মানবতার জয় হোক

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানি চন্দ


আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতন সর্ব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সুদীর্ঘ সময় থেকে চলে আসা এ সমস্যা চরম আকার ধারণ করায় সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই অমানবিক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ওপর। সামরিক বাহিনী কর্তৃক একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বিচারে যে গণহত্যা, লুট ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে নারী-পুরুষ ও শিশু নির্বিচারে- সেটা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্পষ্ট লংঘন।
এ নির্যাতন বন্ধে সরকারি বিবৃতি ও প্রচারণা যতটা সোচ্চার প্রকৃত অবস্থা ততটাই সংগিন।
অত্যাচরিত ও নির্যাতিত অসহায় মানুষ আত্মীয় পরিজন হারিয়ে পৈত্রিক ভিটেমাটি ত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে। বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের। একই সাথে এদেশের সরকার প্রধানসহ অনেকেই আবেদন জানাচ্ছেন মিয়ানমার সরকারের কাছে তাদের এ বিপুল জনগণকে সম্মানে দেশে ফিরিয়ে নেবার জন্য। বিশ্বজনমত তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। কারণ বাংলাদেশ একটা ছোট দেশ। প্রতিদিন আসছে এবং অনুপ্রবেশ করছে অগণিত রোহিঙ্গা ছোট দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নিজেদের উন্নয়নের ধারা যখন ঊর্ধ্বমুখি ধীরে ধীরে তখনই এ বিপুল জনসংখ্যার অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর একটা বড় ধাক্কা। শুধু অর্থনীতিই নয় যেভাবে তারা আশ্রয়ের সন্ধান বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে সেটা দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি স্বরূপ। জাতিসংঘ প্রদত্ত তথ্যমতে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে যাদের শতকরা ৮০ ভাগই নারী ও শিশু (৮/৯/১৭, দৈনিক সমকাল) আরো প্রায় এক লাখ লোক বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় ১ কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সে দেশের সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেছিল। একই সাথে তৎকালীন সরকার প্রধান শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে চলমান অরাজকতা ও সহিংসতা বন্ধ করার লক্ষ্য বিশ্বজনমত তৈরি করতে দেশে- বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। এ কারণে তিনি অনেকের বিরাগভাজন হন।
নিরাশ্রয়, অনাহার, অনিরাপত্তা সব উপেক্ষা করে প্রাণের তাগিদে পঙ্গপালের মত মানুষ অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে। প্রসঙ্গত যে প্রশ্নটি আসে মানুষের মনে তাহলো একটি গণতান্ত্রিক দেশে কীভাবে একটা বিশেষ সম্প্রদায় বার বার আক্রান্ত হচ্ছে? এমনটা শোনা যায় তারা প্রকৃত অর্থে মিয়ানমারের নাগরিক নয়। তা হলে তারা কোন দেশের নাগরিক? যে দেশের নাগরিক সে দেশের সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার নিষ্পত্তি করাই শ্রেয়। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে যেখানে তারা বসবাস করছে সেখানকার বৈধ নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের মূল ¯্রােতের সাথে সম্পৃক্ত করা হোক, সমস্ত নাগরিক সুবিধা প্রদান করে তাদের জনশক্তিতে পরিণত করা হোক।
এটা সহজেই অনুমেয় মিয়ানমার একটা সামরিক অধ্যুষিত দেশ। যার জ্বলন্ত প্রমাণ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চির নিজের দীর্ঘ সময় জেলখানায় বন্দি থাকা। শুধু তাই নয়, এ সামরিক শক্তির ঘাটি এত শক্ত যে সু চি নির্বাচনে জয়লাভের পরেও তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে তারা। তাদের প্রভাবের দুর্লঙ্ঘ ও দুর্ভেদ্য পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নির্বাচিত সরকারেরও কিছু করার ক্ষমতা এখানে নির্বাসিত। সুতরাং এ পর্বতপ্রমাণ অটল সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ জাতিসংঘসহ বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে এ সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। এ কারণেই এটা করা উচিৎÑ সমস্যাটা দিন দিন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসছে বাংলাদেশের ওপরেই। বাংলাদেশের সরকারের সামনে রয়েছে নির্বাচন নামক কঠিন খাঁড়া। যে নির্বাচনকে ইস্যু করে বাংলাদেশে শুরু হয় নানা দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র এ দেশীয় তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোর আমন্ত্রণে। রোহিঙ্গা সমস্যাও তেমনি কোনো তৈরি ইস্যু কিনা এটা ভেবে দেখা উচিৎ। যদি তাই হয়, তাহলে উদ্দেশ্য সুষ্পষ্ট। এক ঢিলে দুই মারা। একদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমরকারকে ব্যস্ত রেখে সরকারের অর্থনৈতিক অপচয় এবং অর্থনৈতিক উন্নতির ধারাকে বাধাগ্রস্ত করা। একই সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুকে পূঁজি করে সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো। বাংলাদেশ এখন অনেক বাঘা বাঘা দেশের চক্ষুশূল। যাদের অনেকেই অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না এবং বিশ্ব মোড়লের ভূমিকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নাক গলিয়ে থাকে। প্রকৃত অর্থে কোনটা সত্যি সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু সম্ভাবনাগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দেবারও কোন কারণ নেই।
কারণ যেটাই হোক, লাখ লাখ মানুষ এখন অসহায়। বাংলাদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে এদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আক্রান্ত। তাদের সাহায্যের প্রয়োজন। এছাড়াও রয়েছে নানা এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা। চলছে পদ্মাসেতু নির্মাণসহ নানা উন্নয়নমুলক কর্মকাণ্ড। এহেন অবস্থায় মিয়ানমারের অবিবেচনাপ্রসূত, অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক কাজের দায়ভার অনাহুতের মত বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ দায়ভার বহন বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। যতই অসম্ভব হোক না কেন বাংলাদেশের মানবিক কারণেই এ দায়িত্ব নিতে হবে একথাও সাত্যি। কিন্তু আমাদের সামর্থ্যরেও সীমাবদ্ধতা আছে-একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
যে ভয়াবহ ও করুণ পরিণতির দিকে যাচ্ছে ভিটেমাটি ছাড়া অসহায় এ বিপুল জনগোষ্ঠী তা আমাদের সমাজের নানা স্তরের মানুষ বিশেষ করে শিশুদের মনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে। কোমলমতি এসব শিশুরা পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে যখন এসব পরিস্থিতি দেখছে তখন কোনো কোনো শিশু হয়ত স্বভাবসুলভ চপলতা বা বয়সের সারল্যের কারণে বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। কিন্তু অনেকের মনে আবার এগুলো কঠিন রেখাপাত করে। ঘটনার গভীরে যাবার বুদ্ধি না থাকলেও তারই মতো হাজার হাজার শিশু অনাহারী ও নিরাশ্রয়, তাদের নির্বিচারে গুলি করে মারা হচ্ছে এ সত্যটি তারা বুঝতে পারে। কিন্তু কেন মারা হচ্ছে এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর জানা নেই কারো। প্রকৃত অর্থে শিশু নির্যাতনের এ দায় পুরো মানব সমাজের কোন দেশ কালের গণ্ডিতে একে সীমাবদ্ধ করা যায় না। শুধু তাই নয়, দেশটির সামরিক জান্তারা মানুষ মেরে, বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না। কেড়ে নিচ্ছে তাদের পরিচয়পত্রও। পরিচয়পত্রহীন মানুষেরা প্রকৃত অর্থে কোন ভূ-খণ্ডের মানুষ এটা প্রমাণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। ১৯৭৮ সাল থেকে চলছে এ জাতিগত সংঘাত এবং তখন থেকেই বাংলাদেশের ওপর চলে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ ও অনুপ্রবেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাস ও ঘোষণা অত্যন্ত মানবিক ও শান্তির বার্তা বহন করে এদেশে ১৬ কোটি মানুষ খেতে পেলে রোহিঙ্গারাও না খেয়ে থাকবে না। একজন শিশু ¯্রষ্টার আমানত। তাকে রক্ষা করা, তার জীবনকে নিরাপদ, নিশ্চিত ও আনন্দময় করা মানুষের দায়িত্ব। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাতে নির্যাতিত এ সব মানব শিশু যে মানবেতর জীবনযাপন করছে তা অত্যন্ত দুঃজনক।
বিশ্বের আপামর জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জনকল্যাণমুখি সংগঠন সকলের কাছে আহ্বান জানাই, আপনারা বিশ্ব বিবেক, বিশ্ব মানবতাকে জাগিয়ে তুলুন এবং বিশ্বের নানা দেশে নানাভাবে আক্রান্ত, অত্যাচারিত ও বিতাড়িত মানুষদের মতো রোহিঙ্গাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। তাদের জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সামিল হয়ে তাকে সফল করে তুলুন। জয় হোক মানবতার।