মানব অঙ্গের আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশী শিশু

আপডেট: অক্টোবর ১, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মানব অঙ্গের জন্য প্রথমে ইউক্রেনে পাচার। ওইসব মানব অঙ্গ সেখান থেকে যাচ্ছে ইসরায়েলে। ইউক্রেন থেকে সরবরাহ করা এসব মানব অঙ্গ ইসরায়েল হয়ে চলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। মানব অঙ্গ কেনা-বেচার এ আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশী শিশুরাও।
বাংলাদেশ থেকে ইউক্রেনে পাচার হওয়া তিন শিশুর বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে এমন ধারণা করছে পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, ইউক্রেনে ওই তিন শিশুকে পাচার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির উদ্দেশ্যেই।
জানা গেছে, নওগাঁর একডালা ইউনিয়নের ওই তিন শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন ইউক্রেনের নাগরিক ওস্টাপেনকো ওলেকসি। গত বছরের মাঝামাঝি তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ইউক্রেনে। এরপর থেকেই খোঁজ নেই ২০০৬ সালে জন্ম নেয়া এ তিন শিশুর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ওলেকসির মাধ্যমে ওই তিন শিশুকে ইউক্রেনে পাচার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়েছে ইসরায়েলের বাজারে।
ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের আগস্টে, যখন পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তিন শিশুর বিষয়ে প্রথম ঢাকায় তথ্য দেয়া হয়। তিনজনের জন্ম নিবন্ধন সনদ যাচাই করে বেশকিছু অসঙ্গতি খুঁজে পায় দূতাবাস। আর এ জন্ম নিবন্ধন সত্যায়িত করে দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দূতাবাসের দেয়া তথ্যের বিষয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, অবাক করা বিষয় হলো, প্রতিটি শিশুর বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইউক্রেনের নাগরিক ওস্টাপেনকো ওলেকসির। তিন শিশুর মা-ই মৃত। তাদের সবার বাড়িই নওগাঁ জেলার একডালা ইউনিয়নে। প্রত্যেকের জন্ম ২০০৬ সালের জুন মাসে। সবার জন্মসনদও ইস্যু করা হয়েছে একই সময়ে। জন্মসনদগুলো নোটারি করেছেন একই আইনজীবী। এগুলো একই দিনে প্রথমে আইন মন্ত্রণালয়, পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সত্যায়িত করে দিয়েছে।
তিনজনের মাকেই মৃত দেখানো হয়েছে কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বাবার সঙ্গে ইমিগ্রেশন পার হতে মায়ের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আবার মায়ের সঙ্গে ইমিগ্রেশন পার হতে প্রয়োজন হয় বাবার অনুমতির। এ কারণেই তিনজনের মাকেই মৃত দেখানো হয়েছে। এতে অনুমতির আর কোনো প্রয়োজন পড়েনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ তিন শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ইউক্রেনের নাগরিক মো. ফয়জুল খক। ইউক্রেনের পাসপোর্টধারী (এফবি ৬৯০৯৭০) মো. ফয়জুল খকের জন্ম সিলেটে বলে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানিয়েছে ইউক্রেনের পুলিশ।
পাসপোর্টে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৭৫ সালের ২ এপ্রিল। ইউক্রেনের পাসপোর্ট পেতে তিন শিশুর জন্ম নিবন্ধন সনদ দেশটির সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দেয় ফয়জুল খকই। যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে জন্মসনদগুলো পাঠালে তখনই এ শিশুদের পাচারের বিষয়টি সামনে আসে।
ইউক্রেনের আইন অনুযায়ী, দেশটিতে পাসপোর্ট তৈরি করতে সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তার আইনানুগ অভিভাবক সেটি তৈরি করতে পারেন। এক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না।
কূটনৈতিক কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী মানব অঙ্গের কেনা-বেচার অবৈধ বাজার হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইউক্রেন। এসব মানব অঙ্গের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইসরায়েল। ইউক্রেন থেকে সরবরাহ করা মানব অঙ্গ ইসরায়েল থেকে পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারে যায়। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া ১২ বছর বয়সী ওই শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্যই তাদের পাচার করা হয়েছে।
গত বছরের মার্চে প্রকাশিত গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির ‘ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম অ্যান্ড দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও ইসরায়েলকে মানব অঙ্গ কেনা-বেচার বড় বাজার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অবৈধ কিডনির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ও গ্রহণকারী ইসরায়েল। অবৈধ কিডনির সবচেয়ে বেশি মূল্যও পাওয়া যায় দেশটিতে। ইসরায়েলে প্রতিটি কিডনির খুচরা মূল্য হয়ে থাকে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার ডলার পর্যন্ত।
ইউক্রেনে মানব অঙ্গের জন্য বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনসুলার ও ওয়েলফেয়ার উইংয়ের মহাপরিচালক নাহিদা রহমান সুমনা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এটি একটি ভয়াবহ অপরাধ। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই অপরাধী। যে জন্মসনদগুলো তৈরি করা হয়েছে, তার তদন্ত হওয়া জরুরি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার একডালা ইউনিয়নে মো. নয়ন আলী, মো. রায়হান আলী এবং মো. লিখন আলীর নামে জন্ম নিবন্ধন সনদে নোটারি এবং সত্যায়িত করেছে আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে মো. নয়ন আলীর (জন্মসনদ নং: ২০০৬৬৪১৮৫২১০২৩৫২১, রেজিস্ট্রেশন নং: ০১) নিবন্ধনের তারিখ ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর, মো. রায়হান আলীর (জন্মসনদ নং: ২০০৬৬৪১৮৫২১০২২৫০২, রেজিস্ট্রেশন নং: ০৫) নিবন্ধনের তারিখ একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর এবং মো. লিখন আলীর (জন্মসনদ নং: ২০০৬৬৪১৮৫২১০০৫৫১৫, রেজিস্ট্রেশন নং: ০২) নিবন্ধনের তারিখ ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর।
জন্মসনদে মো. নয়ন আলীর মায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে মৃত খাতুন বিবি, মো. রায়হান আলীর মৃত মনোয়ারা বেগম ও মো. লিখন আলীর মৃত কদুজান বিবি। জন্মসনদে একডালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল ইসলাম ও সচিব মো. আবদুল হাকিমের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৩ সালে মো. আবদুল হাকিম ইউনিয়ন পরিষদের সচিব থাকলেও মো. রেজাউল ইসলাম চেয়ারম্যান ছিলেন না। ২০১৩ সালে একডালার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মো. মোসারব হোসেন প্রামাণিক। জন্ম নিবন্ধন সনদে সচিব মো. আবদুল হাকিমের যে স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, তাও জাল। পাচারের জন্য যেসব জন্মসনদ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর নিবন্ধন নম্বর যাচাই করে দেখা গেছে, কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা হলেও অন্য সব তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার কোনোটির ক্ষেত্রে নামসহ সব তথ্যই পরিবর্তন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, মো. ফয়জুল খক ইউক্রেনের পাসপোর্ট ব্যবহার করে কখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করেননি। এমনকি বাইরেও যাননি। তার ইউক্রেনের পাসপোর্ট বাংলাদেশের কোনো ইমিগ্রেশনে ব্যবহার হয়নি। কারণ ইউক্রেনের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় ৫১ ডলারের ফি প্রদান করতে হয়। এক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন।
জাল জন্মসনদ তৈরি ও তা সত্যায়িত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা সবাই একে অন্যের ওপর দায় চাপান। জন্মসনদ তিনটি সত্যায়িত করতে কে এসেছিল, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র বা আইন মন্ত্রণালয়ের কেউ তা বলতে পারেননি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই ও সই সত্যায়িত করে। মন্ত্রণালয়ে আসা কোনো ধরনের সার্টিফিকেটের কনটেন্ট সত্যায়িত করে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সত্যায়িতর জন্য যে সিলটি ব্যবহার করে, সেখানে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পাসপোর্টের ক্ষেত্রে আমরা যাচাইয়ের জন্য যেভাবে সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারি, অন্য সেবাগুলো দেয়ার ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। ফলে আমাদের অন্য নথিগুলো আসল কিনা, তা যাচাইয়ের সুযোগ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সত্যায়িতর ওপরই নির্ভর করতে হয় আমাদের। যিনি নোটারি করেন মূলত তাকে যাচাইয়ের কাজটি আইন মন্ত্রণালয় করে থাকে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, যেসব আইনজীবী নোটারি করেন, তাদের নিবন্ধন নিতে হয় আইন মন্ত্রণালয় থেকে। ফলে তারা যখন সত্যায়িত করেন, তখন তাদের সত্যায়িত অনুলিপির ওপর ভিত্তি করেই মন্ত্রণালয় এগুলোকে সত্যায়িত করে। আইন মন্ত্রণালয়ের সিলেও যিনি নোটারি করেছেন, তাকেই সত্যায়িত করার বিষয়টি উল্লেখ থাকে।
তিনটি জন্মসনদের সত্যতা যাচাই করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আজিমুল হক চৌধুরী। ঢাকার কোর্ট হাউজ স্ট্রিটে তার চেম্বারে গিয়ে জানা গেছে, নোটারি করতে আসা কোনো গ্রাহকেরই কোনো রেজিস্টার রাখা হয় না। নোটারি করতে শুধু মূল কাগজ নিয়ে আসতে হয়। সে নথির সত্যতা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা তাদের নেই।
নোটারির রেজিস্টার নিয়ে প্রশ্ন করলে অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আজিমুল হক চৌধুরী বলেন, নোটারি কে করিয়ে গেছে, সে তথ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই আমাদের। তবে নোটারি করতে আমরা শুধু মূল নথিটি নিয়ে আসতে বলি। আর নোটারির সময় সে নথির সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কারণ শুধু জন্মসনদ নিয়েই যদি বলি, এখনো সব জন্মসনদ সরকারি ডাটাবেজে সংরক্ষিত নেই।
প্রতিবেদক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন নোটারি পাবলিক অফিসের দপ্তরে নোটারি করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে খোঁজ নিতে যান। বেশির ভাগ নোটারি পাবলিক অফিসের দপ্তর থেকে প্রথমে বিভিন্ন কাগজ নিয়ে আসার কথা জানানো হয়। পরক্ষণেই কাগজ না থাকলেও কিছু টাকা বেশি খরচ করে নোটারি করার প্রস্তাব এসেছে। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বলেন, নিয়ম হচ্ছে সব কাগজ যাচাই করে দেখা। একই সঙ্গে রেজিস্টার রাখা। এসব নিয়ম কিছু আইনজীবী পরিপালন করলেও বেশির ভাগ আইনজীবীই এ ধরনের ঝামেলায় যান না। ফলে হরহামেশাই ভুয়া নথিতে নোটারির সিল পড়ে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা