রাজনীতির সেকাল এবং একাল

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৮, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন


স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শুভযাত্রা হলেও কিছুদেনের মধ্যেই গণতন্ত্রের ভীত নড়বড়ে হতে থাকে। তখন গণতন্ত্র ভাল চলছিল না! যদিও বঙ্গবন্ধু সরকার, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে প্রায় ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিকভাবেই দেশ ও সরকার পরিচালনা করতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশে কোনো অর্থকড়ি ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। দক্ষ প্রশাসন ছিল না।আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত বাহিনি ছিল না। ওষুধ নাই। চিকিৎসা নাই। শিক্ষাসহ চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের দোরগোড়ায়। ট্রাক নাই, বাস নাই, রেলের দৈনদশা। গুদামে খাবার নাই- অথচ প্রায় সাত কোটি মানুষের মুখে খাবার দিতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে উল্ল্যখ্য- বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দিল্লি থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকার আকাশ থেকে তেজগাঁ বিমানবন্দরে নামার আগমুহূর্তে নিচে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং কোটি মানুষের ঢল দেখে চমকে ওঠে স্বগত উচ্চারণ করেন ‘আমি আমার এই মানুষগুলিকে কোত্থেকে খাবার এনে দিব! আমার মানুষকে কেমন করে বাঁচাবো।’ বঙ্গবন্ধুর এই স্বগত উচ্চারণ পরবর্তী সময়ে তাঁর সহযাত্রী প্রয়াত পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরীর মুখে বিভিন্ন সময়ে আমরা শুনেছি। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা কত বড়মাপের হলে, এতদিন পরেও নিজের স্ত্রী-পুত্রসন্তানদের কথা একটি বারের জন্য না ভেবে তাঁর ভুখানাঙ্গা মানুষের কথা প্রতিনিয়ত উচ্চারণ করেন! সদ্যস্বাধীন এই দেশে দিনে দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করল। একদিকে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলসামস বাহিনি। অন্যদিকে ‘পূর্ববাংলা স্বাধীন কর’ শ্লোগান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলে যে সিরাজ শিকদার বাহিনি অত্যাধুনিক চাইনিজ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, সেই বাহিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ল। এদের সাথে যুক্ত হল মুখোশধারী স্বাধীনতা বিরোধীদের একটি অংশ। অন্যদিকে নেতৃত্বের লড়াইয়ে আত্মকলহে লিপ্ত মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ল। আসম আব্দুর রব, কাজী আরেফ, হাসানুল হক ইনু, শাহজান সিরাজ গং এর নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জ্বালাময়ী বক্তব্য নিয়ে ‘জাসদ’ নামের একটি উগ্র রাজনৈতিক দলের জন্ম হল। ‘জাসদ’ বঙ্গবন্ধু সরকারের ঘোরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করল। জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ অলীক, মিথ্যা এবং বানোয়াট সব খবর প্রচার করতে লাগল। প্রায়শই গণকন্ঠের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে এমন বানোয়াট খবর পরিবেশন করা হত যা ‘চাঁদে সাইদির মুখ’ দেখা যাবার মত কাল্পনিক, বিভ্রান্তিকর এবং গণমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী খবর ছাড়া অন্যকিছু নয়! বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ বিরোধী, বঙ্গবন্ধু বিরোধী এবং স্বাধীনতা বিরোধীরা গোগ্রাসে এসব খবর গিলতে লাগলো আর কৌশলে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে সচেষ্ট হল! এসময় জাসদের ভেতর চিন এবং পাকিস্তানের প্ররোচনায় দ্রুতই স্বাধীনতাবিরোধী সশস্ত্র ক্যাডারদের অনুপ্রবেশ ঘটে। চিনের আদর্শপুষ্ট ভাসানি ন্যাপ ও তাদের ছাত্র ইউনিয়ন অজ্ঞাত কারণে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সিরাজ শিকদারের পূর্ব বাংলা কম্যুনিস্ট পার্টি, জাসদ, ভাসানি ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং পাকিস্তানের দালাল স্বাধীনতা বিরোধীদের সম্মিলিত অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা-ে সদ্যজাত দেশের নতুন সরকারকে অনেকটাই অস্থিতিশীল করে তোলে। পাটের গুদামে আগুন, খাদ্যবাহী নৌকা ডুবিয়ে দেয়া, রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা, ঘর-বাড়ি লুট, অগ্নিসংযোগ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক কর্মকা- বঙ্গবন্ধু সরকারকে দিশাহারা করে তোলে। দেখা যায় ঘুম-বিশ্রাম হারাম করে, শূন্যহাতে বঙ্গবন্ধু একদিকে যখন তাঁর মানুষকে বাঁচাবার জন্য খাবার সংগ্রহ করতে দিকবিদিক ছুটাছুটি করছেন। আর প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি এবং দেশকে গড়ে তুলতে কোদাল হাতে মাটি কাটছেন। সেইসাথে দিনরাত্রি অমানুষিক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন শুধু তাঁর মানুষের মাথাগুজার ঠায় আর মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেবার জন্য। অন্যদিকে দেশ ও সরকার বিরোধী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠি, স্বাধীনতা বিরোধী বর্ণচোরা জামাত এবং ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘের দেশদ্রোহীরা ধ্বংসপ্রায় সদ্য স্বাধীন দেশকে গভীর সঙ্কটের মধ্যে ঠেলে দিতে সচেষ্ট হল। ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ইসলামের বিরুদ্ধে চরম আঘাত বলে প্রচার করতে থাকে। এসময় জামাতনেতা গোলাম আযম সৌদি আরবের আর্থিক সহয়তায় লন্ডনে বসে ‘পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটি’ গঠন করে দেশের ভেতর অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা- পরিচালনায় অর্থ যোগান দিতে থাকে। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী মুজিবনগর সরকার পরিচালনায় একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি ছিল। এই উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের বাইরে অন্যতম সদস্য ছিলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, সভাপতি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ মোজাফফর) এবং কমরেড মনিসিং, সভাপতি, বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টি। উল্লেখ্য ন্যাপ (মোজাফফর) এবং কমরেড মণি সিং এর কম্যুনিস্ট পার্টি (এদের ছাত্র সংগঠনসহ) বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেন। মওলানা ভাসানি মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা কমটির চেয়ারম্যান ছিলেন সত্য কিন্তু চিন পাকিস্তানের পক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করায় ভাসানি ন্যাপ এবং তাদের ছাত্র সংগঠন দেশের ভেতরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞদের মতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলকে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণের আহ্বান না জানিয়ে একলা চল নীতি আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের বড় ভুল ছিল। কারণ আন্তর্জাতিক বলয়ে এইসব রাজনৈতিক দল এবং তার নেতৃত্বের প্রভাব ছিল খুবই প্রণিধানযোগ্য। তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র এবং কম্যুনিস্ট পার্টি কমরেড মনি সিংকে যেমন নেতা মানতেন, তেমনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকেও গণ্য করতেন, হিসাব করতেন। আর মওলানা ভাসানি তো গণচিনে রীতিমত মান্যবর ছিলেন। সমগ্র বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব এঁদের চিনতেন, জানতেন। কারণ এঁদের কেউ ‘প্রো মস্কো’ কেউ বা ‘প্রো পিকিং’ রাজনীতি করতেন। বিশেষজ্ঞদের মতে-
১। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এইসব আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দূরে ঠেলে দেয়া, বিশেষ করে যাদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করা সম্ভব হয়েছে তাদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা না করা ছিল স্বাধীনতাত্তোর আওয়ামীলীগ সরকারের মারাত্মক ভুল। ২। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ সহচর, সৎ, সাহসী, ত্যাগি এবং তীক্ষè প্রজ্ঞা সম্পন্ন একজন প-িত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দিন আহমদকে দুরভিসন্ধিমূলক ‘সরকার এবং বঙ্গবন্ধুর’ সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া ছিল এক আত্মঘাতী এবং অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত! ৩। জাসদের জন্ম ঠেকাতে না পারাও ছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জন্য আর এক বড় পরাজয় ।
৪। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে আলোচনা না করে পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনীর সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সামিল।
৫। সার্বিক বিস্ফোরোন্মুখ পরিস্থিতি সামাল দিতে (তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল) দেশ এবং জাতির কল্যাণে সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ ‘বাকশাল’ গঠন করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এই ব্যবস্থার পক্ষে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থান গ্রহণ না করা এবং গা-ছাড়া ভাব স্বাধীনতার শত্রুদের পরক্ষভাবে উৎসাহিত করে। আওয়ামীলীগ গৃহীত বিভিন্ন অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে দৃশ্যত বহুধাবিভক্ত এবং দুর্বল করে ফেলে। বিভ্রান্ত এবং দিশাহারা সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। নির্বাক হয়ে যায়। আর এই সুযোগে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এবং পাকিস্তানি দালাল চক্র ঝোঁপ বুঝে কোপ মারে! জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। নির্বাক দিশেহারা মানুষ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে ! অবশেষে যা হবার তাই হয়। বিদেশি রাজনীতির ক্রীড়ানক, বিশ্বাসঘাতক খন্দকর মোস্তাকের হাত ঘুরে পাকিস্তানি এজেন্ট মুক্তিযুদ্ধের খলনায়ক জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করেন।
১৫ আগস্ট সংঘটিত হয় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হৃদয়বিদারক হত্যাকা-। সেদিন পাকিস্তান ফেরত নিষ্ঠুর দালাল বাহিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা প্রায় ৩০ জন নিস্পাপ নারী ও শিশুকে হত্যা করে। এক সাগর রক্ত ঝরে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন বেতার ও টিভিতে খুনি ফারুক ও রশিদ এই ঘটনার সাথে জেনারেল জিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা প্রচার করে। পরবর্তী সময়ে জেনারেল জিয়ার শাসনামলে জাপানি প্লেন হাইজ্যাক ঘটনাসহ প্রায় ২৩ টি পাল্টা ক্যু এর মত ঘটনা ঘটে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়া, সেনাবাহিনি, নৌবাহিনি এবং বিমানবাহিনির হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক, অফিসারকে সামরিক আইনের আওতায় নির্বিচারে হত্যা করেন। শেষ পর্যন্ত জিয়া নিজেও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই নিহত হন। জেনারেল জিয়ার শাসনামল ছিল হত্যা,ক্যু আর রক্তপাতের অন্ধকার আমল। মানুষের আহাজারি, চাপা কান্না আর আর্তনাদের আমল। এ সময় কত শত নারী পেটে সন্তান নিয়ে বিধবা হয়েছেন ইয়াত্তা নাই। কত মা তাঁর সন্তান হারিয়েছেন হিসাব নাই। এ সময় অনেক বন্দি নির্দোষ সিপাহী-কর্মকর্তাকে মৃত্যুআসন্ন জেনেও চিৎকার করে জেনারেল জিয়াকে অকথ্যভাষায় গালাগাল করতে আর অভিশাপ দিতে শুনা গেছে। অনেক, অনেক রক্তপাত হয়েছে ৭৫-৮১ সাল পর্যন্ত জেনারেল জিয়ার আমলে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে চলমান রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছোটবড় প্রায় সকল দলকে নিয়ে সরকার চালাচ্ছেন। ফলে স্বাধীনতা বিরোধীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। তবে অনেক পথভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এখনও স্বাধীনতা বিরোধীদের কাতারে দৃশ্যমান। ওদের সুমতি হলে দেশের উন্নতি ঠেকানোর শক্তি কারো নাই। তিনবার রাষ্ট্রের হাল ধরে হাসিনার হাত এখন অনেক পোক্ত, অনেক শক্ত। পোড় খেতে খেতে অনেক শিখেছেন। এসময়ের মধ্যে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়ানক গ্রেনেড হামলার মধ্যে পড়ে বেঁচে গেলেও মৃত্যুকে তিনি খুবই কাছ থেকে অবলোকন করেছেন এবং শত শত মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা তিনি চোখে দেখেছেন এবং হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন।
আজকে মির্জা ফখরুল গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু গণতন্ত্রের এই হাল করল কে? কারা? আগের কথা বাদই দিলাম, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত আপনারা কোন গণতন্ত্র চর্চা করেছিলেন? শাহ এসএমএস কিবরিয়ার মত অজাতশত্রু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদকে গ্রেনেড মেরে নির্মমভাবে হত্যা করলেন কেন? আওয়ামীলীগ করার জন্যইতো? আহসান উল্লাহ মাস্টারের মত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য আওয়ামীলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করলেন কেন? নাটোরের জনপ্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা এবং সাবেক সংসসদস্যকে গুলি করে মারলেন কেন? খুলনা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল আহাসানকে গুলিকরে হত্যা করলেন কেন? আপনারাই তো গোটা দেশকে মৃত্যুপুরিতে পরিণত করেছিলেন! কই আপনাদের কোন মন্ত্রী, এমপিকে তো আওয়ামীলীগ কর্মীরা গ্রেনেড মেরে কিম্বা গুলি করে হত্যা করেনি। শুনেছি জেলখানায় বন্দি অবস্থায় মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে তারেক রহমানের নির্দেশে জাতীয়তাবাদী ছাত্রনেতারা ফুটবল খেলেছিল! আপনাদের বন্দি করে এমন কিছু হয়নি তো? না না শেখ হাসিনার সরকার কোনদিনই এত নিচে নামতে পারেন না।
মানুষকে বোকা বানাবার জন্য আপনারা কথায় কথায় বলেন শেখ মুজিব বাকশাল করে গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন আর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া নাকি গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন! তো আপনারা সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করলেন না কেন? আপনারা বার বার যা করেছেন এরা এবার তা অনুকরণ করছে মাত্র। তার পরও বলব আওয়ামিীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ গ্রেনেড নিয়ে, বোমা নিয়ে খেলছে না। বরং সন্ত্রাসী দমন করছে।
পাঠক আসুন, তবে দেখি ২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি আমলের কিছু চিত্র স্মরণ করি- ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার’ রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে (প্রতিদিন গড়ে ১১ জন) মোট ৩৯২০ টি হত্যাকা-, ৫২০৭ টি নারী নির্যাতন, ১৫৫০ টি ধর্ষণ, ১৬৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ১৫ জন বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটে। এসময়ে ১৮৮ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। বিআইএইচআর- এর রিপোর্ট অনুযায়ী সিংহভাগ ঘটনা বিএনপি.-জামাত জোট ক্যাডাররা ঘটিয়েছে। এ সময় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, অজাতশত্রু আওয়ামীলীগ নেতা এমপি শাহ এসএমএস কিবরিয়া হত্যা, জনপ্রিয় নেতা আহাসান উল্লাহ মাস্টার এমপি.হত্যা, নাটোরের সাবেক এমপি মমতাজ উদ্দিন হত্যা, খুলনার আওয়ামীলীগ সভাপতি মঞ্জুরুল আহাসান হত্যা সহ আরও কতশত নেতাকর্মী হত্যা করেছে তার হিসাব করা কঠিন। ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত হাজার হাজার আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়। বিএনপি’র গু-ারা শহরে-গ্রামে-গঞ্জে অসংখ্য বাড়িঘর লুটপাট করে এবং গণডাকাতি করে হাজার হাজার পরিবারকে সর্বস্বান্ত করে। আর এ থেকেই শিক্ষা নিয়েই ভুক্তভোগী আওয়ামীলীগ কর্মীরা প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠবে তাতে সন্দেহ কী? তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বলব, অন্য রাজনৈতিক দলকে নসিহত করার আগে নিজেরা গণতন্ত্র চর্চা করুন। গণতান্ত্রিক হোন। গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রতিহিংসা এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পরিত্যাগ করে সত্যি সত্যি দেশের কল্যাণের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, গণতন্ত্রের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করতে সচেষ্ট হোন। সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি সহনশীল হোন। তবেই রাজনীতি কল্যাণের হবে, মঙ্গলের হবে।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার