যে ১১ রোগ ছোঁয়াচে নয়

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৯, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


অনেকে মনে করেন, সংক্রামক রোগগুলো (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব দ্বারা সৃষ্ট রোগ) ছোঁয়াচে বা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। কিন্তু আপনার জন্য খুশির সংবাদ হচ্ছে, সকল সংক্রামক রোগ কিন্তু ছোঁয়াচে নয়। আবার কিছু কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার উপসর্গ দেখে মনে আশঙ্কা জাগে যে এটি ছোঁয়াচে, কিন্তু জেনে রাখুন যে এ বিষয়ে আপনার অনেক ধারণাই অমূলক হতে পারে।
কোন স্বাস্থ্য সমস্যা বা রোগগুলো একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না তা সম্পর্কে জ্ঞান রাখলে অহেতুক ভয় থেকে মুক্ত থাকা যায়। তবে এটা ঠিক যে ঝুঁকিমুক্ত থাকতে যেকোনো রোগ বা স্বাস্থ্য সমস্যায় সচেতন থাকা উচিত। এ প্রতিবেদনে ছোঁয়াচে নয় এমন ১১ স্বাস্থ্য বিষয় আলোচনা করা হলো।
* নিউমোনিয়া : এই ফুসফুস ইনফেকশনটি ছোঁয়াচে কিনা তা নির্ভর করছে কি কারণে এটি হয়েছে তার ওপর। দুই ধরনের নিউমোনিয়া মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে না, যথা- ফাঙ্গাল নিউমোনিয়া ও অ্যাস্পাইরেশন নিউমোনিয়া। লোকজন পরিবেশ থেকে ফাঙ্গাল নিউমোনিয়ায় সংক্রমিত হতে পারে এবং শ্বাসগ্রহণের সময় খাবার বা তরল ফুসফুসে চলে গেলে অ্যাস্পাইরেশন নিউমোনিয়া হয়। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাল নিউমোনিয়া ছোঁয়াচে, কিন্তু আপনি যেভাবে চিন্তা করছেন সেভাবে নয়, আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে। জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির সিনিয়র স্কলার ও সংক্রামক রোগের চিকিৎসক আমেশ অ্যাডালজা বলেন, ‘ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাল নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী অণুজীবগুলো মানুষ থেকে মানুষেতে ছড়াতে পারে, কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে না। কিছু ব্যাকটেরিয়া নাসিকাপথে বসতি গড়তে পারে, যেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জা (যা নিউমোনিয়া সৃষ্টি করতে পারে) অন্য লোকের মধ্যে ব্রংকাইটিসের কারণ হতে পারে।’
* লেজিওনিয়ার্স রোগ : সবসময় সংক্রমিত মানুষ বা প্রাণী থেকে এ রোগের প্রাদুর্ভাব হয় না। লেজিওনিয়ার্স রোগের জন্য দায়ী হচ্ছে দূষিত পানি: এ রোগ একমাত্র তখনই ছড়ায় যখন কোনো ব্যক্তি শ্বাসগ্রহণের সময় লেজিওনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া আছে এমন কুয়াশা বা পানির ফোঁটা গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস ফর হেলথ অনুযায়ী, পানির কল, শাওয়ার, ঘূর্ণিজল ও বড় বড় অট্টালিকার ভেন্টিলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে। এ বিরল নিউমোনিয়া তীব্র ও প্রাণনাশক হতে পারে, কিন্তু এ ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসা প্রত্যেকেই এতে সংক্রমিত হয় না। বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা লোকেরা এ রোগে সহজে আক্রান্ত হতে পারে, যেমন- পঞ্চান্নোর্ধ্ব লোক, দুর্বল ইমিউন সিস্টেম অথবা ক্রনিক রোগের রোগী।
* সোরিয়াসিস : সোরিয়াসিস হলো ত্বকের একটি প্রদাহজনিত রোগ, যা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা হয় না। ডা. অ্যাডালজা বলেন, ‘সোরিয়াসিস হলো একটি অটোইমিউন দশা যেখানে ইমিউন সিস্টেম ত্বককে আক্রমণ করে। এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে এমন কোনো অণুজীব দ্বারা সৃষ্টি হয় না।’ সোরিয়াসিসের লক্ষণ হলো, ত্বকের ওপর লাল ও চুলকানিযুক্ত ছোপ যেখানে সাদা বা রূপালি আঁশ থাকে- এটি কনুই, হাঁটু ও মাথার ত্বকে সবচয়ে বেশি কমন। শরীর খুব দ্রুত নতুন কোষ উৎপাদন ও জমা করলে সোরিয়াসিস হয়ে থাকে।
* কানের ইনফেকশন : সাধারণত কানের ইনফেকশন সংক্রামক নয়। কানের ইনফেকশনের সবচেয়ে কমন কারণ হলো ঠান্ডার ভাইরাস। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ম্যাথু মিন্টজ বলেন, ‘ঠান্ডা দ্বারা সৃষ্ট কনজেশনের কারণে অন্তঃকর্ণ তরলে ভরে যায় এবং পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে- এসবকিছু কানের ভেতর অবস্থান করে বলে ছড়াতে পারে না। কিন্তু যেহেতু কানের এ ইনফেকশন ঠান্ডা দিয়ে শুরু হয়, তাই রোগীর ঠান্ডার উপসর্গ বিদ্যমান থাকলে তা ছোঁয়াচে হতে পারে।’ সকল বয়সের লোকদের কানের ইনফেকশন হতে পারে, কিন্তু সাধারণত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে।
* রোজেশিয়া : রোজেশিয়া নামক ত্বকের দশাটি ছোঁয়াচে নয়। এ দশায় মুখম-ল লাল হয়ে যায়, অর্থাৎ রক্তনালী দৃশ্যমান হয়ে পড়ে এবং কখনো কখনো পুঁজে পূর্ণ বাম্প ওঠতে পারে। বিরলক্ষেত্রে রোসেশিয়া নাকের ওপরের ত্বককে পুরু করতে পারে। কেন রোসেশিয়া হয় তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন। কিন্তু তাদের তত্ত্বমতে এ দশার কারণ হতে পারে বংশগত, মুখম-লে অস্বাভাবিক রক্তনালি অথবা এমনকি আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়া এইচ. পাইলরির অবদান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রোসেশিয়া সোসাইটির মতে, রোসেশিয়া চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হতে পারে- একারণে যে তারা প্রদাহ উপশম করে, একারণে নয় যে তারা ব্যাকটেরিয়া হত্যা করে।
* ব্রংকাইটিস : নিউমোনিয়ার মতো ব্রংকাইটিসের কিছু ধরন ছোঁয়াচে, আবার কিছু ধরন ছোঁয়াচে নয়: এটি নির্ভর করছে শ্বাসনালির বায়ুপথের প্রদাহ কি দ্বারা হচ্ছে এবং কোন ধরনের উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে, যেমন- কাশি, হুইজিং বা হুইসেলের মতো শব্দ বা বাঁশির মতো শব্দ ও সাধারণ শ্বাসকষ্ট। অ্যাকিউট ব্রংকাইটিসের উৎপত্তি সাধারণত আপার রেসপিরেটরি ইনফেকশন থেকে, যা সাধারণত ভাইরাস দ্বারা সৃষ্টি হয় এবং এটি ছোঁয়াচে। শতশত ভাইরাস ও কিছু ব্যাকটেরিয়া ব্রংকাইটিসের কারণ হতে পারে এবং এসব জীবাণু আপনার চোখ, নাক অথবা মুখের মাধ্যমে শৈষ্মিক ঝিল্লীতে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে ক্রনিক ব্রংকাইটিস ছোঁয়াচে নয়- এই দীর্ঘস্থায়ী দশাটি সাধারণত দীর্ঘসময় ধরে ধূমপান করলে অথবা পরিবেশ দূষণকারী পদার্থের সংস্পর্শে আসলে হয়ে থাকে।
* লাইম রোগ : যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের মতে, লাইম রোগ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় এমন কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু সংক্রমিত এঁটেল পোকা মানুষকে কামড়িয়ে রক্ত খেলে লাইম রোগের ব্যাকটেরিয়া বোরেলিয়া বার্গডরফেরি ছড়ায়। মানুষে মানুষে সাধারণ স্পর্শ, চুম্বন অথবা এমনকি যৌনমিলনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া-ভিত্তিক এই রোগ ছড়ায় না। পোষা প্রাণীও আপনাকে সংক্রমিত করতে পারবে না, কিন্তু তারা আপনার ঘরে এঁটেল পোকা বহন করে আনতে পারে। জ্বর, ক্লান্তি ও সংক্রমিত স্থানে ষাঁড়ের চোখের মতো র‌্যাশ হলো লাইম রোগের প্রাথমিক উপসর্গ- পরবর্তীতে তীব্র জয়েন্ট ব্যথা, অসহনীয় মাথাব্যথা, হাত বা পায়ে ঝিনঝিনে অনুভূতি এবং মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুতে প্রদাহ হতে পারে।
* ম্যালেরিয়া : এই মারাত্মক সংক্রামক রোগটি ছোঁয়াচে নয়, যার মানে হলো এটি মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে না। মশা কামড়ালে ম্যালেরিয়া হতে পারে- যখন তারা কামড়ায়, তখন তারা মানুষের রক্তপ্রবাহে ম্যালেরিয়ার পরজীবী ছড়িয়ে দেয়। উপসর্গ হিসেবে আপনার জ্বর, ফ্লু’র মতো উপসর্গ, পরিপাকতান্ত্রিক সমস্যা ও জন্ডিস দেখা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সতর্ক করছে যে, ম্যালেরিয়া লোহিত রক্তকণিকাকে সংক্রমিত করে বলে রক্ত সঞ্চালন বা সংক্রমিত নিডল শেয়ারের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে। এছাড়া ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর গর্ভস্থ বাচ্চার মারাত্মক ক্ষতিসাধন হতে পারে।

* মূত্রতন্ত্রের ইনফেকশন : প্রায়ক্ষেত্রে যৌনমিলনের পর মূত্রতন্ত্রের ইনফেকশন হয়ে থাকে, কিন্তু এটি যৌনবাহিত বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। সাধারণত পায়ু থেকে মূত্রনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলে এ রোগ হয়ে থাকে। ডা. মিন্টজ বলেন, ‘যৌনসহবাস মূত্রতন্ত্রের ইনফেকশনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করলেও এক সঙ্গী থেকে অন্য সঙ্গীতে এ রোগ ছড়ায় না। এ রোগটি শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, যেমন- পায়ু স্পর্শের পর মূত্রনালি স্পর্শ করলে।’ পুরুষদের তুলনায় নারীদের মূত্রতন্ত্রের ইনফেকশন বেশি হয়, কারণ নারীদের পায়ু ও মূত্রনালির মধ্যে নৈকট্যতা বেশি।
* লকজ : লকজ হলো টিটেনাসের নন-মেডিক্যাল টার্ম। এ দশায় তীব্র মাসল স্প্যাজম বা মাংসপেশির অনৈচ্ছিক সংকোচন হয় এবং চোয়াল তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে মুখ খোলা কিংবা কোনোকিছু গেলা কঠিন হয়ে পড়ে। এ রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের মাটি অথবা অন্যান্য পৃষ্ঠের ওপর বসবাস করে এবং ছেঁড়া ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইনফেকশাস ডিজিজের প্রতিবেদন অনুসারে। সাধারণত ধাতব বস্তুতে ত্বক কেটে গেলে এ ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি, কিন্তু ধূলো-ময়লা অথবা এ রোগের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে এমন অন্যান্য বস্তুতে কেটে গেলেও টিটেনাস হতে পারে। এছাড়া ক্ষতস্থান বা পোড়া ত্বকে ধূলো, মরীচিকা বা মল লাগলেও এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি ১০ বছরে টিটেনাসের টিকা নিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
* সেলুলাইটিস : সেলুলাইটিসকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হয়, কারণ এটি জীবননাশক ব্যাক্টারেমিয়া (রক্তে ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি) ও এন্ডোকার্ডাইটিস বা এন্ডোকার্ডিয়ামের ইনফেকশন সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু এ রোগটি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না- এর কারণ হলো এই ব্যাক্টেরিয়াটি ত্বকের ওপরই থাকে এবং প্রায়ক্ষেত্রে নিরীহ। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে দুটি কমন কারণ হলো এ স্ট্রেপ্টোকক্কাসিয়া এবং এস অরিয়াস, কিন্তু ছেঁড়া ত্বকের মাধ্যমে এসব ব্যাকটেরিয়া গভীরে প্রবেশ করলে দুশ্চিন্তার বিষয়। ডা. মিন্টজ বলেন, ‘ত্বকে কোনো ড্যামেজ থাকলে (যেমন- কোথাও কেটে সৃষ্ট ক্ষত, সাম্প্রতিক সার্জারি অথবা এমনকি অ্যাথলেটি’স ফুট) ব্যাক্টেরিয়া প্রবেশ করে ত্বকের গভীরতম স্তরকে আক্রমণ করতে পারে- এর ফলে ব্যথা, লালতা, ফোলা ও তরলপূর্ণ ফোস্কা হতে পারে। ডা. মিন্টজ বলেন, ‘এ রোগ ছড়ানো প্রতিরোধের জন্য সাধারণত কোনো সতর্কতা মেনে চলার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু পুঁজ বা ক্ষরিত তরলের (যা সাধারণত সেলুলাইটিসের ক্ষেত্রে দেখা যায় না) মাধ্যমে ইনফেকশন ছড়াতে পারে।’ তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট