মানুষ-ভেড়ার সংকর তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

আপডেট: মার্চ ১, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মানুষ ও ভেড়ার সংকর ভ্রুণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবসময় পাওয়া যায় না। তাই গবেষণাগারে তৈরি এই সংকর ভ্রুণে মানুষের অঙ্গ উৎপাদন করে এরপর সেই অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা সাফল্যের দরজা খুলে দিতে পারে- টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থতার জন্য রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সুস্থ অগ্ন্যাশয় তৈরিতে। অর্থাৎ মানুষ ও ভেড়ার সংকর ভ্রুণে মানবদেহের উপযোগী অগ্ন্যাশয় তৈরি করে তা ডায়াবেটিস রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করে টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিরাময় করা যেতে পারে।
এর আগে ক্যালিফোর্নিয়া সল্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা মানুষ ও শূকরের সংকর ভ্রুণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার লক্ষ্য ছিল, শূকরের ভ্রুণের ভেতর থেকে ডিএনএ সরিয়ে, তারপর সেখানে মানবদেহের স্টেম সেল ঢুকিয়ে যে ভ্রুণের সৃষ্টি হবে সেটা দেখতে এবং আচার আচরণে সাধারণ একটি শূকরের মতোই হবে কিন্তু এর ভেতরে মানব কোষের মাধ্যমে একটি প্রত্যঙ্গ তৈরি হবে। এভাবে ওই প্রাণীটির ভেতরে মানব হৃদপিন্ড, কিডনি, লিভার অগ্ন্যাশয়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ জন্মানো হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই গবেষণাটি বিজ্ঞানীদের কোনো দল আর সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়নি।
তবে স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানী দল, যারা ইতিমধ্যে ইঁদুরের মধ্যে অগ্ন্যাশয় প্রতিস্থাপন করতে সফল হয়েছেন, তারা এবার মানুষের অঙ্গ জন্মাতে মানব-ভেড়ার সমন্বয়ে তৈরি ভ্রুণ সৃষ্টি করেছেন।
এই গবেষণা প্রকল্পের প্রধান স্ট্যানফোর্ডের জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হিরো নাকুচি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স কনফারেন্সে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে র‌্যাটের মধ্যে মাউসের অগ্ন্যাশয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি এবং সেই অগ্ন্যাশয় ডায়াবেটিস আক্রান্ত একটি মাউসে প্রতিস্থাপনের পর ডায়াবেটিস প্রায় নিরাময় হতে দেখা গিয়েছিল।’
‘এ ধরনের উদ্যোগ সফল হতে পাঁচ বছর কিংবা দশ বছর লাগতে পারে কিন্তু আমি মনে করি আমরা এক সময় এই কাজ করতে সক্ষম হবো।’ এই প্রকল্পের সাফল্য ভবিষ্যতে বিশ্বে অঙ্গদানকারীদের ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ না পাওয়ার কারণে সারাবিশ্বে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। এদিকে প্রাণী অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলো এ ধরনের প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, ‘মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়ে এই সংকর সৃষ্টি খুবই আতঙ্কের বিষয়। প্রাণীর এরকম বর্বর ব্যবহার শুধু ভৌতিক কল্পকাহিনির বইগুলোতেই দেখা যেত। এই কাজটা করা হচ্ছে শুধু এ কারণে যে, ওই প্রাণীর শরীরে মানব দেহের ওই উপাদানগুলো রয়েছে। এটা করতে গিয়ে প্রাণীটির নানা রকমের যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয় এবং তারপর যদি ওই সংকর শিশুটির জন্ম দেওয়া হয় তা হলে তার অনেক খারাপ পরিণতিও হতে পারে। যেমন তাদের শরীরে টিউমার জন্মাতে পারে, ত্রুটি থাকতে পারে মস্তিষ্কের গঠনে। সুতরাং এই কাজটা করা নীতি ও নৈতিকতার পরিপন্থী।’
উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই উদ্যোগের নেতৃত্বের অংশীদার পাবলো রস ডেভিস। তিনি বলেন, ‘এটা নির্ভর করে পশুর মধ্যে মানুষের কোষ কতদূর ব্যবহার হবে। যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরো বেশি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তা হলে নৈতিক কারণগুলোর জন্য তা অনুমোদন করা অসম্ভব হতে পারে।’
কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে এই গবেষণাকে সবচেয়ে আশাপ্রদ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ডেভিস বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবন-রক্ষাকারী বিস্ময়কর প্রযুক্তি রয়েছে (অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহ)। কিন্তু তা সকলের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কল্পনা করুন তো, আপনি প্রয়োজনীয় অঙ্গ উৎপাদন করে ৯ মাসে তা পরিণত করতে পারছেন। এসব অঙ্গ শুধু প্রতিস্থাপনে ব্যবহার হবে না বরঞ্চ ডায়াবেটিসের মতো রোগগুলো নিরাময়েও ভূমিকা রাখবে।’
শূকর কিংবা ভেড়া থেকে সরাসরি মানুষের শরীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপন এখন পর্যন্ত সফল হয়নি, তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন বিকল্প উপায় হিসেবে মানুষের স্টেম সেল ব্যবহার করে এটি সম্ভব হতে পারে।
গবেষকরা এর আগে মানব-শূকর সংকর তৈরি করেছিলেন কিন্তু মানুষের অঙ্গ বৃদ্ধি করতে প্রক্রিয়াটি এখনো ব্যবহার করতে সক্ষম হননি।
স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানীরা বর্তমানে পরিকল্পনা করছেন ভেড়ার ভ্রুণে মানুষের স্টেম সেল ব্যবহার করার এবং আশা করছেন, মানুষের ডিএনএ সেখানে অঙ্গ বৃদ্ধিতে সক্ষম হবে, যেমন- অগ্ন্যাশয়। যদি ভেড়ার মধ্যে মানুষের অঙ্গ সৃষ্টি করা যায়, তা হলে তা বিশ্বে প্রথমবার হবে। তথ্যসূত্র : ডেইলি মেইল