মানিকপুরের জয়

আপডেট: জুন ৯, ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী


‘তারপরে কী হলো মা?’
‘তারপরে আবার কী । রাজা রানী দুজনে মিলে সব প্রজাদের নিয়ে সুখে শান্তিতে রাজত্ব করতে লাগলো।’
‘তারপরে?’
‘আবার তারপরে কী রে? আমার কথাটি ফুরালো, নটে গাছটি মুড়োলো।’
‘ধুর এই গল্পটা ভালো নয়, আরেকটা গল্প বলো।’
‘আরেকটা গল্প? কোন গল্প বলি !’
‘সেই যে মানিকপুরের জয়, ওর গল্পটা বলো। নাহলে আমি কিন্তু আর ভাত খাবোনা।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, বেশ শোনো তাহলে। সে অনেককাল আগের কথা। দেশের পুব সীমানায় মানিকপুর নামের ছোট্ট একটা গ্রাম ছিল। গ্রামের একপাশ দিয়ে বয়ে যেত একটা ছোট্ট নদী, নাম তার বৃষ্টিধারা। বৃষ্টিধারা নদীর একপাশে ছিল অনেক পুরানো একটা মন্দির আর তার পাশে ছিল বহু পুরানো একটা জঙ্গল, নাম তার মধুবন। মধুবনে ছিল অনেক রকম ফল-ফুলের গাছ আর সেইসব গাছের মাঝে ছিল নাম না জানা কত পাখির বাসা,তারা সেই সব গাছের ফল খেত, আকাশে উড়ে বেড়াতো আর সকাল বিকেল মন্দিরে আসা মানুষকে গান শোনাত। মানিকপুর ছোট হলে কী হবে বড় সুন্দর শান্ত গ্রাম। নদীর চরে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়, নদীর জলে গ্রামের মানুষ চাষ-আবাদ করে, সবাই খুব মিলে মিশে থেকে, আনন্দে দিন কেটে যায়।
সেই গ্রামের এক প্রান্তে, থাকতো জয় নামে এক ছোট্ট ছেলে। ছোট হলে কী হবে, জয় খুব বুদ্ধিমান। বাবার দেখে দেখে সে সুন্দর তবলা বাজানো শিখে নিয়েছে। মধুবনের গাছে চড়ে ফল পাড়া, বন্ধুদের সাথে পাঠশালা যাওয়া, আর মন্দিরের চাতালে খেলে বেড়িয়ে জয়ের ছোটবেলা বেশ সুন্দর কেটে যায়। তবে এসব ছাড়া আরেকটি জিনিস জয়ের বড় প্রিয়, তাদের বাড়িতে যে ছোট্ট উঠোন, তাতে অনেক গাছ লাগিয়েছে সে আর তার বাবা মিলে, নিয়ম করে দুই বেলা তাদের জল দেয় আর গাছগুলো জয় আর তার বাবার যতœ-ভালোবাসা হরেক রঙের ফুল দিয়ে ভরিয়ে দেয়। সেখানে কয়েকটা ফলের গাছও আছে, তাতে পাখিরা আসে ফল খেতে আর জয় তাদের কিচিরমিচির শুনে মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কী বলতে চাইছে ওরা।
এইভাবে বেশ দিন কাটছিল মানিকপুরের মানুষদের। কিন্তু কিছু দুষ্টুলোক আস্তে আস্তে মধুবনের সব গাছ একে একে কাটতে আরম্ভ করলো। জয় তার বাবাকে বলে সেখানকার রাজামশাই-এর কাছে নালিশ জানালো, কিন্তু তিনি বিশেষ ভ্রুক্ষেপ করলেন না। গ্রামের বাকি লোকেদের সে বোঝাতে চেষ্টা করলো অনেক, কিন্ত সেই একই সমস্যা। এদিকে একটা দুটো করে কাটতে কাটতে ধীরে ধীরে পুরো মধুবন উজাড় হয়ে গেল। কেউ বারণ করলো না, বাধা দিলো না, একমাত্র জয় ছাড়া, কিন্তু ছোট বলে কেউ তার কথায় গুরুত্ব দিল না। জয়ের বাবা তার ছেলের মন এই কারণে ভালো নেই বুঝে আরো কিছু চারাগাছ এনে দিলেন। জয় মন দিয়ে গাছের যতœ করতে লাগলো প্রতিদিন, আর দেখতে দেখতে কিছুদিন বাদে তার উঠোনেই ছোট একটা মধুবন তৈরি হয়ে গেল। কতরকম ফুল ফোটে, পাখিরা গাছে বাসা বেঁধে থাকে তাদের ছানা নিয়ে, গাছের ফল খায় আর কিচিরমিচির গান শোনায় জয়কে সকাল-বিকেল। পাখিগুলো কী বলে জয় না বুঝলেও, তার ভারী ভালো লাগে ওই গান শুনতে।
এদিকে মাসের পর মাস কেটে গিয়ে, বর্ষা আসার সময় হয়ে গেল। প্রতিবছর মধুবনের গাছেরা তাদের ডালপালা আর পাতা নাড়িয়ে, মেঘেদের নিমন্ত্রণ জানাতো মানিকপুরে বৃষ্টি দেওয়ার জন্যে, কিন্তু এবার তো আর তারা নেই। মেঘেরা মানিকপুরের ওপর দিয়ে যেতে যেতে সবুজ বন্ধুদের দেখা না পেয়ে, জয়ের উঠোনের কাছে আসতে সেখানকার গাছেদের দেখে, ওখানে বৃষ্টি ঝরিয়ে দিলো বেশ। গাছেরা আরো তরতাজা হয়ে উঠলো। পুরো বর্ষায় মানিকপুরে বৃষ্টি নেই, বৃষ্টির অভাবে বৃষ্টিধারা নদীতেও জল নেই, চাষ বন্ধ, গ্রাম জুড়ে খরা, খাবারও অমিল, কিন্তু জয়ের বাগানের ওপর মেঘেরা আপন মনে ছাওয়া বানিয়ে গাছেদের মধ্যে নতুন প্রাণ এনেছে, সেখানে কোনো অনাবৃষ্টি নেই, অভাব নেই। গাছেরা আর মেঘেরা, এই দুইদল বন্ধু মিলে জয়ের উঠোনের ছোট্ট মধুবন এমন সুন্দর সবুজ করে সাজিয়েছে, দেখে বোঝার উপায় নেই মোটেই, যে জয়ের বাড়ি মানিকপুরের মধ্যেই।
এদিকে গ্রামের লোকেরা খাবারের খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে জয়ের বাড়ি এসে এই কান্ড দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। মধুবন নেই, গাছ নেই, তাই মেঘেরাও তাদের সঙ্গে আড়ি করে কেবল জয়ের সঙ্গেই ভাব জমিয়েছে পুরো গ্রামে থাকা এতজন মানুষের মাঝে।
সব শুনে রাজামশাইও এসেছেন দেখতে। দোষ তো তারই, ঠিক সময়মতো তাঁকে জয় জানিয়েছিল সব, কিন্তু তিনি কিছুই না করে তিনি কেবল রাজমন্ডা আর রাজভোগ খেয়েছেন প্রাসাদে বসে আর অন্যদিকে মধুবনের অমৃত সমান ফলের সব গাছ কাঠ হয়ে বিকিয়ে গেছে বাজারে।
ছোট জয়কে রাজামশাই অনুরোধ করলেন যে তার গাছের ফল দিয়ে সে যাত্রা সকলের প্রাণরক্ষা হোক, আর ওই দুষ্টুলোকগুলোকে ধরে এনে তিনি শাস্তি তো দেবেনই, সঙ্গে অনেক অনেক গাছ পুঁতে আবার তিনি মধুবনকে আগের মতো করে দেবেন।
এরপর অনেক দিন কেটে গেছে, জয় এখন আর ছোট নেই, কিন্তু গাছের যতœ নিতে সে ভোলেনা, মধুবনও আগের মতো হয়ে গেছে, গ্রামে শান্তি সমৃদ্ধি এসেছে, আর আগের কথা মনে রেখে গ্রামের সবখানে গাছ কাটা নিষেধ হয়ে গেছে রাজার আদেশে।’
‘চলো মা।’
‘কোথায়? এই ভরদুপুরবেলা কোথায় যাবো?’
‘ছাদে, গাছে জল দেব।’
‘আচ্ছা সে বিকেলে দেব, এখন খেয়ে নাও, লক্ষ্মী ছেলে হয়ে। বিকেলে রোদ পড়ে গেলে, গাছে জল দেব আমরা।’