রাজশাহীর বাজারে আলুর দাম বাড়ায় কৃষকের স্বস্তি

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৯, ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

শরিফুল ইসলাম


রাজশাহীতে আলুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিদের মুখে স্বস্তির হাসি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাস আলুর দাম না থাকায় চাষিরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কয়েক দিন থেকে আলুর দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বর্তমানে আলুর দাম পাইকারি বাজারে ১৩ টাকা থেকে ১৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে কৃষকদের অনেকেই দেনা পরিশোধের জন্য আগেই আলু বিক্রি করেছেন। এই মুহূর্তে যাদের আলুর মজুদ আছে দাম বৃদ্ধিতে তারাসহ ব্যবসায়ী ও পাইকাররা লাভবান হচ্ছে। আর মাত্র ২ মাস পরে রাজশাহীর হিমাগারগুলো আলুশুন্য করা হবে- কারণ, অগ্রহায়ণ মাসে থেকে আলু চাষ শুরু হবে। কৃষক আলু চাষে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারে রাজশাহী জেলায় ৩২টি হিমাগারে প্রায় ৬২ লাখ বস্তা আলু সংরক্ষণ করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা। যার মধ্যে লোকসান গুনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ বস্তা। বর্তমানে এসব হিমাগারে আরো ৩২ লাখ বস্তা আলু রক্ষিত আছে (প্রতি বস্তায় নূন্যতম ৬০ কেজি)। হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৩ টাকার ওপরে। কয়েকদিন আগে কাঁচা আলু প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ১১ টাকা। এতে কেজিতে লোকসান গুনতে হয়েছে নূন্যতম আড়াই টাকা। আর প্রতিবস্তায় লোকসান হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা। হিমাগার খোলার চার মাসে বিক্রি হয়েছে রক্ষিত আলুর অর্ধেক। বর্তমানে আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আলু সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা তাদের আলু বিক্রি শুরু করেছেন। বর্তমানে প্রতিকেজি আলু ১৩ টাকা থেকে ১৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই দুই মাসেই হিমাগারে রক্ষিত আলু বিক্রি করতে হবে। নইলে আলু হিমাগারে পচতে থাকবে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০১৮-২০১৯ কৃষিবর্ষে আলুচাষ হয় ৩৮ হাজার ৯৭১ হেক্টর জমিতে।
আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ, তেমনি লোকসানও বেশি হয়ে থাকে। রাজশাহী জেলায় ধানের পরেই ব্যাপক ভাবে আলুর চাষ হয়ে থাকে। আলু রাজশাহীর অর্থকরি ফসল। এক বছর লাভ হলে পরের বছর লোকসান গুণতে হয়। লাভ-লোকসানের এই দোলাচলের মধ্যে দিয়েই আশায় বুকঁেবধে আলুর আবাদ করে চলেছেন চাষিরা। গেলো কয়েক বছর ধরেই আলুতে লোকসান গুনছেন রাজশাহী অঞ্চলের চাষি। তারপরও বরেন্দ্রখ্যাত এই অঞ্চলে আলুচাষের পরিধি ও উৎপাদন বেড়েছে। পরপর তিন বছর থেকে আলুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। ফলে বিভিন্ন হিমাগার থেকে নেয়া ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে।
পবা উপজেলার বায়া এলাকার আলুচাষী আবদুর রাজ্জাক বলেন, তিনি ৭০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। প্রতি কেজিতে প্রায় ৯ থেকে ১০ টাকা খরচ হয়। তা পর কোল্ড স্টোরে রাখতে প্রতি বস্তায় ২৫০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা খরচ। এছাড়াও তিনি কয়েক হাজার বস্তা আলু ক্রয় করে স্টোরে রেখেছেন। দাম না থাকায় তিনি আলু বিক্রি করেন নি। এখন কিছুটা দাম বাড়ায় লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে জানান।
জেলার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের নুড়িয়াক্ষেত্র এলাকার বাণিজ্যিক আলুচাষি মোবারক হোসেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে আলুচাষ করছেন তিনি। এবার ৫০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করে উৎপাদিত আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। মৌসুমের শুরুতেই তিনি আলু বিক্রি করে দেন। এতে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। মোহনপুর উপজেলার সফল আলু চাষি ও ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের এখনো হিমাগারে অবিক্রিত আলু রক্ষিত আছে প্রায় ১১ হাজার বস্তা। এই চাষি জানান, প্রতিবিঘায় আলু উৎপাদন হয় প্রায় ৪ টন। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত আলুচাষী জেলার পবা উপজেলার বড়গাছি এলাকার রহিমুদ্দিন সরকার বলেন, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহীতে আলুচাষের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাছাড়া উন্নত মানের আলুবীজ ব্যবহার করছেন চাষিরা। আর এতেই বাম্পার ফলন মিলছে। তবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের অভাবে আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। তাছাড়া আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিলেও লোকসান কমতো কৃষকের।
রাজশাহী জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ¦ আবু বাক্কার আলী জানিয়েছেন, মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ হয় হিমাগারে। জেলায় ৩২টা হিমাগারের প্রত্যেকটিতে গড়ে ১৫ হাজার টন করে প্রায় সোয়া ৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। বস্তা হিসেবে ধরলে প্রায় ৩২ লাখ বস্তা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, এই অঞ্চলের মাটি আলু চাষের উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আধুনিক চাষের কলাকৌশল নিয়ে কৃষকদের পাশে রয়েছেন সবসময়। আর ২ থেকে আড়াই মাস পরে কৃষকেরা আলু চাষে নেমে পড়বেন আমাদের উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা তাদের পাশে থেকে পরামর্শ দিবেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ