রাজশাহী অঞ্চলে শৈত্য প্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় ফসলের ক্ষতি কৃষি অধিদফতর বলছে, এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হয় নি

আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০১৮, ১:২১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বীজতলা নষ্ট হচ্ছে কৃষকদের অভিযোগ-সোনার দেশ

রাজশাহী অঞ্চলে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তা থেকেই টানা শৈত্য প্রবাহ ও ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। পড়ছে তীব্র শীত। এর ফলে এই অঞ্চলের ফসল ও শীতকালীন শাকসবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে কৃষি অধিদফতর বলছে, এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে উল্লেখ করার মতো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে এই আবহাওয়া কিছুদিন বিরাজ করলে ফসল ও শীতকালীন শাকসবজির ক্ষতি হবে।
তবে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি উপজেলায় শীতকালীন শাকসবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা। এছাড়া বোরো ধানের বীজতলা হলুদ হয়ে যাওয়া, আলুতে পচন রোগ ধরা, পানের পাতা ঝরে যাওয়া, মসুর, খেসারি ও আমের মুকুলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এখন পর্যন্ত এই ঘন কুয়াশা ও শৈত্য প্রবাহে ফসল ও শীতকালীন শাকসবজির ক্ষতি হয়নি। তবে এই অবস্থা কিছুদিন বিরাজ করলে ফসল ও শীতকালীন শাকসবজির ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এর মধ্যে বিশেষ করে শাকসবজির উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধির হ্রাস ঘটবে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া সূর্যের আলো ঠিকমত না পৌঁছার কারণে বোরো ধানের বীজতলা হলুদ হয়ে যাওয়া, ছোট বয়সের যেসব চারা রয়েছে সেগুলো সাদা হয়ে যেতে পারে। তবে আলু ও গমের জন্য আবহাওয়া সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
পানের বরজের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, সাধারণত শীতকালে পানের বরজের ক্ষতি হয়। তবে এই বছর পানের বরজেরও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ এবছর প্রথম থেকেই কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো যাতে বরজের উত্তরের দিকটা মজবুতভাবে ঘন করে বেড়া দেয়া হয়। এছাড়া বেড়ার ছাদও মজবুত করে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো। আমের মুকুলের বিষয়ে জানানো হয়েছে, আগাম কিছুটা মুকুল এলেও তাতে কোনো ক্ষতির আশংকা নেই। তবে মুকুল ফোটার সময় এই আবহাওয়া বিরাজ করলে ছত্রাকের আক্রমণ হওয়ার আশংকা আছে। এছাড়া মসুর ও খেসারির উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মোজদার হোসেন জানান, এবছর শীতের শুরু থেকেই কৃষকদের সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এইজন্য নিয়মিতভাবে মাঠে আমাদের প্রতিনিধিরা কাজ করেছেন। তাই এখন পর্যন্ত শীত ও ঘন কুয়াশায় ফসল ও শাকসবজির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে এই আবহাওয়া আরো কিছুদিন বিরাজ করলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গোদাগাড়ীতে তীব্র শীতে বোরো ধানের বীজতলাসহ শাকসবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষকেরা জানান, অধিকাংশই চারা হলুদ রং ধারণ করে মারা যাচ্ছে। আর আলুর ক্ষতি হচ্ছে বলেও কৃষকেরা জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ বলেন, সকাল বেলায় বোরো ধানের বীজতলার পানি বের করে দিতে হবে। তাহলে বীজতলা ভাল থাকবে। কুয়াশা থেকে রক্ষার জন্য রাতের বেলায় বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনে কীটনাশক, স্প্রেসহ বীজতলা সুরক্ষার জন্য কৃষকদেরকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো ধানের বীজতলা রয়েছে ৭৮৫ হেক্টর, আলু এক হাজার ৭৮৫ হেক্টর ও শীতকালিন শাকসবজি রয়েছে ৮০০ হেক্টর।
বাঘা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বাঘায় শৈত্য প্রবাহের কারণে খেতের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে শীতকালীন সবজি, পেঁয়ারা ও কুল। ফলে চাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলায় বেগুন, ফুলকপি, পাতাকপি, পালংশাক, লালশাক, কলমি শাক, মুলা, পেঁয়াজ, মরিচসহ শাকসবজি ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে।
সবজি চাষি আলম হোসেন এ বছর ৩৩ শতক জমিতে ফুলকপি চাষ করেছেন। তিনি জানান, কয়েক দিন থেকে রোদের মুখ দেখা যায়নি। এর পাশাপাশি ঘনকুয়াশার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্প্রে করেও ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে উপজেলা কৃষি অফিস কুয়াশা ঠেকানোর জন্য পলিথিন ও দড়ি টানিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এগুলো করে কাজ হচ্ছে না বলে জানান সবজি চাষি পচু সরকার, পিন্টু মিয়া, মজিবর রহমান, আকরাম হোসেনসহ একাধিক চাষি। আড়ানী পৌর এলাকার পেঁয়ারা চাষি অধ্যাপক কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, ঠান্ডা ও ঘনকুয়াশায় পাঁচ বিঘা জমির পেঁয়ারা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা।
মোহনপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মোহনপুরে তীব্র শীতে ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের বীজতলা। ঘনকুয়াশা ও তীব্র শাতের প্রভাবে আগাম জাতের ধানের চারা হলুদ হয়ে গোড়া পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দুই সপ্তা আগে বপন করা ধানের কোনো চারা গজায় নি। কুয়াশা থেকে ফসল রক্ষায় কৃষিবিদদের পরামর্শে পলিথিন দিয়ে ঢেকে এবং চুলার ছাই ব্যবহার করেও সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। এতে আসন্ন বোরোচাষ নিয়ে শঙ্কিত তারা।
উপজেলার বেলনা গ্রামের কৃষক নওশাদ আলী জানান, শীতমৌসুমে প্রতিবছর বোরো ধানের চারা নষ্ট হলেও এবারে ক্ষতির মাত্রা অনেকটা বেশি। কুয়াশার চেয়ে ঠা-ায় চারাগাছের ক্ষতি বেশি হচ্ছে বলে ধারণা তার। এজন্য বীজতলা পলিথিনে ঢেকে দেয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার রহিমা খাতুন জানান, মোহনপুর ছোট আয়তনের উপজেলা হলেও এখানে সবধরনের ফসলের চাষাবাদ হলেও বোরো ধানের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার হেক্টর। শীতজনিত রোগে কিছু বীজতলায় রোগবালায় দেখা দিয়েছে তবে শীত কমলে দ্রƒত এসব বীজতলা সেরে যাবে বলে আশাবাদি তিনি। মাঠপর্যায়ে ঘুরে সাদা পলিথিনের মাধ্যমে কৃষকদের বীজতলা ঢেকে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও কৃষকদের মাঝে সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পর কৃষিবিভাগের রোগবালায় প্রতিরোধে যথেষ্ট নজরদারি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এছাড়া মোহনপুরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্য প্রবাহে পান বরজ থেকে ঝরে যাচ্ছে পান পাতা। এছাড়া পান পাতার কান্ডে পচন ধরেছে। এতে উপজেলার চাষিদের কোটি টাকার লোকসান গুণতে হচ্ছে। চাষিরা জানিয়েছেন, বরজ থেকে বাছাইকৃত পান ভেঙে গোছানোর পর দেখা দিচ্ছে কালো দাগ ও পচন রোগ। উপজেলার ধুরইল ইউনিয়নের মহ্ববতপুর গ্রামের পানচাষি দেলোয়ার হোসেন মন্টু জানান, তীব্র শীতে পান ঝরে যাচ্ছে। কোন কীটনাশক ব্যবহার করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। মোহনপুর গ্রামের আরেক পান চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, পান বরজ থেকে ভাল পান সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে এসে বাজারজাত করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ পানের ওপরে কালো দাগ ও ফোসকা পড়ে আছে।
তানোর প্রতিনিধি জানিয়েছে, তানোরে শীতের তীব্রতা ও ঘনকুয়াশার কারণে বোরো বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কুয়াশায় বোরো ধানের বীজতলা হলুদ ও লাল রং ধারণ করে পাতাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। বীজের পাতাগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে আর নতুন করে পাতা উৎপন্ন হচ্ছে না। ফলে বর্তমান মৌসুমে বোরো ধান রোপন নিয়ে চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। মোহনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক জানান, গত বছর ৩০ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপন করেছিলাম। এইবছরও সেই পরিমাণ জমিতে চারা রোপন করবো। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু জমি তৈরির শুরুতেই হোঁচট খেলাম। জিরা জাতের ১২০ কেজি বীজতলা তৈরি করেছিলাম। বীজও ভালো হয়েছিল। অথচ কয়েকদিনের টানা ঘনকুয়াশায় বীজগুলো হলুদ ও লাল রং হয়ে পাতা শুকিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে।
পাঁচন্দর ইউনিয়নের চিমনা গ্রামের কৃষক আবুল কাসেম জানান, শীতের কারণে আলু খেতে ছত্রাক জাতীয় রোগ যাতে দেখা দিতে না পারে সেইজন্য ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করছি। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে এভাবে ওষুধ স্প্রে করতে হতো না।
উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, শৈত্য প্রবাহের কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এ অবস্থা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নওগাঁয় চলমান শৈত্য প্রবাহ, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বীজতলার চারা গাছগুলো লালচে আর হলুদ হয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা সময়মতো বোরো আবাদ করতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন জেলার ১১টি উপজেলার কৃষকরা। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান শৈত্য প্রবাহ, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো না পাওয়ায় বীজতলার চারা গাছগুলো ‘কোল্ড ইনজুরি’তে আক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর, বর্ষাইল ও কীর্তিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, মাঠে তৈরি অধিকাংশ বীজতলার চারাগাছগুলো হলুদ ও লালচে রং ধারণ করছে। অনেক চারাগাছ মরে গিয়ে শুকনো খড়ে পরিণত হয়ে পড়েছে। শুধু বীজতলা নয়, প্রচন্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে আলু, সিম, সরিষাসহ অন্যান্য রবি শস্য খেতের গাছগুলো লালচে হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আলু গাছ শীতজনিত লেট ব্লাইট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় চলতি আলুর আবাদে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে জেলায় বোরো বীজতলাসহ রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বক্তারপুর ইউনিয়নের বরুনকান্দি গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, বাচ্চুসহ আরো অনেক কৃষক জানান, ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে বীজতলায় বীজ ফেলা হয়েছে। ২০-২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বীজতলার চারাগাছগুলো ভালোই ছিল। কিন্তু হঠাৎ গত ১৫-২০দিন ধরে চলা তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে সে সব বীজতলার অধিকাংশই চারাগাছগুলো এখন নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো বীজতলার সব চারাগাছই নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু বীজতলাই নয় আলু, সিম, সরিষাসহ অন্যান্য রবি শস্যের খেতও প্রচন্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
বরুনকান্দি গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘১৪ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদের জন্য ৭ কাঠা মাটিতে বোরো বীজতলা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু আমার বীজতলার সিংহভাগ চারাগাছই লালচে হয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। বীজতলার যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে পাঁচ বিঘা জমিতেও আমি এখন ধান লাগাতে পারব না। বীজতলা নষ্ট হওয়ায় চারা সংকটের কারণে বাকি জমিগুলোতে ধান আবাদ করতে পারব কিনা সেই আশঙ্কায় আছি। তা না হলে খোলা বাজার থেকে বেশি টাকা দিয়ে দুর্বল চারাগাছ কিনে এনে জমি লাগাতে হবে।’
বর্ষাইল ইউনিয়নের পাথরঘাটা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর ছয় বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। প্রচন্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে খেতের গাছগুলো লালচে হয়ে মরে যেতে বসেছে। এ অবস্থা আরও কয়েকদিন চললে খেতের সব গাছ মরে যাবে। এতে আলুর ফলনে বড় ধরণের বিপর্যয় হয়ে বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছি।’
বক্তারপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে এবং সূর্যের আলো কম থাকায় বীজতলার চারাগাছগুলো খাদ্য সরবরাহ না হওয়ার কারণে প্রথমে হলুদ এবং পরে লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা কৃষকদের বীজতলাগুলো সাদা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া এবং বীজতলায় রাতে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে রেখে সকালে সেই পানি বদলে আবার নতুন পানি রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ছত্রাকনাশক থিয়োভিট পাউডার ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।’
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, ‘এখনও বীজতলায় বড় ধরনের তেমন ক্ষতির আশঙ্কা করছি না। আবাহাওয়া কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে গেল যে সব বীজতলার চারাগাছগুলো হলুদ ও লালচে হয়ে গেছে সেগুলো আবারও ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু চলমান শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে বীজতলার চারাগাছ নষ্ট হয়ে কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। তবে আমাদের মাঠকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে থেকে বীজতলাসহ আক্রান্ত রবি শস্য নিবিড় পর্যক্ষণ ও কৃষকদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করছে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘শীতের কারণে আলু আবাদে তেমন ক্ষতি হবে না। একেবারে পুরো আলু গাছ মরে গেলে সেক্ষেত্রে ফলন বিপর্যয় হতে পারে। আমি নিজে সরেজমিনে মাঠে ঘুরে দেখছি, এখনও আলুর গাছ যথেষ্ট ভালো রয়েছে। সরিষা, গমসহ অন্যান্য রবি শস্যের আবাদও ভালো রয়েছে।’
নাটোর প্রতিনিধি জানিয়েছে, নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধানের বীজতলা ঠান্ডাজনিত সংক্রমণের কবলে পড়েছে। ফলে বীজতলার চারা সবুজ থেকে হলুদ হয়ে আগা ভেঙে যাচ্ছে। বিবর্ণ বীজতলার কারণে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এদিকে সংশ্নিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ায় নাটোরের চলনবিল অঞ্চলের কিছু এলাকার বোরো বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সূত্র মতে, নাটোরে এবার বোরো বীজতলাসহ রবিশস্যের জন্য ক্ষতিকর আবহাওয়া। নাটোর জেলার নলডাঙ্গার উপজেলার হালতি বিল, খোলাবাড়িয়া, সিংড়া উপজেলার শেরকোল, রাণীনগর, তেলিগ্রাম, নেঙ্গইন, পুঠিমারী ও পমগ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বোরো চাষিরা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় হতাশায় ভুগছেন। খোলাবাড়ীয়া গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন জানান, তার প্রায় ৮০ ভাগ বোরো বীজতলা তৈরি হয়ে গেছে। শুরুতে চারাগুলো তরতর করে বেড়ে উঠলেও আকস্মিক ঠান্ডা ও কুয়াশার কবলে পড়ে বীজতলা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আগে যারা চারা জমিতে রোপণ করেছে তাদের আবার নতুন করে চারা রোপণ করতে হবে।
সিংড়া উপজেলার পুঠিমারী গ্রামের কৃষক মোক্তার আলী বলেন, ‘এখন কি করবো কিছুই বুঝতেছিনা। জমিতে চারা লাগানোর সময় হয়ে গেছে কিন্তু অতিরিক্ত ঠান্ডার ভয়ে কিছু করার সাহস পাচ্ছি না।
বিলহালতি গ্রামের মইনুল হোসেন অভিযোগ করেন, ঢাকঢোল, ডাঙ্গাপারা, বারইহাটিসহ আশপাশের ৮-১০ গ্রামের শতাধিক কৃষক বোরো বীজতলা নিয়ে সংকটে পড়লেও কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা তাদের কাছে আসেননি এবং কোনো পরামর্শও দিচ্ছেন না।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, কুয়াশা ও ঠান্ডার সমস্যা সাময়িক। দুয়েক দিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে গেলে বোরো বীজতলাগুলো সজীব হবে। তিনি বলেন, নাটোর জেলায় ৫৫ হাজার ৫৩৯ হেক্টর জমিতে চলতি মৌসুমে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবার ৫৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি মনে করেন, চলমান অস্বাভাবিক আবহাওয়া বোরো চাষ এবং উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। তবে আবহাওয়া যদি ১৫-২০ দিন আরো বজায় থাকে সেক্ষত্রে কৃষকের উপর একটা প্রভাব পড়বে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা জানিয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরধানের বীজতলা, সবজিক্ষেতে ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষক। তবে কৃষি বিভাগের দাবি এই ক্ষতি খুব বেশি হয়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্বারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৫২ হেক্টর জমি। এরই মধ্যে কৃষকরা বীজসহ জমি চাষ দেয়ার কাজ শুরু করেছেন। ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের বীজতলা রোপন করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারোঘরিয়া, জাদুপুর, আতাহার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা জমিতে বিভিন্ন ধরনের জৈব সার ছিঁটানোর কাজ করছেন। আবার অনেকই ব্যস্ত বীজতলার যতœ নিতে। এবার শীতের কারণে কৃষকদের বীজতলায় বাড়তি যতœ নিতে হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে অনেকেই পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রেখেছেন। আবার অনেকই এ কাজটি না করায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ায় বীজতলাগুলো লালচেভাবে শুকিয়ে গেছে।
বারোঘরিয়ার কৃষক সাদিকুল ইসলাম জানান, দুই কাঠা জমিতে তিনি বোরো চাষের জন্য বীজতলা তেরি করেছিলেন, কিন্ত ধানের চারা প্রায় মরেই গেছে শীতের কারণে। তিনি জানান, আবারো কৃষি অফিস থেকে বীজ সংগ্রহ করে আবারো বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন।
এদিকে শীতের সবজি, ফুলকপি, পাতাকপিতে কালচে রং ধরায় কৃষক ভালো দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সবজিতে এ ধরনের সমস্যা চলমান শৈত্য প্রবাহের কারণেই হয়েছে বলে ধারনা করছেন ইসলামপুর ইউনিয়নের সবজি চাষী আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, দুই বিঘা জমিতে ফুলকপি ও পাতাকপির চারা লাগিয়েছেন, ফলন ভালোই ছিল, কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে কিছুটা হলেও তার সবজি খেতের ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার ড. সামস-ই তাবরিজ বলেন, শীতের কারনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকদের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে তিনি কৃষকদের কিছু বিষয়ে আরো যতœবান হওয়ার কথা বলে জানান, শৈত্য প্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, সেই সাখে বীজতলার ৩-৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হবে, প্রয়োজনে নলকূপের পানি দিতে হবে। এছাড়াও চারা হলুদ বা ঝলসানো হলে ছত্রাকনাশক ও ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। তিনি আরো জানান, কৃষকদের বোরো ধান চাষাবাদে করণীয় সম্পর্কে জানাত সচিত্র লিফলেট বিতরণ করছে কৃষি বিভাগ।