রাজশাহী অঞ্চলে দিঘি ও পুকুর খনন প্রকল্প মানুষ ও কৃষি উপকৃত হবে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯, ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে ৭১৫টি পুকুর ও ১০টি দিঘি খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের ৫ জেলার ৪৩টি উপজেলার তিন হাজার ৫৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দিতে এসব পুকুর খনন করা হবে। পুকুরে জমানো বৃষ্টির পানি উন্নয়নের মাধ্যমে জমিতে ক্ষুদ্র সেচ কাজে ব্যবহার করা হবে। একইসঙ্গে এসব পুকুরে মাছ চাষও করা যাবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) প্রস্তাবিত ‘পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচে ব্যবহার’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। যার পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া ও নাটোর জেলার ৪৩টি উপজেলায়। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। যা ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
অতীতে বরেন্দ্র ভূমির কৃষি ব্যবস্থা ছিল প্রকৃতিনির্ভর এবং সমন্বিত। কৃষক যুগ যুগ ধরে তার স্থানীয় পরিবেশের বৈশিষ্ট্যসমূহের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষি ব্যবস্থা অভিযোজিত করেছিল। বরেন্দ্রের আজকের কৃষি ব্যবস্থায় উঁচু-ঢালু জমিতে বৃক্ষাচ্ছাদিত বনাঞ্চল ছিল, আর ছিল গো-চারণের জন্য তৃণভূমি। জমি ও বাড়ির নিকটে ছিল দিঘি-পুকুর। মাছ চাষ ও সেচ কাজের পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হত বৃষ্টির পানি সঞ্চয় করে। বৃক্ষ, জ্বালানি সরবরাহ ছাড়াও উপত্যকার জমির খনিজ পুষ্টি, মাটির জৈববস্তু ও পশুখাদ্য প্রদান করতো এবং জমিকে খরা ও বায়ু প্রবাহ থেকে রক্ষা করতো। গবাদি পশু জমির জন্য জৈব সার যোগাত এবং শ্রমশক্তি প্রদান করতো। এভাবে কৃষক সমন্বিত এবং স্বল্প-ব্যয় ও স্বল্প-মূলধন নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা পরিচালনা করতো। তা ছাড়াও কৃষি ব্যবস্থা ছিল বহুমুখি ফসল, গবাদি পশু, বৃক্ষপালন ও মৎস্যপালন ইত্যাদি মিলে ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত। আবার এ অঞ্চলের ফসল ব্যবস্থাও ছিল বৈচিত্রময়। মূল ফসল আমন ধান ছাড়াও বিভিন্ন চৈতালী ফসল যেমন- মসুর, কলাই, ছোলা, খেসারি, যব, গম, ভূট্টা ছিল প্রধান। কিন্তু এই ব্যবস্থাকে ধরে রাখা যায় নি। যদি আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সংমিশ্রণে এই ব্যবস্থা বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে আরো অনেক বেশি উন্নত ও পরিবেশবান্ধব করতে পারতো। কিন্তু এই লোকজ জ্ঞান উপেক্ষিত হয়েছে এবং এর প্রভাব এ অঞ্চলের মানুষ ও ভূ-প্রকৃতির উপর পড়েছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক ধারাকেই ত্বরান্বিত করেছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূউপরিস্থ পানির উৎস সমূহ আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এলাকার মানুষ খাবার পানির উৎসের পাশাপাশি সেচ কাজেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার পাশাপাশি অনাবৃষ্টি ও নদীতে পানি কম থাকার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বছরের ৪ থেকে ৫ মাস (মার্চ- জুন) এ অঞ্চলের অধিকাংশ নলকূপ থেকে পানি উঠে না। এ সময়ে তিব্র পানি সঙ্কটে বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্থ হয়।
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ভারত বিভাগের পর বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় ৬৯ হাজার ৬৩টি পুকুর ছিল, এর ১৪ হাজারই খাস। কিন্তু বর্তমানে এসব পুকুরের অধিকাংশেরই এখন কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না। ফলে ভূপৃষ্ঠের পানি সঞ্চয়ের পরিমাণও আশংকাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। সেচ ও গৃহস্থালি জন্য ব্যবহৃত পানির প্রাপ্যতা এবং মাটির তলদেশে পানির অনুপ্রবেশ কমে গেছে। এই সমস্যা দূরীকরণের লক্ষে বরেন্দ্র অঞ্চলের খাড়ি ও পুকুর সমূহ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভ্পূরিস্থ পানির আধার সৃষ্টি করার দাবিটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছিল। সরকার দেরিতে হলেও পুকুর খননের উদ্যোগটি গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের মানুষ, কৃষি ও পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা এ অঞ্চলের জীববৈচ্রিত্রকেও সমৃদ্ধ করবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ