যাত্রী পরিবহন ভেঙে পড়লেও স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন

আপডেট: আগস্ট ৬, ২০১৮, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অঘোষিত ধর্মঘট ডেকেছেন বাস মালিক-শ্রমিকরা। এতে ভেঙে পড়েছে সড়কপথে যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা। তবে স্বাভাবিক রয়েছে পণ্য পরিবহন। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশে নির্বিঘেœ চলাচল করছে পণ্যবাহী যানবাহন।
পণ্যবাহী পরিবহনের মালিকরা বলছেন, পণ্য নিয়ে তারা কোথাও বাধার মুখে পড়ছেন না। পণ্য পরিবহনে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
গত ২৯ জুলাই ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর থেকেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন করছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের শুরুতে চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ হয়ে যায় দূরপাল্লার বাস। গতকাল গণপরিবহনশূন্য হয়ে পড়ে রাজধানীও। বাস ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, চালক-শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগে যান চলাচল বন্ধ রেখেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।
নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে দূরপাল্লার রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তবে পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ। তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাস বন্ধ রয়েছে। তবে পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই। তাই পণ্যবাহী যান চলাচলে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়নি।
দেশজুড়ে শিক্ষার্থী বিক্ষোভের পরও চট্টগ্রাম থেকে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। গতকাল চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০টি পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার ট্রাক পণ্য পরিবহন হয়।
জনস্বার্থে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চালু রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইমমুভার মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির সদস্য সচিব মো. সিদ্দিক বণিক বার্তাকে বলেন, সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ এককভাবে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট দিয়েছে। আমরা ঘোষিত ধর্মঘটে পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধ রাখার কোনো কারণ দেখি না। এ ধর্মঘট ডাকার সময় আমাদের সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ফলে দেশের স্বার্থে আমরা পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখব। প্রতিদিনের মতো চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইমমুভার ছেড়ে গেছে।
চট্টগ্রাম ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইমমুভার মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পণ্যবাহী যানবাহনগুলো সারা দেশে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত থাকায় যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ থাকে। যাত্রীবাহী যানবাহন শুধু দুটি গন্তব্যে চলাচল করায় অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও কাগজপত্র হালনাগাদ করা হয় না। অন্যদিকে যাত্রীবাহী একই যানবাহনে একাধিক চালক প্রয়োজন হলেও পণ্যবাহী যানবাহনে চালক নির্ধারিত থাকে।
রাজধানীতে সবজির বড় অংশের জোগান আসে উত্তরবঙ্গের বগুড়া থেকে। জেলার মহাস্থান হাট থেকে সবজি সরবরাহে কোনো বিঘœ ঘটছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল সন্ধ্যায় মহাস্থান হাটে গিয়ে সবজির ট্রাক লোড করতে দেখা গেছে। সবজি ব্যবসায়ীরা জানান, শনিবার দুপুরে ও সন্ধ্যায় ট্রাকে করে কাঁচামাল পরিবহন করা হয়েছে। সিলেট, ময়মনসিংহ ছাড়াও কিছু সবজির ট্রাক ঢাকায় গিয়েছে। বর্ষার কারণে কয়েকটি সবজির দামে সামান্য হেরফের হয়েছে। তবে দাম তেমন বাড়েনি।
বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান আকন্দ বলেন, বাস মালিক সমিতির নেতারা তাদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ট্রাক মালিক সমিতি তাদের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ট্রাক চলাচল করছে। তবে কয়েকটি স্থানে ট্রাক চলাচলে বাধার মুখে পড়ছে।
ভারতীয় পেঁয়াজ, পাথর, খৈল, ভুসিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য আসে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। বন্দর থেকে এসব পণ্য রাজধানীসহ সারা দেশে নির্বিঘেœ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান সেখানকার ব্যবসায়ীরা। হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের কারণে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও হিলি স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে। স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আসা পেঁয়াজ, খৈল, ভুসি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ২০০ ভারতীয় ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করে। যথারীতি এসব পণ্য বাংলা ট্রাকে লোড হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশে ছেড়ে চলে গেছে।
মোংলা, বেনাপোল, ভোমরা, বুড়িমারী, আখাউড়া ও নাকুগাঁও, সোনামসজিদ, টেকনাফ, বিয়ানীবাজার, বিবিরবাজার, বিরল, তামাবিল, দর্শনা, চিলাহাটিসহ সবক’টি স্থলবন্দর থেকেও পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানা গেছে।
সারা দেশে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকার কথা বলেছেন বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মকবুল আহমেদও। তিনি বলেন, আমরা কোনো ধরনের ধর্মঘটে যাইনি। পণ্যবাহনী যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে চলমান আন্দোলনে এখন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন বিঘিœত না হলেও সামনের দিনগুলোয় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা। চলমান এ পরিস্থিতির প্রভাবে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের বিদেশী ক্রেতারাও। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের বায়ারদের অনেকেই তাদের ট্রিপ বাতিল করছেন। দু-চারজন মালিক এরই মধ্যে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। তাছাড়া আমাদের একটা ভাবমূর্তি ছিল, সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন আমরা ভ্রমণ সতর্কতা তুলে দেয়ার অনুরোধ করেছি। সাম্প্রতিক জাপান সফরে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ দেশটির সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন ভ্রমণ সতর্কতা তুলে নেয়ার। এখন যে ধরনের ঘটনা ঘটছে, তাতে তা আবার শুরু হবে।
কোনো শিপমেন্ট বাতিল হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই এটা বলা যাচ্ছে না। যেহেতু রাতে ট্রাক চলাচল করছে, এজন্য খুব একটা সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি। আজ (গতকাল) থেকে তো দূরপাল্লার বাস পুরোপুরি বন্ধ। এরপর কী হবে, তা দুয়েকদিন পর বোঝা যাবে। তথ্রসূত্র: বণিক বার্তা