মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার

আপডেট: মার্চ ৯, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সাহাবুদ্দিন সরকার


স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৬ বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দেখি অনেক কিছুই ভুলে গেছি। খ- খ- যে ঘটনাগুলি মনে করতে পারলাম, জোড়াতালি দিয়ে তার একটা ছবি আঁকতে চেষ্টা করেছি। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে আমি সরাসরি জড়িয়ে পড়ি রাজনীতিতে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনী সফরে বাংলার নির্ভিক ভয়হীন নির্মোহ নেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এলে তাঁর নিরাপত্তা বেষ্টনীর ২০ জন স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে আমি স্থান পেলাম।
পরবর্তিতে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমাকে শ্যামপুর (বাজিতপুর প্রাইমারি স্কুল) বুথে পোলিং এজেন্টের দায়িত্ব দেয়া হলো। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমাদের তরুণ যুবকদের মনে এনে দিলো ভয়হীন অসীম সাহস ও শক্তি। আমরা কখনও নেতা হতে পারিনিÑ কারণ যাঁরা নেতা ছিলেন রাজনীতি তাঁদের পেশা ছিলো না। নেতারা কেউ ছিলেন মোক্তার, কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার, বিত্তবান পরিবারের শিক্ষিত আদর্শবান সন্তান।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে শিবগঞ্জের গঈঅ নির্বাচিত হলেন মন্টু ডাক্তার (ডা. ময়েন উদ্দিন আহম্মেদ) চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাচ্চু ডাক্তার (ডা. মেসবাহ উদ্দিন) গ.খ.অ ছিলেন রানীহাটি (কমলাকান্তপুরের রইস মিয়া উকিল তাঁরা ছিলেন আমাদের দলের নেতা। নির্বাচন উত্তর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠি ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করলে প্রজ্ঞাবান ও বিচেক্ষণ রাজেন্দ্র ৭ মার্চের ভাষণে মেরুদ- সোজা করে উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেন। আমি নিজেকে আবিষ্কার করি ১৮ বছরের একজন তরতাজা যুবক যার যুদ্ধে যাওয়ার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। ২৫ মার্চের চুড়ান্ত নির্দেশনায় সকল জড়তা ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে কানসাট মাঠে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দিলাম। সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে হাজির হলাম ভারতের মালদহে। এরপর মানিকচক যেতে আয়নান্তপুর স্কুলে অবস্থিত ট্রানজিট ক্যাম্পে সবাই একত্রিত হলাম। কয়েক দিন পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) এর অফিসার ক্যাপ্টেন চতুরবিদ আমাদের ৫২ জনকে বাঁছাই করলেন। পরের দিন সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জে কুলিক নদীর ধারে ট্রেনিং ক্যাম্পে। মেডিকেল টেস্টে চিকিৎসক এবং প্রশিক্ষকগণ আমাদের “নাংগা”(উলঙ্গ) করে শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার নিরীক্ষা শেষে একটি স্লেটে নম্বর লিখে বুকে ধরতে বলে চূড়ান্ত বাছাইয়ে উত্তীর্ণদের ছবি তুললেন। আমার নাম্বার হলো ঋ.ঋ.১০৪৩ ব্রেভো উইং। পরের দিন সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার কর্নেল চ্যার্টাজি সহজ-সরলভাবে প্রশিক্ষণ/ট্রেনিং বিষয়ে ব্রিফ করলেন। আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করি- স্যার এই যুদ্ধ কি দীর্ঘমেয়াদী হবে? তিনি বললেন, অবশ্যই। কারণ পাকিস্তানের সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত নিয়মিত সেনাবাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্রে সু-সজ্জিত। সুতরাং যুদ্ধটা হবে ভয়াবহ। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তোমরা যুদ্ধ করছো, তোমাদের দেশের জন্য, দেশটি তোমাদের। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নদীমাত্রিক বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে পরিচিত নয়। তাই তোমাদের বাড়তি কিছু সুবিধা থাকবে। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা নিজ নিজ তাবুতে ফিরলাম। পরদিন ভোর ৪টায় বিউগল বেজে উঠলো। প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম শেষে আমরা ৫২ জন হাফপ্যান্ট স্যান্ডোগেঞ্জি এবং কাপড়ের জুতা পরে ভোর ৫টায় প্রশিক্ষণ মাঠে ভোর ৫টায় উপস্থিত হলাম
শুরু হলো প্রশিক্ষণ। প্রথমে প্রশিক্ষকদের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হতো। কারণ প্রশিক্ষক ছিলেন কেরালার এবং কেরল ভাষাভাষি। আমরা নিষ্ঠার সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকি এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে চাদমারি টার্গেট লক্ষ্য করে গোলাগুলি নিক্ষেপ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। প্রতিদিন প্রশিক্ষণকালিন হাজিরা শেষে রোলকল হতো। প্রতিদিন আমি এবং দলের একজন সহযোদ্ধার ওপর দায়িত্ব পড়লো জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি’ গাইবার। প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় গাইতাম- ‘পূরবো বাংলার শ্যামলিমায়, পঞ্চ নদীর তীরে উরণীময়।’ হাই স্কুলে পড়ার সময় গেয়েছি ‘পাক সার জামিন সাদ বাদ’’। জানি না জীবদ্দশায় আরও কোনো জাতীয় সংগীত গাইতে হবে কি না? প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের রায়গঞ্জে অবস্থিত সেনাবাহিনীর সিনেমা হলে ছবি দেখিয়ে রাতে ক্যাম্পে উন্নতমানের খাবার দেয় হলো। পরের দিন সকালে আমাদের টেনিং ক্যাম্প থেকে সরাসরি মোহদিপুর (বিএসএফ) ক্যাম্পের পাশে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের তাবুতে থাকতে দেয়া হলো। আমরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫২ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রথম মোহদিপুর সোনামসজিদ সীমান্তে প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা করলাম। আমাদের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন ৭নং সেক্টরের প্রথম সেক্টর কমান্ডার নওগাঁ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) ৭নং উইং-এর মেজর নাজমুল হক। যুদ্ধ চলাকালিন তিনি শিলিগুড়ি থেকে ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় শহিদ হন। প্রতি রাতে আমরা ৭নং সেক্টরের পরবর্তী কমান্ডার কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নির্দেশে সোনামসজিদের ‘দখল দরজা’ দিয়ে শিবগঞ্জে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যদের উপর চোরাগুপ্তা হামলা শুরু করলাম।
আমাদের রণাঙ্গন ভোলাহাট থেকে কালুপুরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতি সন্ধ্যায় আক্রমণ শুরু করতাম। কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশ মত ম্যাগাজিন রুম (হিন্দি ভাষায় কোতরুম) থেকে বরাদ্দকৃত অস্ত্র এবং গোলাগুলি নিয়ে আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। অপারেশন শেষে ক্যাম্পে ফিরে অধিনায়কের কাছে রিপোর্ট করে অস্ত্র জমা দিয়ে তাবুতে ফিরে (বিএসএফ) মেসে খাবার খেতাম।
একবার পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ মোকাবেলায় ভারতের তৈরি হালকা মেশিনগান থেকে একটানা ৪/৫শ’ রাউন্ড ব্রাস ফায়ার করি। হঠাৎ লক্ষ্য করি খ.গ.এ- এর ব্যারেল আগুনের তাপে লাল হয়ে গেছে এবং ক্রমান্বয়ে নল বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে গুলিবর্ষণ বন্ধ করে রণাঙ্গন থেকে ফিরে সকালে (বিএসএফ) ক্যাম্পে ম্যাগাজিন রুমে অস্ত্র জমা দেয়ার সময় দায়িত্বরত ইনচার্জ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার খ.গ.এ- এর এ অবস্থা কেন? আমি তাকে হিন্দি ও বাংলা ভাষায় ঘটনা বর্ণনা করলাম। তিনি অবাক চোখে আমার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওয়ারলেস-এ তার উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করলেন। তিনি আমাকে নাস্তা খেয়ে তাদের অফিস কক্ষে উপস্থিত থাকতে বললে তাবুতে ফিরে নাস্তা খেয়ে (বিএসএফ) অফিসে উপস্থিত হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন উর্দ্ধতন অফিসার মোহদীপুর ক্যাম্পে এসে আমকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।
আমি তাদের আধা হিন্দি-বাংলায় ঘটনা ব্যাখ্যা করার পর তাঁরা অস্ত্রটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আমার পিঠে চাপড়ে অস্ত্রটি নিয়ে চলে গেলেন। (পরে শুনেছি ভারত নির্মিত এই হালকা মেশিন গানটি রণাঙ্গন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে)। আমরা রণাঙ্গনে ব্রিটিশ নির্মিত মেশিন গান ব্যবহার করতাম। এর ব্যারেল গরম হয়ে গেলে তা বদলানোর সুবিধা ছিলো। রানাঙ্গনে আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, স্টেনগান,এল, এমজি, এসএলআর, গ্রেনেড, ২ ইঞ্চিমর্টার সরবরাহ করা হতো। আমরা প্রায় প্রতি রাতেই ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে অ্যাকশন অপারেশন করতে থাকলাম। এক হাটবারে কানসাটে মর্টার সেল নিক্ষেপের নির্দেশ পেলাম। কানসাট স্কুলের ছাত্র হিসেবে কানসাট এর সকল এলাকা আমার নখদর্পনে থাকায় আমাকে লক্ষ্য বস্তু নির্ধারণ এর জন্য মনোনীত করা হলো। জমিন টোলা ক্যাম্প থেকে মর্টার ও গোলাগুলি নিয়ে আমরা ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা শ্যামপুর হয়ে পাগলা নদীর কাছে উপস্থিত হলাম। আমার সহযোদ্ধারা রাস্তার উপরে অবস্থান নিলো। আমি এবং শিবগঞ্জের শাহাজাহান ভাই পাট খেতের মধ্য দিয়ে নদীর ধার থেকে কানসাট প্রাইমারি স্কুল টার্গেট করে পরপর ৫টি মর্টার সেল নিক্ষেপ করলাম। একটা সেল সট-রেঞ্জ ফায়ারে কানসাটের ‘কালুভাই’ এর (মিষ্টি ব্যবসায়ী)- এর বাড়ির পিছনে বিস্ফোরিত হলো। আমরা পর্যায়ক্রমে জনবল এবং অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ হতে থাকলাম। কর্নেল জামান কলাবাড়ি থেকে সকাল-সন্ধ্যায় শিবগঞ্জে অবস্থানরত পাক বাহিনীর উপর ৩র্ র্ ইঞ্চি মর্টারের সেল নিক্ষেপ করতেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন ইদ্রিস প্রায় ২৫ জন সৈনিক নিয়ে কলাবাড়িতে আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা ক্রমান্বয়ে যুদ্ধে পারদর্শী হয়ে উঠি। শুধু রাতে নয়, দিনেও সাঁতরে ডাড়া (নদীর ক্যানেল) পার হয়ে কানসাটে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সৈনাদের উপর অ্যাকশন করতে থাকলাম। একদিন কানসাটে যুদ্ধে শাহাজাহান ভাই গুলিবিদ্ধ হলে তাকে চিকিৎসার জন্য মালদহে পাঠানো হলো।
আদিনা ফজলুল হক কলেজ থেকে শিবগঞ্জের পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পের দূরত্ব ছিল কাছাকাছি। পাগলা নদী পার হলে মাঝপথে তেমন কোনো প্রতিরক্ষা বুহ্য ছিল না। আমার যতদূর মনে পড়ে শিবগঞ্জ আক্রমণের ছক কুদ্দুস, (জালমাছমারী), শামসু ভাই, (শিবগঞ্জ) লতিফ ভাই (বিশ্বনাথপুর) শাহাজাহান ভাই। তৈরি করি। শাহাজাহান ভাই এর নেতৃত্বে আমরা ২২ জন রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি, মর্টার এবং গ্রেনেড নিয়ে রাতের বেলায় জমিনটোলা ক্যাম্প থেকে শিবগঞ্জ অপারেশনের জন্য আদিনা কলেজের দিকে রওনা দিলাম।
পরিকল্পনা ছিল সারাদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জনবল অস্ত্রপাতি সম্পর্কে তথ্য জেনে সুবিধাজনক সময়ে অ্যাকশনে যাবো। (একদিন দুপুর বেলায়) কালুপুরঘাটে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করায় আমাদের মধ্যে কোনো ভয়ভীতি ছিল না। কিন্তু তাদের এদেশীয় দালাল এবং রাজাকার রাতেই হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আমাদের আগমণের তথ্য জানিয়ে দেয়। আমরা খ.গ.এ- পোস্টসহ রাস্তার দু’ধারে টহল/ পেট্রোল টিমকে পালা করে নজরদারির দয়িত্ব দিলাম। আমি, লতিফ ভাই এবং সেন্টু নামের একজন সহযোদ্ধা ডিউটি শেষে কলেজ ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষের কোয়ার্টারে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার কাছে ছিলো মর্টার, লতিফ ভাই এর কাছে স্টেনগান এবং সেন্টুর কাছে রাইফেল। হঠাৎ সকাল বেলায় আমাদের উপর পাকিস্তানি সৈন্যরা গোলাবর্ষণ শুরু করলে গোলাগুলির প্রচ- শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চারিদিকে কোলাহল এবং মেশিনগানের গুলিবর্ষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা পরস্পর থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়লাম। লতিফ ভাই স্টেনগান দিয়ে ব্রাসফায়ার করতে করতে দরজা দিয়ে বের হতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হলেন। আমরা বুঝতে পারলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা সব দিক দিয়ে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হতে চেষ্টা করতে থাকলাম। সেন্টু তার রাইফেলের বাট দিয়ে পেছনের মরচে পড়া জানালার শিক বাঁকা করে আমাকে জানালা দিয়ে বের করে নিজেও বের হলেন। পাটের খেতের বন্যার পানিতে ডুব সাঁতার দিয়ে একটা বাড়িতে উঠলাম। মাথায় উপর দিয়ে মটার সেল এবং বৃষ্টির মত মেশিন গানের গুলির কারণে বাড়ির আঙিনায় নারী পুরুষ এবং শিশুদের মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে ভাবলাম সবাই মারা গেছে। হঠাৎ এক বৃদ্ধ উঠে এসে আমাদের বললেন, কিছুক্ষণ আগে এখান দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা গিয়েছে। তাই এখানে থাকা নিরাপদ নয়। তিনি মনাকষার দিকে চলে যেতে উপদেশ দিলে ভাবলাম মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকা এই পরিবারটি আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত অথচ তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। আদিনা কলেজের যুদ্ধে আমাদের তিন সহযোদ্ধা শহিদ হলেন। লতিফ ভাই ছিলেন, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মেরিন জুয়োলজির) ছাত্র, শামসু ভাই শিবগঞ্জ এবং আনিসুর ছিলেন সাপাহার-নওগাঁর। এই তিন যোদ্ধাকে হারিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ক্যাম্পে ফিরে আসি। গুলিবিদ্ধ রানীহাটির হজরতকে গ্রামবাসী মধ্যরাতে খাটিয়ায় করে জমিনটোলা ক্যাম্প নিয়ে গেলে সেখান থেকে আমি তাকে গোলাপগঞ্জ সীমান্তে দিয়ে মালদহের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি। ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর সোনামসজিদে আমার সাথে সহযোদ্ধা হয়রতের দেখা হয়। প্রথমে সে আমাকে চিনতে পারেনি। চিনতে পেরে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। যুদ্ধের নয় মাস আমি বাড়ি ছাড়া ছিলাম। মা-ভাই-বোনদের কোনো খোঁজ-খবর পাইনি। পাকিস্তানি সৈন্যদের দালাল এ দেশীয় এজেন্ট আমাকে স্যারেন্ডার করার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিলে আমি বাধ্য হয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে মালদহে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর থাপার কাছে ঘটনা খুলে বললাল। তাঁর পরামর্শ ও সুপারিশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলাম। আমাকে না পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমার তিন মামা আফতার চৌধুরী, বারী চৌধুরী এবং মিন্টু চৌধুরীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করলো।
এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা আছে যা লেখা বা বলা যায় কিন্তু লেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলি যখন মনে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মিলিশিয়া ক্যাম্পে আমার সহযোদ্ধারা ‘মোস্তাফার জুতার দোকান’ থেকে জুতার খালি বাক্স নিয়ে খিচুড়ি নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার ক্ষুধার্ত সহযোদ্ধাদের ভিখারির মত দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে খিচুড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখে ক্যাম্প ইনচার্জ ক্যাপ্টেন এম এ আওয়াল কে বলেছিলাম জীবনের মায়া ত্যাগ করে যারা দেশ স্বাধীন করলো আত্মাহুতি দিলো তাঁদের সাথে এই অমানবিক আচরণ-অসম্মানের কথা আমরা কোনোদিন ভুলবো না।
১৯৭৩ এর ২৩ জুলাই আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি। অস্বচ্ছলতার কারণে পুথিগত বিদ্যা অর্জনের সুযোগ পাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আদর্শবান শিক্ষক এবং উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের সংস্পর্শে এসে স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হলাম। রাজনীতিকে সযতেœ এড়িয়ে ৪৩ বছরের কর্মজীবনে নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। চাকরির সুবাদে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিচারপতি, দেশ-বিদেশের রাষ্টদূত, মন্ত্রী, সামারিক ও বেসামরিক পদস্থ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতের বিরল সুযোগ আমাকে অহংকারী করেনি। প্রজাতন্ত্রের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শেষে কানসাটে স্বগৃহে ফিরে এসেছি। তিন প্রহর পেরিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছি শেষ প্রহরের প্রতিক্ষায়। যাবার বেলায় বলতে চাই, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোনো দলের নয়, মুক্তিযোদ্ধা রাষ্টের সম্পদ’। আর ক’বছর পর সত্যিকারের কোনো মুক্তিযোদ্ধা থাকবে না। সুতরাং মুিষ্টমেয় ক’জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার না নিয়ে রাষ্টীয় অনুষ্ঠানগুলিতে বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ, গ্রামগঞ্জে থাকা শিক্ষিত, নিরক্ষর, যোদ্ধাদের শেষ কথাটি বলার সুযোগ দিন। প্রতি গণনায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধির লজ্জাজনকÑ লাঞ্ছনার হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিন। বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি যানবাহনে, হাসপাতালে, বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় দিন। মনে রাখবেন, আমরা প্রার্থিব কোনো লোভ লালসা নিয়ে যুদ্ধ করিনি। সেনা- বাহিনীর মত স্বতন্ত্র ইউনিট বিবেচনা করে দুস্থ বঞ্চিত এবং বৃদ্ধ যোদ্ধাদের সম্মানী/ভাতা প্রদান বহাল রেখে আমাদের সম্মানের সাথে না ফেরার দেশে সম্মানের সাথে যেতে দিন।
লেখক: ডেপুটি রেজিষ্টার (অব.) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (সিনেট ভবন) রাজশাহী