মোহনপুরে জনমনে পুকুর আতঙ্ক || প্রশাসন নির্বিকার

আপডেট: জুন ২০, ২০১৯, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মোস্তফা কামাল, মোহনপুর


মোহনপুরে ফসলি জমিতে এভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে -সোনার দেশ

কৃষি অধ্যুষিত মোহনপুরে জনসাধারণের মাঝে এখন পুকুর আতঙ্ক। হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, খাল, বিল, নালাসহ পানি নিষ্কাসনের প্রধান স্থানগুলো দখল করেই চলছে বাণিজ্যিক পুকুর খনন। স্থানীয়দের অভিযোগ নীরব দর্শকের ভূমিকায় কৃষিবিভাগ ও বরেন্দ্র বহমুখী প্রকল্প বিএমডিএসহ স্থানীয় প্রশাসন। বর্ষামৌসুমে উঁচু জমির ফসলহানির পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ঝুঁকিতে কয়েক শতাধিক বাড়িঘর। তবে অনেক পুকুর খননকারিদের দাবি আগ্রহী কৃষকদের অনুরোধে সাংবাদিকসহ প্রশাসন ম্যানেজ করেই পুকুর খনন করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণ পুকুর খনন বন্ধ করতে এবছরের ১০ মার্চ উচ্চ আদালতের ২৪৭৬ নম্বর রিট পিটিশনের আলোকে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারী করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানওয়ার হোসেন। অবৈধ পুকুর খনন বন্ধের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারীর দাবি এলাকাবাসীর।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর প্রধান কৃষি অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত মোহনপুর উপজেলা। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসেব মতে ছোট আয়তনের এ উপজেলায় মোট আবাদী ভূমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২হাজার হেক্টর। দুই বছরের ব্যবধানে ফসলি জমি কমে এর পরিমাণ দাড়িছে প্রায় ১১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমি। চলতি মৌসুমের পুকুর খনন শেষ হলে আরো কমে আসবে প্রায় সাড়ে ৭শ হেক্টর জমি। প্রতি বছর পুকুর খননের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে আগামি পাঁচ বছেরের মধ্যে আবাদী জমি ফুরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন অনেকেই। সম্প্রতি চলছে বিশাল আয়োতনের প্রায় ১০টি পুকুর খনন। পুকুর খননের ভয়াবহতার কবলে কেশরহাট পৌর এলাকার মগরা বিল। উল্লেখযোগ্য এসব পুকুর খননকারিরা হলেন ধুইল বিলে আলমঙ্গীর মেম্বার, বাবু হোসেন, লিখন, বিদ্যাধরপুর বিলে সাফিউল আলম সাফি, তেঘর মাড়িয়া বিলে এনামুল হক, রানা হোসেন, ও শিবপুর বিলে নাজমুল হোসেন। প্রতিটি পুকুরের আয়োতন প্রায় ২০ বিঘা থেকে ৮০ বিঘা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে চলতি বছরেই প্রায় অর্ধশতাধিক পুকুর খননের কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি দিনরাত চলছে প্রায় অর্ধশতাধিক (এস্কেভেটর) ভেকু মাটি কাটা যন্ত্র। আর প্রভাবশালীরা এসব যন্ত্রের ঠিকাদারী করে অধিক ফায়দা লুটছেন। অনেক সময় পুকুর বন্ধে মাঠে নেমে ব্যবস্থা নিতে গেলে রাজনৈতিক প্রভাবে নিস্ফল ফিরে আসতে হচ্ছে প্রশাসনিক কর্তাদের।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর পানি প্রবাহের সকল পথ উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা উপেক্ষা করেই খাল, বিলসহ সবধরনের ফসলের জমি দখল করে একাধারে পুকুর খননের কারণে চরম জলাবদ্ধতায় দিন দিন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে ফসলহানির পরিমাণ। বিখ্যাত মিষ্টি পানের ব্যপক চাষ হয়ে থাকে মোহনপুরে। এছাড়াও ধান, আলু, ভুট্টাসহ সকলপ্রকার সবজি চাষের প্রসংশার দাবিদার এ উপজেলাটি। এমন কি বরেন্দ্র বহুমুখী প্রকল্পের (বিএমডিএ) আওতাধিন গভীর নলকূপের মাটির নিচের পাইপ ড্রেন ও আউট লিটার রাতের আঁধারে তুলে ফেলে সেখানেও পুকুর খনন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় নি। উপজেলা মৎসবিভাগসহ এধাধিক তথ্যের আলোকে জানা গেছে, ২০১৭ সালে মোহনপুর উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক পুকুরের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬শ ১৮টি পুকুর। যার আয়তন প্রায় ৫৬৭ হেক্টর। এক বছরেই পুকুরের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০৫টি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে পুকুর খননের পরিমাণ বাড়বে প্রায় ১৫০টিরও অধিক।
উপজেলার বাকশৈল গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, মগরা বিলে তিন ফসলি জমিতে পুকুর করে বিলের আবাদী জমি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন খাল-ডাড়া দখল করে পুকুর খননের কারণে উপরের জমিতে খরা মৌসুমে পানি জমে থাকার জন্য কোনো ফসল হচ্ছে না। কৃষকের দুর্দশা দেখে আমাদের এমপি স্যার নিজে পানিতে নেমে পুকুরের পাড় কেটে পানি নামার ব্যবস্থা করে দিয়ে যান। কয়েক দিন পরে ক্ষমতাধর পুকুর মালিকরা আবার পাড় বেঁধে দেন। বার বার তো আর এমপি স্যার আসতে পারবেন না। এভাবে দুই বছর ধরে আমাদের চাষ করা হাজার হাজার বিঘা জমির আউস ধান ডুবে বিনস্ট হচ্ছে। সরকারি লোকেরা ব্যবস্থা না নিলে এখন আমাদের ফসলসহ বাড়িঘর পানিন্দী হয়ে পড়বে।
খাড়তা বিলের পুকুর খনন কারি এনামুল হক বলেন, জমির মালিকরা ডেকে পুকুর খননের জন্য জমি দিচ্ছে। কৃষকদের ৭০বিঘা জমির খাজনা পরিশোধের পাশাপাশি সাংবাদিকসহ প্রশাসন ম্যানেজ করে পুকুর কাটতে অনেক বেশি খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
মোহনপুর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মেহবুব হাসান রাসেল বলেন, মোহনপুর উপজেলা কৃষি নির্ভর একটি ছোট এলাকা। ফসলি জমি নস্ট করে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে একের পর এক পুকুর খনন চলছে। অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজে আসছে না। প্রতিবছর এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে অনতিবিলম্বে খাদ্য সংকটসহ চরম জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী হয়ে পড়বেন উপজেলার মানুষ। এজন্য জনসাধারণকে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ধরণের ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের নজরদারি কামনা করেন তিনি।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি অফিসার রহিমা খাতুন বলেন, মোহনপুর ছোট আয়তনের একটি উপজেলা। এখানের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ পুকুর খনন করা হয়েছে। ফলে এখান কৃষি ভূমির পরিমাণ দিন কমেই আসছে। হুমকির মুখে পড়ছে এখানকার প্রধান ফসল পান ও ধানের চাষ। এধরনের পুকুর খনন বন্ধের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে আসছে উপজেলা কৃষিবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুস্তাক আহমেদ বলেন, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধের জন্য উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অতিরিক্ত পরিমাণ পুকুর খননের জন্য নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে বিশৃঙ্খলারোধে পুকুর খননের খবর পেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হলেও রাতের আঁধারে পুকুর কাটার কারণে একবারেই প্রতিরোধ হচ্ছে না। তারপরও পুকুর খনন বন্ধ করলে কৃষকরা দাবি তুলে ভাল ফসল হচ্ছেনা, দাম পাচ্ছিনা এখানে পুকুর কাটতে দিতে হবে। এছাড়াও কিছুটা রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। তবে অবৈধ পুকুর বন্ধে প্রশাসনিক চেষ্টা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহিদুজ্জামান শহিদ বলেন, কেশরহাটের মগরা বিলসহ সারা উপজেলা জুড়ে পুকুর খননের হিড়িক পড়েছে। চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে আমাদের কৃষি জমি। কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নজরদারি কামনা করছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানওয়ার হোসেন বলেন, উচ্চ আদলতের রিট পিটিশন অগ্রাহ্য করে অনেক স্থানে অবৈধভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এসব অবৈধ পুকুর খনন বন্ধের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ইতোপূর্বে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি ও ফসলহানি রোধে অবৈধ পুকুর খননের খবর পেয়ে পুকুর খনন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নতুন কোনো পুকুর খননের অভিযোগ পেলে দ্রƒত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ