রমজানে সংযম শিক্ষা

আপডেট: মে ২২, ২০১৯, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


রমজানকে বলা হয় সংযম শিক্ষার মাস। সংযম মানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। এখানে যাবতীয় অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাকে সংযম বুঝানো হচ্ছে। রমজানে এই সংযমের শিক্ষার অনুশীলন হয়। খাদ্য, পানি, স্ত্রী- সবই হালাল। কিন্তু দীর্ঘ একটি মাস একটি নির্দিষ্ট সময় এগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দেহ-মন এগুলো চাইলেও নিজেকে সংযত করতে হয়। আল্লাহ নিষেধ করেছেন। সবকিছুই আমার। তারপরও অনুমতি নেই, তাই নিজেকে সংযত করতে হয়। তাহলে যেগুলো আমার নয়, কিংবা যেগুলো স্পষ্টই হারাম- সেগুলো থেকে কী পরিমাণ সংযত থাকা উচিত?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসকে সবরের মাস বলেছেন। সবর বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি কেউ আমাকে গালি-গালাজ করল, কটু কথা বলল কিংবা কোনো আঘাত করল আর আমি প্রতিশোধ নিলাম না এতটুকুই সবর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবর এর চেয়ে অনেক ব্যাপক। সবরের প্রকৃত সংজ্ঞা হল- ইবাদত করতে মনে চায় না, জোর করে মনকে ইবাদতের উপর ধরে রাখা, মনকে চাপ দিয়ে ইবাদত করা এটাও সবর। এমনিভাবে গুনাহের দিকে মন ছুটে যেতে চায়, গুনাহ করতে মন চায়, এক্ষেত্রে গুনাহ থেকে বিরত থাকা, এটাও সবর। অতএব রমজান মাস সবরের মাস- এর অর্থ হল কেউ আমাকে মন্দ বললে আমি তাকে মন্দ বলতে পারব না। কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করতে চাইলে আমি ঝগড়া করতে পারব না। কেউ কটু কথা বললে প্রতিশোধ নিব না। ইবাদতের উপর অটল থাকব। এই ব্যাপক অর্থে রমজান মাসকে সবরের মাস বলা হয়েছে। অতএব গুনাহ থেকে বিরত থেকে সবর হবে, ইবাদতের উপর অটল থেকে সবর হবে, প্রতিশোধ না নিয়ে সবর হবে, তাহলে এই ব্যাপক সবরের বদলা হবে জান্নাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সবরের প্রতিদান হল জান্নাত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ। যতক্ষণ একে ফেড়ে ফেলা না হয়। ঢাল হওয়ার অর্থ হল, মানুষ যেভাবে ঢাল দ্বারা নিজেকে হেফাজত করে, ঠিক তেমনি রোজার দ্বারাও নিজের দুশমন অর্থাৎ শয়তান হতে আত্মরক্ষা করে। এক বর্ণনায় আছে, রোজা আল্লাহর আজাব হতে রক্ষার ঢাল। অপর বর্ণনায় আছে, রোজা জাহান্নাম হতে মুক্তির ঢাল। জনৈক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, রোজা কোন জিনিসের দ্বারা ফেড়ে যায়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মিথ্যা ও গিবতের দ্বারা। অপর হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অন্যায় কাজ পরিত্যাগ করলো না, তার (রোজা রেখে) খানাপিনা পরিত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই।
রমজানে সকল নাজায়েজ ও গুনাহর কাজ পরিত্যাগ করতে হবে। মিথ্যা বলা, সুদ খাওয়া, ঘুুষ খাওয়া, চুরি করা, দুর্নীতি করা ইত্যাদি সব অন্যায় কর্ম বর্জনের দীক্ষা লাভ করতে হবে মাহে রমজানে। পাশাপাশি কারো সাথে ঝগড়া করা, গালি-গালাজ করা ও গিবত করা থেকে দূরে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজা হচ্ছে ঢাল। যখন তোমাদের কেউ রোজা থাকে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং মূর্খের ন্যায় কাজ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা তার সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয় তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।
রোজার কাজা ও কাফ্ফারার মাসয়ালা
* একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা আদায় করাকে রোজার কাজা বলে। আর রোজার কাফ্ফারা হলো- কাজা রোজার সাথে আরও ৬০টি রোজা আদায় করা। এই ৬০টি রোজা একাধারে রাখতে হয়। মাঝখানে ছুটে গেলে পুনরায় পূর্ণ ৬০টি রোজা একাধারে রাখতে হয়। এক রমজানের একাধিক রোজার কাফ্ফারা একটাই আদায় করতে হয়। * কাফ্ফারা বাবত বিরতিহীনভাবে ৬০দিন রোজা রাখার সামর্থ না থাকলে পূর্ণ খোরাক খেতে পারে এমন ৬০ জন মিসকিনকে অথবা একজনকে ৬০দিন দু’বেলা পরিতৃপ্তির সাথে খাওয়াতে হবে।
আল্লাহ আমাদের রমজানে প্রকৃত আত্মশুদ্ধি অর্জনের তাওফিক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ