যে জীবন পরাভব মানে না

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৯, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

তাসনিয়া তারান্নুম


নারী শক্তির অভ্যুদয় আমাদের চারপাশ জুড়ে। অফুরন্ত সাহস, নিরব প্রতিজ্ঞার ভাষা, সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্রয় না দেবার ধৃষ্ঠতা জীবনের নতুন নতুন গল্প তৈরি ক’রে যায়। এ গল্প সংগ্রামের, এ গল্প ভালবাসার, এ গল্প প্রতিকূলতাকে জয় করার। এসব গল্পই নবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদের ভাষায় বাংলাদেশকে পাল্টে দেয়। তেমনি এক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি কলা বিক্রেতা হামিদা চেনু (৫১)। জীবন নাটকের কী নির্মম বিচ্ছেদপর্ব মা-মেয়ে ও নাতনির ক্ষেত্রে একই রকম। কিন্তু চিনুর সাহস, ত্যাগ-তিতিক্ষায় সেই বিচ্ছেদকে ভালবাসায় সম্পৃক্ত করে রেখেছেন নিজের আঁচল¯েœহডোরে।
চিনু ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। বাবা পেশায় ছিলেন কৃষক, ১৭ ভাইবোন আর মা নিয়ে ছিল চেনুদের পরিবার।
১২ বছর বয়সে খালাতো ভাই আব্বাসের সাথে বিবাহ হয়েছিল চেনুর। স্বামী কৃষিকাজ করতেন। মেয়ে আশার জন্ম হওয়ার ২৩ দিনে মাথায় স্বামী হারান তিনি। শ্বশুরবাড়িতে আর ঠাঁয় হয়নি তার। মেয়েকে নিয়ে জীবন-সংগ্রামে নেমে পড়েন। পুনরায় বিয়ের কথা টিন্তাও করেন নি চেনু। তিনি বলেন,‘ও আর করতে হয় না, বিয়ে করলে মেয়ের কি হত?’
সাহেববাজার আরডিএ মার্কেটের দক্ষিণে সবজিপট্টিতে ভাত বিক্রির কাজ শুরু করলেন। ৩০০ টাকা ভাড়ায় টিনের ছাউনির দোকানটিতে রান্না ভাত, মাছ, তরকারি বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু জায়গাটিতে পাকাঘর তৈরি, এবং ছোট দোকান ভাড়া বেশি হওয়ায় ব্যবসা বন্ধ করতে হয়।
পাকা কলা বিক্রির কথা ভাবলেন তিনি। ঢাকিতে কলা নিয়ে বসলে কোনো দোকানভাড়া লাগবে না। শুরু হলো কলা বিক্রির পালা। আড়ত থেকে কলা কিনে সবজিপট্টিতেই বিক্রি। এখনো চলছে কলা বিক্রি করে জীবিকা। সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দেখা মিলবে চিনুকে- বলা নিয়ে বসে আছেন। তার কাছে চিনিচম্পা, সাগর কলা, শফরি কলা পাওয়া যায়।
চিনু জানালেন, শীতে বিক্রি কম হলেও গ্রীষ্মকালে দৈনিক ৮০০-৯০০টাকার কলা বিক্রি হয়। কলা বিক্রি করে জীবিকা আর কতদিন? চিনু বলেন, ‘যতকাল আমি না মরব, ততকাল আমাকে করে খেতে হবে।’ বলেই চিনু আবেগময় হলেন। বলে চললেন, ‘মেয়ে আশাকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়ের ৪ ছেলে, ১ মেয়ে হওয়ার পর স্বামীটা মারা গেল।’ চিনু জানালেন, এখন আশা ছেলে আশরাফুল, শরিফুল, শফিকুল, রবিউল আর মেয়ে হাসি তার কাছেই থাকে। তালাইমারিতে দেড় কাঠা মাটির উপর ৩ রুমের কাঁচাবাড়ি করেছেন তিনি। নাতি-নাতনি, মেয়ে নিয়েই তার সংসার। বাড়ির কাজ, রান্না, হাঁস মুরগি, ছাগল দেখাশোনা মেয়ে আশাই করে। নাতিদের লেখাপড়ার খরচ চেনুই চালায়। তারা এখন পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম আর একজন ম্যাধ্যমিকে পড়ছে।
নাতনি হাসিকে বিয়ে দিয়েছিলেন। তার গর্ভে ৭ মাসের শিশু থাকা অবস্থায় স্বামী ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। এখন সেও চেনুর কাছে থাকে। নাতনিকে শ্বশুর বাসায় রাখেন নি কেন? চিনুর ঝটপট উত্তর ‘ আদরের নাতনিকে শ্বাশুড়ির লাথি-ঝাঁটা খেতে কেন রাখব?’
নাতি নাতনিদের অনেক ভালোবাসেন তিনি। তারা যা আবদার করে তা পূরণের চেষ্টা করেন। জাহাজঘাটে ২ কাঠা জমি কিনেছেন চেনু। সেই জমিতে নাতিদের ওয়াল্ডিঙের দোকান করে দিবেন বলে জানান তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ