বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

যুদ্ধাপরাধীদের নাম ও ছবি অপসারণ করতে হবে

আপডেট: January 21, 2020, 12:11 am

সুজিত সরকার


আমরা কোনো জাতীয় দিবসে কিংবা পার্টির কর্মসূচির শোভাযাত্রায় দীপ্তকণ্ঠে শ্লোগান দিই, ‘বাংলাদেশের মাটিতে রাজাকারদের ঠাঁই নাই’, শান্তি কমিটির আস্তানা বাংলাদেশে হবে না’ ইত্যাদি। তারপর সব শেষ। অর্থাৎ আমরা যা বলি তা করি না। যদিও একদল কর্মী ও শ্লোগানে সুর মেলানো কর্মীর পক্ষে কোনো প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা থেকে অপসারণের সুযোগ নেই, কিন্তু সেই শোভাযাত্রা ও সমাবেশে তো নেতারা থাকেন, যারা নাম ও ছবি অপসারণের ক্ষমতা রাখেন। তারাও শেষ পর্যন্ত তা করেন না। নেতা-ও কত্তারা কি তাহলে ওই ঘাতক-দালাল যুদ্ধাপরাধীদের মনে মনে ভয় পান কিংবা তাদের তোষণ-পোষণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? করেন বলেই কোথাও কোথাও এখনো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে তাদের সহবাস। হাইকোর্ট দেশবাসীর আকাক্সক্ষার পক্ষে রায় ঘোষণা করেছেন। ফেব্রুয়ারির মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের নামাঙ্কিত সড়কের ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করতে হবে। কোথাও তাদের ছবি থাকলে সেখান থেকে অপসারণ করতে হবে। জানি না দেশের কোনো শহরে মেয়র-কাউন্সিলর এবং সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কত্তারা এই নির্দেশ পালন করে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন কি না।
গত বছর ৯ জুলাই হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও খিজির হায়ত এক ওসির দাপট ও দুষ্কর্মের শুনানি শেষে বলেছিলেন, ‘ওসি-ডিসি-রা নিজেদের জমিদার মনে করে।’ আমরা বোধ করি, এদের সঙ্গে ভিসিদেরও যুক্ত করা হোক। তারাও বিশ^বিদ্যালয়কে তাদের জমিদারি মনে করেন। কারণ তাদের কাজের জবাবদিহিতার প্রয়োজন হয় না। কাকে চাকরি দেবেন, কাকে দেবেন না, নিতান্তই সেটা তাদের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার। তারা বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও পাত্তা খুব একটা দেন না। দিলে এতো নৈরাজ্য আর স্বার্থ-সংশ্লিস্ট কাজে তারা উৎসাহী হতেন কী করে!
বর্তমান সরকার ঘোষণা করেছে, কোথাও স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান থাকবে না। থাকলে নাম পাল্টাতে হবে। রাজশাহী শহরে স্বাধীনতা বিরোধী এক ব্যক্তির নামে ক্রীড়াঙ্গনের নামকরণ করা হয়েছে। অথচ রাজশাহীর মেয়র একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। তার পিতা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলদের গুলিতে নিহত হন। যিনি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। ঘাতক-দালাল আর সামরিক স্বৈরাচারের সঙ্গে আপোস করেননি, বলেই তিনি জীবন দিয়েছেন কারাগারে। রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তার পিতা অ্যাডভোকেট খন্দকার আশরাফও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আপোসহীন সংগঠক। এই দু’জন যখন জনসমর্থন নিয়ে জনসেবার দায়িত্ব পান, মহানগরীর শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ পর্ছিন্নতার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তখন সরকারি নির্দেশ কেনো অমান্য করছেন তারা, সে জবাব তারাই ভালো দিতে পারবেন। অনতিবিলম্বে স্বাধীনতা বিরোধীর নাম-নিশানা ওই ক্রীড়াঙ্গন থেকে মুছে কোনো শহিদ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সংগঠকের নাম দিতে হবে। এটা তাঁদের নির্বাচনী অঙ্গীকারও।
রাজশাহী টেনিস গ্রাউন্ডের নামকরণ করা হয়েছে একাত্তরের এক ভয়ানক যুদ্ধাপরাধীর নামে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে দেশের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া-সংগঠকেরও পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এ নিয়ে শহরে যথেষ্ট কানাঘুষা হয়েছে। এবার বছরের প্রথমেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাজপথে দাঁড়িয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে দাবি জানিয়েছেন, টেনিসগ্রাউন্ড থেকে ওই কুখ্যাত ব্যক্তির নাম মুছে ফেলতে হবে। সে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছাত্র-জনতার ওপর তার লেঠেল বাহিনী নিয়ে একাধিকবার আক্রমণ করেছে। অনেককেই করেছে আহত। একাত্তরেও পাকিস্তানি সেনাদের জিপে বসে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছে, চিহ্নিত করেছে কোনটা আওয়ামী ও কমিউনিস্ট পরিবারের বাড়ি, কোন্ বাড়ির সন্তান মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। শহরে লুটপাট ও ধর্ষণেও সে ছিলো পাকিস্তানিদের সহায়ক। মদ-মেয়ে মানুষ নিয়ে স্ফূর্তি করেছে বোয়ালিয়া ক্লাবসহ নানা স্থানে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলেও সত্য, তাকে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও সংগঠক শাস্তির আওতায় না এনে বরং পুরস্কৃত করেছেন। যে ভাবে এখন যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলো না, তাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা হয়। অবিকল জাফর ইমামকেও একই ভাবে স্বাধীনতার পর কোন্ োএক অদৃশ্য সুতোর জোরে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাকে শিক্ষা বোর্ডের ক্রীড়া অফিসারের পদও দেয়া হয় স্বাধীনত্তোর সময়েই। আজকে মানুষ জেগেছে। চিনতে শিখেছে শত্রু-মিত্র কে। তাই মুক্তিযোদ্ধারা তার নাম টেনিস গ্রাউন্ড থেকে মুছে ফেলার দাবি জানিয়েছে। শহরবাসী এই দাবির প্রতি সমর্থনও ব্যক্ত করেছে।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়েও দু’জন উপাচার্যের ছবি উপাচার্য ভবনের লাউঞ্জে টানানো রয়েছে। উপাচার্য মহোদয়ের প্রতি আহ্বান, তিনি অনতিবিলম্বে ওই দুই পাকিস্তানি হানাদার-সহযোগী দালাল উপাচার্যের ছবি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেবেন এবং ওই কাপড়ে লিখবেন ‘যুদ্ধাপরাধী সাজ্জাত হোসেন’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধী আবদুল বারী’। না হলে মনে করতে হবে, তারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করছেন এবং যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের বাসিন্দা। যুদ্ধাপরাধীদের ভয় পান ও মনে মনে শ্রদ্ধা করেন। না হলে হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও কেনো ওই দুই যুদ্ধাপরাধীর ছবি সেখানে থাকে। এ ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও যুদ্ধাপরাধীর তালিকাভুক্ত। তাদেরও ছবি অপসারণ করতে হবে। লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের “একাত্তরের ঘাতক-দালালেরা কে কোথায়” শিরোনামের গ্রন্থে তাদের নাম মুদ্রিত আছে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সোলায়মান আলী সরকার (উপাচার্য বারীর সহকারি প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছে), হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থাপনা বিভাগের মকবুল হোসেন ও ব্যবস্থাপনা নাসিম আঞ্জুম (পিসিএএফ অর্থাৎ পাকিস্তান সিভিল আর্মস্ ফোর্স), আইন বিভাগের জিল্লুর রহমান, বাংলা বিভাগের আব্দুল আউয়াল, গোলাম সাকলায়েন, মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্যাটেল-এরা যতো বড়ো পণ্ডিতই হোক, এদের প্রত্যেকের ছবি বিভাগ থেকে অপসারণ করতে হবে। নয়তো কালো কাপড়ে ঢেকে দিতে হবে। কাপড়ের ওপর লেখা থাকবে তাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার তথ্য।
আমরা মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর আদর্শের কথা বলবো, কিন্তু পাশে বসিয়ে রাখবো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীর প্রেতাত্মা, এমন আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা জারি হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি বা সিন্ডিকেটের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় নয়, উচ্চ-আদালতের নির্দেশ উপাচার্য বা বিভাগের সভাপতিরাই সেটা করার উদ্যোগ নিতে পারেন। তাতে কেউ বাধা দিলে বোঝা যাবে, কারা এখনো ঘাতক-আদর্শ ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলুষিত করতে চায়। কারা আড়ালই বা করতে চায় যুদ্ধাপরাধীদের শান্তি ও মানবতা বিরোধী দুষ্কর্ম। এদেরও রাজাকারের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আজকে এই দু’তালি মালের অভাব নেই। তারা রাতে রাজাকার, দিনে মুক্তিযোদ্ধা। এ এক ভয়াবহ চরিত্র, যাদের খপ্পরে আজকের বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার এক বিরাট অংশ। মন্ত্রিসভায়, সংসদে, জেলায়-ইউনিয়নে আজকে এদের দৌরাত্ম বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এমন কি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডেও এদের দাপটই বেশি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এদের নির্মূলের দায়িত্ব আজকের প্রজন্মের দেশপ্রেমিকদেরই নিতে হবে। তবেই ২০৪১-এ উন্নত বাংলার স্পর্শের স্বপ্ন পূরণ হবে।