যেসব কারণে চিকিৎসককে বয়কট করবেন

আপডেট: মার্চ ৬, ২০১৮, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


চিকিৎসাসেবা মহৎ পেশা। চিকিৎসকরা অসুস্থ মানুষকে সেবা দিয়ে সুস্থ করেন কিংবা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের ধারণা, চিকিৎসকরা রোগীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেন। সব চিকিৎসক এমন নন। কিছু চিকিৎসকের অসততার কারণে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।
অসৎ বা খারাপ মনোবাসনাপূর্ণ চিকিৎসক চেনার অনেক উপায় রয়েছে।
অসঙ্গতভাবে স্পর্শ করলে: ‘সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ: এ জার্নাল অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট’ অনুসারে, ঠিক কত সংখ্যক চিকিৎসক রোগীদের যৌন হয়রানী করেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু নিঃসন্দেহে এমন ঘটনা ঘটে। এটি শুধু অপরাধই নয়, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব ক্ষেত্রে নার্সের উপস্থিতিতে আপনার শারীরিক পরীক্ষা করানো উচিৎ। যদি এতে কোনো চিকিৎসক রাজি না হন তাহলে তাকে এড়িয়ে চলুন।
অফিস নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন: ব্রিটিশ জার্নাল অব জেনারেল প্র্যাকটিস অনুসারে, অসুস্থ ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসকদের অফিস সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকে। অনুপযুক্ত উপায়ে পরিষ্কৃত অফিস ও ইকুইপমেন্ট থেকে রোগীদের মধ্যে মারাত্মক বা প্রাণনাশক রোগ ছড়ানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে। আপনি জীবাণু দেখবেন না, কিন্তু নোংরা ও অগোছালো অফিস দেখে বুঝতে পারবেন যে, এটি সঠিক উপায়ে স্যানিটাইজ করা হয়নি। এ ধরনের চিকিৎসকের চেম্বার এড়িয়ে চলুন।
সব কিছুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক: ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন অনুসারে, বর্তমান বিশ্ব যেসব বড় স্বাস্থ্য উদ্বেগ মোকাবেলা করছে তাদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি এবং এর পেছনে ভূমিকা পালনকারী প্রধান একটি ফ্যাক্টর হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃতপক্ষে তিনটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনের মধ্যে একটি অপ্রয়োজনীয়। যদি আপনার চিকিৎসক যেকোনো কিছুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক নেয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে তিনি আপনার অনুকূলে কাজ করছেন না বলে ধরে নিতে হবে।
বিভিন্ন পদ্ধতির পরামর্শ: এমডি ইনসাইডারের সিইও ডেভিড নরিস বলেন, ‘অ্যাকটিং কিংবা প্লামিংয়ের ক্ষেত্রে সবজান্তা হওয়া বোনাস হতে পারে, কিন্তু মেডিক্যাল সেবার ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক একটি ক্ষেত্রে যত বেশি বিশেষজ্ঞ হবেন, আপনি তত বেশি ভালো সেবা পাবেন। তিনি আরো জানান, উচ্চ পারফরম্যান্স আসে মূলত কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি কত বেশি চর্চা করা হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে। কোনো চিকিৎসক যত বেশি একটি পদ্ধতিতে কাজ করবেন, তিনি তত বেশি ওই পদ্ধতিতে দক্ষ হবেন। তাই সেসব চিকিৎসকদের এড়িয়ে চলুন যারা সবকিছুর (যেমন- ফেইস লিফট থেকে ব্যাক সার্জারি) অ্যাডভার্টাইজ করেন। কারণ একজন চিকিৎসক সব কিছুতে বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না।
ভুল স্বীকার করেন না: সবাই ভুল করতে পারে। এমনকি সুপার স্মার্ট চিকিৎসকও। কিন্তু মেডিসিনের ক্ষেত্রে ভুল করার আশঙ্কা বেশি। নরিস বলেন, একজন ভালো চিকিৎসক স্পষ্টভাষী এবং সৎ হবেন। আপনাকে প্রকৃত অবস্থা বা করণীয় কী তা সম্পর্কে তিনি জানাবেন। যদি আপনার চিকিৎসক করণীয় গোপন করেন, অন্যদেরকে দোষারোপ করেন অথবা আপনাকে মিথ্যা বলেন, তাহলে অন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। নরিস বলেন, সততা এবং স্বচ্ছতা হচ্ছে আস্থা বা বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। এসব ছাড়া আপনি ভালো সেবা পাবেন না।
স্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সত্য বলেন না: প্রাইমারি কেয়ার কম্প্যানিয়নে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, চিকিৎসকরা প্রায় ক্ষেত্রে সমস্যা সম্পর্কে কম বলেন বা বিস্তারিত বলেন না বা সম্পূর্ণ সত্য বলেন না কিংবা মাত্রাতিরিক্ত সাধারণ ব্যাখ্যা দেন। ফলে আপনার মারাত্মক শারীরিক অবস্থা বা রোগ থাকলেও আপনি মনে করতে পারেন যে, আপনি সুস্থ আছেন। আপনার এমন চিকিৎসক প্রয়োজন যিনি আপনাকে সদয় ও সহানুভূতিশীল পন্থায় সম্পূর্ণ সত্য বলতে ভয় পান না।
সম্ভাব্য সব টেস্ট অর্ডার করেন: মেডিকেল টেস্টের ক্ষেত্রে বেশি টেস্ট আর নয়। নরিস বলেন, সাধারণত অধিক টেস্টিং ভালো ফল নিয়ে আসে না। কোনো কোনো চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করতে বলেন। কারণ এর পেছনে তাদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য রয়েছে, যেমন- তারা যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে টেস্ট করাতে বলেন সেসবে তাদের শেয়ার বা মালিকানা থাকতে পারে অথবা সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা তারা পেয়ে থাকেন। এছাড়া আপনার অসুস্থতা সম্পর্কে আপনার চিকিৎসক প্রয়োজনীয় গবেষণা না করার কারণেও তিনি আপনাকে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত টেস্টের অর্ডার করতে পারেন। সতরাং এমন হলে তাকে এড়িয়ে চলাই ভালো।
* মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন না : একজন ভালো চিকিৎসক অবশ্যই তার রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কথা ভালোমতো না শুনে যে চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লিখতে বা অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যস্ত থাকেন তাকে বর্জন করতে পারেন। আপনার চিকিৎসক আপনার কথা না শুনলে তার কাছ থেকে ভালো সেবা আশা করতে পারেন না।
* অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অনুৎসাহিত করে : এমডি ইনসাইডারের সিইও ডেভিড নরিস বলেন, কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর রোগ নির্ণয়ে ভুল হয়। এটি অবধারিতভাবে ভালো চিকিৎসকের লক্ষণ নয়। যেহেতু মেডিসিন একটি জটিল বিজ্ঞান তাই আপনার ডায়াগনোসিস বা রোগ নির্ণয় সঠিক হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে সেকেন্ড অপিনিয়ন বা অন্য কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ভালো চিকিৎসকরা আপনাকে রেফারেলও দিতে পারেন। কিন্তু যদি আপনার চিকিৎসক তার কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে অন্য কোনো অপিনিয়নের প্রয়োজন নেই, তাহলে অন্য চিকিৎসকের কাছে যান।
* রোগ নির্ণয়ে বারবার ভুল টেস্ট : রোগ নির্ণয়ে যেখানে একবার ভুল টেস্ট হওয়া কঠিন, সেখানে বারবার ভুল টেস্ট দেওয়া হলে নিশ্চিত হতে পারেন, কোনো মারাত্মক ভুল হচ্ছে। আপনার চিকিৎসক আপনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় না নিলে, সঠিক ইতিহাস অনুসন্ধান না করলে, অফিসের কার্যপ্রণালী ত্রুটিপূর্ণ হলে অথবা তিনি অনভিজ্ঞ হলে কিংবা অন্যান্য সমস্যা থাকলে রোগ নির্ণয়ে ভুল টেস্ট দেওয়াটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে আপনার এমন চিকিৎসকের খোঁজ করা উচিৎ যিনি আপনার স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকৃত উৎস নির্ণয় করতে সমর্থ।
* নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ সেবনে পরামর্শ : নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, ৯৪ শতাংশ চিকিৎসকের সঙ্গে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক আছে। যার মানে হচ্ছে- তারা ফ্রি স্যাম্পল, গিফট অথবা কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের জন্য মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ থেকে পেমেন্ট পেয়ে থাকে। এটি তাদের প্রেসক্রিপশনের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলে। কোনো নতুন ওষুধ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া ভিন্ন কথা, কিন্তু যদি আপনার চিকিৎসক আপনাকে সবসময় নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ সেবনে পরামর্শ দেন, তাহলে অন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন।
* অযথা ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব: যুক্তরাষ্ট্র সরকার সম্প্রতি ওপিওইড (আফিম জাতীয় ওষুধ) ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সেখানে মধ্যবয়সি ব্যক্তিদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে ওপিওইডের অতিমাত্রায় ব্যবহার। এখনো বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দায়ী কে তা অনুসন্ধান করছে, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে যেসব চিকিৎসক ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন তারাও এর অংশ। কেউই দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যধিক ব্যথা চায় না, কিন্তু আপনার চিকিৎসকের উচিৎ হবে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার প্রেক্ষিতে সীমিত পরিমাণে এ জাতীয় ব্যথানাশক প্রেসক্রাইব করা, অন্যথায় এতে আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
* হাত অপরিষ্কার রাখেন : বর্তমানে রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে হ্যান্ডওয়াশিং বা হাতধোয়া। এ বিষয়ে জানা সত্ত্বেও অনেক চিকিৎসক রোগী দেখার আগে হাত ধোয়ার বিষয়টি এড়িয়ে চলেন। এক গবেষণায় জানা যায়, মাত্র ২২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে হ্যান্ডওয়াশ করেন। আপনার চিকিৎসকের অফিসে হ্যান্ড-স্যানিটাইজিং জেল বা সাবান এবং প্রত্যেক রোগীর রুমে পানি থাকা উচিৎ। আপনাকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার পূর্বে চিকিৎসক হাত ধুয়ে নিচ্ছেন কিনা লক্ষ্য করুন।
* প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা প্রদান: ভুয়া চিকিৎসক এড়াতে আপনি যে বিষয়ে সেবা নিতে চান সে বিষয়ে আপনার চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় সনদ আছে কিনা নিশ্চিত হোন। এমন চিকিৎসকের অনুসন্ধান করুন যিনি আপনার সমস্যা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা পেতে বোর্ড-সনদপ্রাপ্ত মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট