেছেন। তবে জেলার তালিকাভুক্ত ৩৬০ জন মাদক ব্যবসায়ী তাদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
এছাড়া বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলায় যেসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী দাপটের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা হলেন- উপশহর এলাকার সুফিয়া বেগম, রামসাগর এলাকার সেরেকুল ইসলাম, ঝলকা মিজান ও সালাম, দশমাইল এলাকার মুন্সি, সৈয়দপুরের বাবুয়া, হিলির মোরশেদ আলী সুমন, বাবুল মেম্বার, শাহীন ও শরিফুল, বিরলের গালকাটা বাবু(বন্দুক যুদ্ধে নিহত), গোলাম রব্বানী, জবাইদুল ইসলাম, বিরামপুরের বকুল ইসলাম, প্রবল হোসেন (বন্দুক যুদ্ধে নিহত), নিমাজ উদ্দীন, ফুলবাড়ীর সিরাজুল ইসলাম, ওয়াদুদ ইসলাম, রাজু মিয়া ও রমজান আলী। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার পর এদের মধ্যে বিরলের গালকাটা বাবু ১৯ মে ও বিরামপুরের প্রবল হোসেন ২১ মে পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে এবং ২৬ মে বীরগঞ্জের মাদক ব্যবসায়ী সাবদারুল র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। এছাড়াও ২৬ মে দিনাজপুর শহরের জাতীয় উদ্যান রামসাগরের পশ্চিমপাড় এলাকায় নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের গুলিতে ওই এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী আবদুুস সালাম নিহত হয়। এরপর থেকে পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই গা ঢাকা দেয়। আর জেলা শহরের বড় মাদক ব্যবসায়ী সুফিয়া বেগম আদালতে গিয়ে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছেন।