যেসব কাজ করবে প্রতিযোগিতা কমিশন

আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৯, ১:১৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশে বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীদের একটি অবৈধ চক্র (সিন্ডিকেট) নিত্যপণ্যের সরবরাহ-ব্যবস্থা প্রায় ব্যাহত করে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য পণ্যমূল্যের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে এই চক্রটি। মূলত পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য এই সিন্ডিকেটই দায়ী। কিন্তু এতদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কোনও হাতিয়ার ছিল না সরকারের কাছে। বিষয়টিকে বিবেচনা রেখেই ২০১২ সালে সরকার প্রতিযোগিতা আইন তৈরি করে। পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়নে গঠিত হয়েছে প্রতিযোগিতা কমিশনও। আর এই কমিশনের উদ্দেশ্য হলো—অর্থনীতিতে টেকসই প্রতিযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে সমতা আনার পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করা।
এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে—বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যেকোনও পণ্য বা সেবার কেনা-বেচা, উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ ও পণ্যের গুদামজাতকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইনটি প্রযোজ্য।
সূত্র বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের দেশে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এজন্য দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অসম প্রতিযোগিতা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রয়োজন।
দেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’। আর বাজারে অনৈতিক মুনাফার লোভে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করাই প্রতিযোগিতা আইনের উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে এই আইন বাস্তবায়নে উচ্চতর জ্ঞানভিত্তিক গবেষণাধর্মী এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর একটি কমিশন গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে এই আইনে।
আইনে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ করতে পারবে না। এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে নির্মূল করার জন্য প্রতিযোগিতা আইন তৈরি করা হয়েছে। আইনটিতে মোট ৪৬টি ধারা রয়েছে। এই আইনটি প্রণয়নের আগে বাংলাদেশে ‘মনোপলিস অ্যান্ড রেসট্রিকটিভ ট্রেড প্র্যাকটিসেস (কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৭০’ ছিল। এরপর ২০১২ সালে ‘প্রতিযোগিতা আইন-২০১২’ প্রণয়নের মাধ্যমে ওই অর্ডিন্যান্স বাতিল করা হয়।
আইনে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, সেহেতু ওই কমিশনের কাজ কী হবে? সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিযোগিতা আইনের উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী সরকার ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন’ করে। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী একজন চেয়ারপারসন এবং চার জন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি সম্পৃক্তকরণ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে এই কমিশনের কাজ।
মূলত তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো-এক. দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করে তা বজায় রাখা। দুই. বাজারে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড, এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণচেষ্টা ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ রাখা কিংবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা। তিন. এমন কিছু হলে তা নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা।
কমিশনের ক্ষমতার বিষয়ে ‘প্রতিযোগিতা আইনে’ বলা হয়েছে, কোড অব সিভিল প্রডিউসর-১৯০৮ (অ্যাক্ট-৫ অব ১৯০৮)-এর অধীনে একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন, প্রতিযোগিতা কমিশনও সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
আইনে বলা হয়েছে, কমিশন যেসব কাজ করবে, সেসব কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-(ক) বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা নির্মূল করা, প্রতিযোগীকে উৎসাহিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। (খ) কোনও অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাবিরোধী সব চুক্তি কর্তৃত্বময় অবস্থান ও অপচেষ্টার তদন্ত করা। (গ) প্রতিযোগিতা আইনের অধীনে অপরাধের তদন্ত পরিচালনার পাশাপাশি মামলা দায়ের ও পরিচালনা করা। (ঘ) জোটবদ্ধতা ও জোটবদ্ধতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি জোটবদ্ধতার শর্তাদি ও জোটবদ্ধতা অনুমোদন বা নামঞ্জুর সংক্রান্ত বিষয় নির্ধারণ করা। (ঙ) প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত বিধিমালা, নীতিমালা, দিক-নির্দেশনামূলক পরিপত্র বা প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া। (চ) প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করা। (ছ) সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লোকজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা সম্পর্কিত সার্বিক বিষয়ে প্রচার ও প্রকাশনার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা। (জ) সরকারের পাঠানো প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত যেকোনও বিষয় প্রতিপালন, অনুসরণ বা বিবেচনা করা। (ঝ) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে অন্য কোনও আইনের অধীন গৃহীত ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা।
প্রতিযোগিতা কমিশন প্রসঙ্গে জানতে জানলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন পাস করা হয়েছে। এ আইনের ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এর ফলে বাজারে অসম বিপণন ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে না। যদিও কমিশনটি এখনও সেভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি। তবে অচিরেই কমিশনকে শক্তিশালী করে গড়ে হবে।’
এ প্রসঙ্গে কমিশনের চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে এসব সীমাবদ্ধতা কেটে যাবে। জনবল কম হওয়ায় কমিশন এখনও বাজারে দৃশ্যমান হয়নি। ২৯ জনের জায়গায় মাত্র ৯জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে প্রতিযোগিতা কমিশন চলছে। কমিশনে চারজন সদস্যের পদ এখনও শূন্য। তবে, জনবল বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। এটি সমাধান হয়ে গেলে কমিশন আরও গতিশীল হবে।’
উল্লেখ্য, প্রতিযোগিতা আইন বাংলাদেশের জন্য নতুন হলেও আধুনিক যুগে ১৮৮৯ সালে প্রথম কানাডায়, ১৮৯০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ১৯৪৭ সালে জাপানে প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত আইন পাস হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ১০টি দেশে এ আইন প্রচলিত ছিল। ২০১৭ সালে এ আইন বিশ্বের ১৩০টি দেশে চালু হয়। এখন এশিয়ার ১৭টি দেশে প্রতিযোগিতা আইন চালু আছে।-বাংলা ট্রিবিউন