রাজশাহীর তিন ইউএনও নম্বর ১০ বার ক্লোন ||তিন বছরেও সনাক্ত হয়নি অপরাধী

আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০১৯, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল আশিক


রাজশাহীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুঠোফোনের নম্বর ক্লোনের ঘটনা বারবার ঘটলেও এর সাথে জড়িতদের সনাক্ত করা সম্ভব হয় নি। পুলিশ বলছে, নম্বরগুলোর বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন ঠিক নেই, ‘নম্বরগুলো ফেক’। একজনের নামে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন কিন্তু ব্যবহার করে অন্যজনে। ভুক্তভোগি ইউএনওগণ বলছেন, ‘ক্লোনকারীরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র।’ তবে ঘটনাগুলোতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্তই থেকে যাচ্ছে। তদন্তের খবর যানা যাচ্ছে না। তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় এ ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলছে। পুলিশের কাছে নেই সনাক্তের প্রযুক্তি। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত দুই বছরে রাজশাহীর বাঘা, তানোর, পুঠিয়া মিলে ২০১৭-১৯ সাল পর্যন্ত ইউএনওদের মোবাইল নম্বর ক্লোন হয়েছে ১০ বারের বেশি। চলতি মাসের তিন দিনের ব্যবধানে পুঠিয়া ও বাঘা ইউএনওর মোবাইল নম্বর ক্লোন হওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিকার পেতে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে জিডি হয়েছে। কিন্তু কোনো ঘটনারই সুরাহা হয়নি। তবে নম্বর ক্লোন করে অপরাধীরা অনেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে টাকাÑ এমন অনেক অভিযোগ রয়েছে। চক্রটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ সরকারি কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ইউএনও নাম ভাঙ্গিয়ে টাকার দাবি করে আসছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজশাহীর পুঠিয়া ইউএনও মো. ওলিউজ্জামান নম্বরটি ক্লোন করা হয়। এসময় উপজেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের থেকে টাকা দাবি করা হয় ইউএনও’র নামে। পরে ওই ব্যক্তিরা ইউএনওকে জানিয়েছে বিষয়টি।
ইউএনও মো. ওলিউজ্জামান জানান, ‘এঘটনায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সচেতনতামূলক মেসেজ দিয়েছেন। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এর আগে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর পুঠিয়ায় ইউএনও আবদুল্লাহ আল মাহমুদের সরকারি মোবাইল নাম্বার ক্লোন করে উপজেলার দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে ইউএনও’র পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়। তবে বিষয়টি বুঝতে পেরে স্কুল প্রধানরা ইউএনওকে জানালে তিনি পুঠিয়া থানার জিডি করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটি পুঠিয়া পিএন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বেলপুকুর উচ্চ বিদ্যালয়। এর আগে ২০১৭ সালের ৮ জুলাই তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলীর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে একই উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুই পৌর মেয়রের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। এবিষয়ে তানোর থানায় জিডি করা হয়। ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তানোরের ইউএনও ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট চৌধুরী গোলাম রাব্বীর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ক্লোন করার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে ২০১৭ সালের ৭ জুন ও ১৯ নভেম্বর দু’দফায় তৎকালীন তানোরের ইউএনও ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মুহা. শওকাত আলী এবং ২০১৮ সালের গত ৮ জুন তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুলাহ আল মামুনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ক্লোন করে প্রতারক চক্র। তখনও বরাদ্দসহ বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেয়ার নামে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের কাছে অর্থ দাবি করা হয়। একই বছরের ৩১ আগস্ট বাঘার ইউএনও সরকারি মুঠোফোন নম্বর ক্লোন করে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। এবিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়রি করা হয়। আর চলতি বছরের ২০ আগস্ট বাঘায় ইউএনও শাহিন রেজার সরকারি মুঠোফোন ক্লোন করে নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের থেকে চাঁদা দাবি করা হয়। এবিষয়ে বাঘা থানায় জিডি করা হয়। বেশ কিছুদিন আগে ক্লোন হওয়া ইউএনও শাহিন রেজার নম্বর ক্লোন করে বাঘার নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যাললের প্রধান শিক্ষক পাপিয়া সুলতানা জানান হয়, ‘আপনার প্রতিষ্ঠানে ল্যপটপ বরাদ্দ হয়েছে। কিছু টাকার দরকার।’
বাঘায় ইউএনও শাহিন রেজা বলেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সমন্ত ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। সবাইকে সচেতন করা হয়েছে। তদন্তের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) কাছে অভিযোগ করা হলেও অগ্রগতি নেই। ওসিদের কাছে এই ধরনের অপরাধীদের সনাক্তের প্রযুক্তি নেই। তারাও চেষ্টা করছেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।’
এবিষয়ে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, যে মোবাইল সিমগুলো থেকে কর্মকর্তাদের নম্বর ক্লোন করা হয়েছে সেগুলোর বায়োমেট্রিক রেজিস্টেশনগুলো ঠিক ব্যক্তির নয়। একজন ব্যবহার করছে অন্যজনের বায়োমেট্রিক রেজিস্টেশন। তিনি বলেন, এই ধরনের অপরাধগুলো যারা তদন্ত করে তাদের জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে মোবাইলের সিম কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, মোবাইল নম্বর ক্লোনের বিষয়ে বাঘার ইউএনও-এর একটা অভিযোগ শুনেছেন। এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলা হয়। এছাড়া ইউএনওদের বলে দেয়া হয়েছে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ