রাজশাহীর আইএইচটিতে ছাত্রীদের উপর হামলা, আহত পাঁচ || অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাশ-পরীক্ষা স্থগিত || ছাত্রলীগ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা

আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


আইএইচটিতে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের ধস্তাধস্তি(বামে) আহত ছাত্রীদের হাসপাতালে দেখতে যান নগর আ’লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন-সোনার দেশ

রাজশাহী ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএইচটি) ছাত্রীদের উপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এতে কমপক্ষে পাঁচ ছাত্রী আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার সকাল ১০টার দিকে যৌন হয়রানি ও উত্যক্তের প্রতিবাদে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে লিখিত প্রতিবাদ করায় ছাত্রীদের উপর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
ওদিকে এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাশ ও পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ। দুপুর একটার মধ্যে ছাত্রদের এবং বিকেল ৩টার মধ্যে ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আহত পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন, আইএইচটির ফার্মেসি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজনিন নাহার, রেডিওথেরাপি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী রুকাইয়া ও রেডিওলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহনা। অন্য দুই শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে : সকাল ১০টার দিকে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষের কাছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্যক্তকরণ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে যান। সেখানে উভয়পক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এসময় ছাত্রীদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। এসময় ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ শাখার সাধারণ সম্পাদক তুহিন ছাত্রীদের ধর্ষণের হুমকি দেন। এক পর্যায়ে ছাত্রীদের ধাওয়া করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের ধাওয়ায় আতঙ্কিত ছাত্রীরা নিজেদের হোস্টেলে ঢোকার সময় গেটের সামনে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। এতে পাঁচ ছাত্রী আহত হন। এদের মধ্যে তিনজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের বক্তব্য : সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, গত ৩ ডিসেম্বর আইএইচটির শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সারাদেশে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করে আইএইচটির বিভিন্ন সংগঠন। এই দাবির সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে রাজশাহীতেও পালিত হয় মানববন্ধন কর্মসূচি। ছাত্রীদের বক্তব্য, ছাত্রলীগের কর্মীরা জিরোপয়েন্টে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে যেতে তাদের নিষেধ করে। অনেককে কর্মসূচিতে যেতে বাধা প্রদান করা হয়। ছাত্রলীগের বাধা সত্ত্বেও কিছু ছাত্রী মানববন্ধন কর্মসূচিতে যায়। এরই রেশ ধরে ওইসব ছাত্রীদের ধরে ধরে রাস্তাঘাটে অপমান ও লাঞ্ছনা করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এইসময় ছাত্রীদের হোস্টেলে উঠে তাদের রুমে গিয়ে ধর্ষণ করার কথাও বলা হয় বলে অভিযোগ করে ছাত্রীরা। এভাবে লাগাতার কয়েকদিন ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করছে বলে ছাত্রীদের অভিযোগ। এরই প্রতিবাদে তারা অধ্যক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে ছাত্রলীগের তুহিন ছাত্রীদের গণধর্ষণের হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তারা ছাত্রীদের উপর হামলা করে লাঞ্ছিত করে।
বেশ কয়েকজন ছাত্রী এই প্রতিবেদককে জানায়, ছাত্রলীগ আইএইচটি শাখার সভাপতি জাহিদুল, সাধারণ সম্পাদক তুহিন, সাজু, আকাশ ও আজমের নেতৃত্বে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, উত্যক্ত ও হুমকি দিয়ে আসছিল। আজ (বুধবার) তাদের নেতৃত্বেই এই হামলা হয়। ছাত্রীরা অভিযোগ করে ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক তুহিনের ছাত্রত্ব ২০১২ সালে শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তারা ছাত্রলীগের কমিটিতে থেকে এই হামলা চালায়।
ছাত্রলীগের বক্তব্য : ছাত্রলীগ জানিয়েছে, ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেল সুপার মোর্শেদা খাতুন ছাত্রীদের উস্কানি দিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ দেয়। এর প্রতিবাদ করে ছাত্রলীগ। এমন সময় ছাত্রলীগের চার কর্মী মিজানুর, ফয়সাল, ইমরান ও সাইমুম ছাত্রীদের মধ্যে থেকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের ধাওয়া করে। তারা ছাত্রী হোস্টেলে ঢোকার সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা তাকে ধরে মারধর করে। এসময় গেটে জড়ো হওয়া ছাত্রীরা ভয়ে-আতঙ্কে কিছুটা আহত হয়।
ছাত্রলীগের আইএইচটি শাখার সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জানান, ছাত্রলীগ ছাত্রীদের উপর কোনো হামলা করেনি। ছাত্রলীগের কয়েকজন হাইব্রিড কর্মী ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের ধাওয়া করলে ছাত্রীরা আহত হয়। তাদের উপর ছাত্রলীগের কোনো কর্মী হামলা চালায়নি। এছাড়া ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হোস্টেল সুপারের মদদপুষ্ট গুটিকয়েক ছাত্রী যৌন হয়রানির যে অভিযোগ এনেছে তা-ও সম্পূর্ণ অসত্য ও মিথ্যা। কারণ ছাত্রলীগ ওই ধরনের কাজ কখনো করতে পারে না। বরং হোস্টেল সুপার মোর্শেদা খাতুন ছাত্রীদের উস্কিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামিয়েছে। সাধারণ ছাত্রীরা এই বিষয়ে কিছুই জানে না।
হোস্টেল সুপার কেন ছাত্রীদের ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামাবে এই প্রশ্নের উত্তরে জাহিদুল বলেন, কারণ হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষের কাছে আমরা অভিযোগ এনেছি। তার চাকরি নিয়ে টানাটানি। তিনি বিএসসি ল্যাব মেডিসিন এ পড়া অবস্থায় হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব পালন করছেন। যা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। এছাড়া তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তিনি ছাত্রীদের রাত ১০টা, কখনো কখনো রাত ১২টা পর্যন্ত হোস্টেলে ঢোকার অনুমতি দেন। রাত সাতটার দিকে হোস্টেলে ঢোকার নিয়ম থাকলেও হোস্টেল সুপারের ছত্রছায়ায় ছাত্রীদের রাত ১২টায় হোস্টেলে ঢুকতে পারে। এতে আইএইচটির পরিবেশ নোংরা হচ্ছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতেরও ঘটনা আছে। এসময় তার চাকরিও চলে যায়। পরে টাকা ফেরত দিয়ে হোস্টেলের ছাত্রীদের হাত করে তিনি চাকরি ফিরে পান।
জাহিদুল ইসলাম আরো জানান, ইন্সটিটিউটের ল্যাব মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বেলালের সঙ্গে ওই বিভাগের এক ছাত্রীর পরকিয়ার সম্পর্ক। ওই শিক্ষক ছুটিতে গিয়েও এসে তার কার্যালয়ে বসে থেকে ছাত্রীর সঙ্গে গল্প করেন। অথচ কোনো ক্লাশ নেন না। ছাত্রলীগ এসবের প্রতিবাদ করলে ওই হোস্টেল সুপারের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে তার অনুসারী কিছু ছাত্রীদের নেতৃত্বে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে আজ এই পরিস্থিতি।
কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা : এদিকে আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে রাজশাহী মহানগর শাখা ছাত্রলীগ। সংগঠনের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বুধবার সকালের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর কারণে আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিনসহ আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মিজান ও ফায়সাল কে সংগঠন হতে বহিষ্কারের জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিকট সুপারিশ করা হয়েছে নগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে।
ইন্সটিটিউট কর্তপক্ষের বক্তব্য : ইন্সটিটিউটে উদ্ভূত এই পরিস্থিতির আধা ঘণ্টার মধ্যেই ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ইন্সটিটিউট বন্ধ ঘোষণা করে এবং বেলা একটার মধ্যে ছাত্রদের ও বিকেল ৩টার মধ্যে ছাত্রীদের হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ দেয়।
রাজশাহী ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অধ্যক্ষ ডা. সিরাজুল ইসলাম ইন্সটিউটিউটের উদ্ভূত এই পরিস্থিতিকে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, উদ্ভূত এই পরিস্থিতি তাদের নিজেদের ব্যাপার। নিরাপত্তাজনিত সঙ্কটের কথা ভেবে ইন্সটিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল পর্যন্ত কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, সারাদিন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত ছিলাম। হোস্টেল ফাঁকা করা এবং পরবর্তীতে যাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখছিলাম। এসব করতেই সারাদিন পার হয়েছে গেছে। কাল (বৃহস্পতিবার) একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভায় এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্য : এ বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। আটকও হয়নি কেউ। তবে পুলিশ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ইন্সটিটিউটে অবস্থান নিয়েছিল। পরবর্তীতে ইন্সটিটিউট থেকে পুলিশ সরিয়ে নেয়া হয়।
রাজপাড়া থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, কোনো মামলা হয়নি। আটকও কেউ নেই। পাঁচটা পর্যন্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। তারপর পুলিশ সরিয়ে নেয়া হয়। ইন্সটিটিউটের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ