মেয়েদের নিরপত্তা কোথায়?

আপডেট: মে ৩০, ২০১৯, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


খুব সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায়-নারী কোথাও নিরাপদ নয়। নৈতিকতা ও মানবতার চরম অবক্ষয়ের যুগে বাস করছি আমরা। সুশিক্ষার অভাব যেমন আছে তেমনি আছে পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা এখন আর একটি ছেলে আর মেয়ের সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারি না। পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি যে সম্মান সেটা প্রায় শূন্যের কোঠায়। সম্পর্কের জটিলতার কারণে জীবন থেকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সততা, নির্মল আনন্দ বিলীন হতে বসেছে স্বাভাবিক ও সাধারণ জীবন থেকে। কোনো সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে দেখার অভ্যেসটাও প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এ কোন সর্বনাশের মুখে দাঁড়িয়ে আছি আমরা?
সন্তান জন্ম নেবার আগেই পরিবারের প্রায় সকলের প্রত্যাশা থাকে অনাগত শিশুটি মেয়ে না হয়ে ছেলে হোক। এখানেই শুরু হয় বৈষম্য। শিশুটি যদি মেয়ে হয়- তাহলে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়, অনেক পরিবারেই। সে সব পরিবার হাতে গানা- যাঁরা মেয়ের আগমনকে স্বাগত জানান। জন্ম থেকে যে বৈষম্যের শুরু তা চলতে তাকে আজীবন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে। ছেলে শিশুটি যে স্নেহ, ভালোবাসা ও আদরযত্নে বড় হয়- মেয়েট শিশুটি অনেকাংশে তা পায় না। ব্যতিক্রম যে নেই সেটি বলছি না। তবে সেটা হাতে গোনা। যারা অর্থাৎ কন্যা শিশুরা যথাযথ আদর-যত্ন ও ভালোবাসায় বেড়ে উঠে নিঃসন্দেহে তারা ভাগ্যবান। প্রকৃতঅর্থে কন্যাশিশুর এ নিগ্রহ শুরু হয় পরিবার থেকে। এখন এমন অবক্ষয় চলছে যে কন্যা শিশুটি তার গৃহ শিক্ষক থেকেও নিরাপদ নয়। সে নিরাপদ নয় তার নিকট আত্মীয় কোনো কোনো পুরুষ থেকেও। এমনকি পরিচিত তার কোনো পাড়া-প্রতিবেশী থেকেও। নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে কোমলমতি কন্যা শিশুদের যৌন নির্যাতন করে থাকে। ছদ্মবেশী এসব লোকের সংখ্যাও সমাজে কম নয়।
একটু বড় হয়ে যখন তারা স্কুলে যায় তখন শিকার হয় বখাটেদের। সে উপদ্রব বড় মারাত্মক। অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা, উত্যক্ত করা- এমনকি জোর করে তুলে নিয়ে যাবার ঘটনা নিতান্ত কম নয়। প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া, প্রত্যাখ্যাত হলে অমানবিক আচরণ করা- এও এ সমাজে কম ঘটে না। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, এ সব কুলাঙ্গারও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। এদের কেউ কেউ ধনীদের বখে যাওয়া সন্তান কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের চালচুলোহীন মূর্খ সন্তান, সে যেই হোক না কেন সে পুরুষ।
কলেজ কিংবা বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে ঘটনাগুলো একটু ভিন্ন হলেও মেয়েরা সেখানেও দুর্বল পুরুষদের তুলনায়। নানা প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মেয়েদের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলার ঘটনা নিতান্ত কম নয়। সেখানে শিক্ষক নামে পুরুষদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। একটি মেয়েকে অত্যাচার করার সময় তাদের চোখের সামনে নিজের মা, বোন, মাসী, পিসি-বৌদি কিংবা কোনো আত্মীয়ার মুখটি একবারও ভেসে উঠে না? তাই যদি হতো নুসরাতের মত মেয়ের এ করুণ পরিণতি হতো না। অপকর্ম করে ক্ষান্ত হয়নি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। প্রতিবাদ করায় তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করে তাকে সরিয়ে দেওয়াও হলো। এ ভণ্ড বেঁচে থাকলে আরো কত মেয়ের সর্বনাশ করবে তার সীমা-পরিসীমা নেই। বিচারের নামে কালক্ষেপণ না করে এদের অবিলম্বে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে- এদের বিচার কাজ শেষ করা উচিৎ। তাহলে আর যে সব লম্পট সমাজের আনাচে-কানাচে রয়েছে তাদের টনক নড়বে। বিলম্বে বিচার কিংবা বিচারহীনতা এসব অপকর্মকে আরো উৎসাহিত করছে।
বিয়ের পরেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। কোনো কামুক বা লম্পটের কু-নজর পড়লে আর কথা নেই। যৌতুকের অভিশাপেও কম মেয়েকে অত্যাচারের শিকার হতে হয় না। অনেককে জীবন দিয়ে যৌতুকের ক্ষুধা মেটাতে হয়। শুধু কি তাই? পরস্পরের বিরোধ, যুদ্ধ-বিগ্রহের বলীয়ও হয় এই মেয়েরা। এসব কিছুর মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেইÑ ধর্ষণ, যৌন নির্বাতন, যৌন হয়রানির প্রধান কারণ পুরুষতন্ত্র। পুরুষের গায়ে শক্তি আছে, তাই তারা জোর খাটাতে পারে। এ মনোভাব আছে- পরিবারে, সমাজে, আচারে, সংস্কৃতিতে, মূল্যবোধে, কিংবদন্তিতে ও বিশ^াসে। এর বিপরীতে সমমর্যাদা, প্রতিটি মানুষকে সম্মান করতে শেখা, মর্যাদা দেওয়া এগুলো বর্তমান সমাজে প্রায় অনুপস্থিত। প্রাচীনকালেও মেয়েদের পর্দার আড়ালে আটকে রেখে তাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে তাদের দাবিয়ে রাখা হতো। পুরুষতান্ত্রিকতার অভিশাপ থেকে তখনো নারী মুক্ত ছিল না। এখনও নেই। তবে তখন যত্রতত্র এত অনাচার দেখা যেত না। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে যতই বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, নারী তত বেশি নিগৃহিত হচ্ছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নারীকে স্বাধীনতা দেওয়া যাবে না। নারী স্বাধীনতার সাথে সাথে নারীর মর্যাদার দিকটিও গুরুত্বের সাথে দেখতে ও বিবেচনা করতে হবে। একজন নারীও মানুষ- তাকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়া উচিৎ। এটি আমাদের সমাজে অনেকটাই অনুপস্থিত। ফলে মেয়েরা হয়রানির শিকার হয় নানা ক্ষেত্রে। নারী যে দুর্বল, সে যে অধস্তন- এ শিক্ষাটি সমাজের প্রায় সর্বত্রই বিরাজিত। কর্মক্ষেত্রেও সমযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের মেধার স্বীকৃতি মেলে কালভদ্রে। কথাটি অনেকে আমলে না নিতে পারেন কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষেণ করলে দেখা যাবে, স্বীকার না করলেও কথাটি সর্বৈব সত্য। এ ধারণা আমাদের সমাজে ছিল এবং এখনও আছেÑ্ এ ধারণাই বহু সর্বনাশ ও মানবেতর আচরণের জন্ম দিচ্ছে।
আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে চরম নৈরাজ্য। পত্রিকান্তরে জানা যায়, আমাদের দেশে প্রায় ২৬ লাখ গাড়ি আছে। কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। যাঁদের লাইসেন্স আছে, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ নেই। যাঁদের লাইসেন্স আছে তাঁদের পরীক্ষা নিলে, বেশিরভাগই ফেল করবে। এসব চালক, হেলপার, কন্ডাকটরদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সে প্রশিক্ষণ শুধু গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নয়। প্রশিক্ষণ হওয়া উচিৎ মূল্যবোধের। তাঁদের বুঝতে শিখতে হবে যে প্রতিটা মানুষের জীবন মূল্যবান। তাঁদের সামান্য ভুলে কোনো মানুষের জীবনের যেন হানি না হয়- সেদিকে তাঁদের গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে সমাজে মেয়ে এবং ছেলে সমান। নারীকে বিশেষভাবে সম্মান করতে হবে। তারা মায়ের জাতি। ঘরে বাইরে সর্বত্র মেয়েদের সম্মান করতে শিখতে হবে। অপরিচিত, আত্মীয়, অনাত্মীয় নির্বিশেষে সব মেয়েকে সম্মান করতে শিখতে হবে। সে শিক্ষা নেই বলেই গণপরিবহণে মেয়েরা নিরাপদ নয়। সম্প্রতি তানিয়া নামের নার্সটি নারকীয় পশুত্বের বলী হলো স্বর্ণলতা বাস ড্রাইভার, হেলপার ও কন্ডাকটার কর্তৃক। কী দোষ ছিল তানিয়ার? মানুষ যদি তার পাশবিকতাকে দমন করতে না পারে তাহলে তানিয়ারা সর্বত্রই অনিরাপদ। কিন্তু ভয়ঙ্কর এই বিভীষিকা থেকে সমাজ যদি মুক্ত না হয় তাহলে আমাদের মায়েরা, মেয়েরা বোনেরা কেউ নিরাপদ নয়। কে যে কোথায়, কখন কোন নরপিশাচের উন্মত্ততার শিকার হবে তা আমরা কেউ জানি না। কিন্তু এ অরাজকতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে আমাদের দেশের যে উন্নয়ন তা মুখ থুবড়ে পড়বে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই একটা দেশের সার্বিক উন্নয়নের মানদণ্ড হতে পারে না।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের চাওয়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার স্বার্থে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়ে সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যেভাবে একের পর এক নারী নির্মমতা ও পাশবিকতার শিকার হচ্ছে তার আশু প্রতিকার করুন। নুসরাত হত্যার বিচার শেষ না হতেই তানিয়াকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে।
আরো কত নুশরাত, তানিয়া যে দেশের অন্যত্র নিগৃহিত হচ্ছে তার সঠিক খবর আমরা জানি না। এমনটা ঘটতে থাকলে নারীর অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। দেশ পিছিয়ে পড়বে। নজরুলের কথায়-
কোনদিনও একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
এ কালে মেয়েরা শুধু প্রেরণা ও শক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, তারা জয় করে নিতে শিখেছে। পুরুষের সহযোগী হয়ে তারা কাজ করছে। নারীর এ বিজয়কে সহিংসতা দিয়ে থামিয়ে দেবেন না।
আমরা হতবাক, আজ ঘরে-বাইরে অফিস-আদালতে, মাঠে-ঘাটে, শিক্ষায়তনে, বাসে-ট্রেনে, হাটে-বাজারে এমনকি ধর্মালয়েও- কোথাও মেয়েরা নিরাপদ নয়। মেয়েদের উপর অত্যচার করেই এসব পশুরা ক্ষান্ত হয় না, তাদের হত্যা করা হয়। গভীর উদ্বেগের বিষয় এসব অত্যাচারের শিকার প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশু কিংবা কিশোরী। অত্যাচারের পর হত্যার শিকারও হয় শিশু কিশোরীরাই বেশি। দিনের পর দিন এ অরাজকতা বেড়ে যাবার পেছনে যেমন পুরুষতন্ত্র দায়ী তেমনই দায়ী প্রতিকার, প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকা।
কোথায় মেয়েরা নিরাপদ? লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়ে যদি রাত হয়ে যায় তাহলে কি করে সে ফিরবে? পথে যে সে কারো লালসার শিকার হবে না এ নিশ্চয়তা কে দেবে? সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে দিয়ে যদি দেখা যায় সে একাই মেয়ে- বাকীরা ছেলে, সেখানেও কি সে নিরাপদ? না। যদি কোনো নারীকে পুলিশের কাছে যেতে হয়, সেখানে যদি কোনো নারী না থাকে সেখানেও কি সে নিরাপদ? না। তাহলে কি কোথাও নারী নিরাপদ নয়? একটা দেশের এ অনাচার দূর করার জন্য দরকার সামাজিক আন্দোলন, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং শিক্ষা কার্যক্রমের পাঠ্য বইয়ে নারীর সমান অধিকার, সমমর্যাদা, সমান অংশগ্রহণ, নারীকে অধস্তন ভাবা, নারী নির্যাতনযোগ্য এসব ভাবনা বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম, সিনেমা, নাটক ইত্যাদিতে কোনোভাবে নারীকে হেয় করে দেখানো চলবে না। ভুল করেও যেন কোনো পুরুষ মেয়েকে অপমানিত না করে এ শিক্ষা দিতে হবে। কেউ কোনো মেয়েকে অপমান করলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি এটা করা সম্ভব হয়, তাহলে সমাজ থেকে মেয়েদের নির্যাতনের নানা কৌশল আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা আশাবাদী সমাজের প্রত্যেকটি সচেতন মানুষ তাঁদের সন্তানদের সুশিক্ষা দেবেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়নকে সবৈবভাবে সার্থক করে তুলবেন।