রাজশাহী কলেজে যৌন হয়রানি ও বুলিং অভিযোগ বক্স

আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০১৯, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম


‘যৌন হয়রানি ও বুলিং’ এর শিকার হন স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থী। কিন্তু অনেকেরই এই বিষয়গুলো সর্ম্পকে স্পষ্ট ধারণা নেই। নিজের অজান্তেই পা দেন যৌন হয়রানি অথবা বুলিংয়ের ফাঁদে। আমাদের সমাজে যৌন হয়রানি ও বুলিং সর্ম্পকে প্রচারণা এবং সচেতনতার অভাব রয়েছে। তবে, এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেশসেরা রাজশাহী কলেজ। শিক্ষার্থীরা যেন যৌন হয়রানি ও বুলিংয়ের শিকার না হয়, এবং এরকম ঘটনা ঘটলে যেন তার প্রতিকার মেলে সেই লক্ষে ক্যাম্পাসের বিভিন্নস্থানে স্থাপন করা হয়েছে যৌন হয়রানি ও বুলিং অভিযোগ বক্স।
সরেজমিন দেখা গেছে, কলেজের কলাভবন, রসায়ন ভবনের সামনে, ছাত্রী কমনরুমের সামনেসহ বিভিন্নস্থানে বসানো হয়েছে এসকল অভিযোগ বক্স। অভিযোগবক্সগুলো শিক্ষার্থীদের নজরে পড়বে এমন জায়গাতেই স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাসে ক্লাসে নোটিস দিয়ে অভিযোগ বক্স সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
তবে যৌন হয়রানি সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা থাকলেও, বুলিং সম্পর্কে জানেন না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যৌন হয়রানি হলো সেই ধরনের কর্মকান্ড ও আচরণ যা মানুষের যৌনতাকে উদ্দেশ্য করে মানসিক ও শারীরিকভাবে করা হয়। এটি এক ধরনের যৌন আগ্রাসন যার মধ্যে রয়েছে যৌন ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য, প্রকাশ্যে অযাচিত স্পর্শ, শিস দেওয়া বা শরীরের সংবেদনশীল অংশে হস্তক্ষেপ। অনেক সময় একে নিছক রসিকতা হিসেবে গণ্য করা হয় যা অপরাধীকে দায় এড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অনেক নারীবাদী এই যৌন হয়রানিকে ছোট খাটো ‘ধর্ষণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ।
অন্যদিকে, বুলিং হলো একধরনের মৌখিক, শারীরিক ও মানসিক পীড়ন বা আঘাত। একজন যখন অন্যজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে শারীরিক আঘাত করে বা অপদস্থ করে, মানসিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে তাকে বুলিং বলে। স্কুলের বাচ্চারা ক্লাসেই অন্য বাচ্চাদের দ্বারা যেমন বুলিংয়ের শিকার হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও বুলিংয়ের শিকার হতে পারে। কখনো কখনো পারিবারিকভাবেও বুলিংয়ের শিকার হয় শিশুরা। বিশেষভাবে, অশিক্ষিত পরিবারে ছেলে-মেয়েরা প্রতিনিয়তই বুলিংয়ের শিকার হন। অনেক সময় বন্ধুর দ্বারা বুলিংয়ের শিকার হয়ে মাদক ও অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেকে।
রাজশাহী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী প্রমি বলেন, আমরা যৌন হয়রানি সম্পর্কে কিছুটা জানলেও বুলিং সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাই অনেক সময় অপরাধের শিকার বা অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলেও আমরা কিছুই করতে পারি না।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী ইন্দিরা ঘোষ বলেন, আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিকারহীনতার ভয়সহ অনেক কারণে আমরা নারীরা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাই না। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন থাকায় এর কিছুটা প্রতিকার মিললেও, প্রতিকার মেলেনা বুলিংয়ের। কারণ এটা মানুষ স্বাভাবিক বলে মেনে নেয় বা নিতে হয়। আবার অনেক সময় বুলিংয়ের প্রতিবাদ করলে তাকে একঘরে করে দেওয়া হয় যা বুলিংয়ের একটি ভয়াবহ রুপ।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিফতদর, রাজশাহী অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী বুলিংয়ের শিকার হন। আর এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। এই দিকে লক্ষ্য রেখেই হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ হতে ১৮ই জুলাই সকল স্কুল কলেজে পাঠানো হয়েছে, ‘যৌন হয়রানি ও বুলিং’ অভিযোগ বক্স সম্পর্কিত নোটিশ।
এতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা যেন নির্বিঘেœ এবং নির্ভয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারে, সেজন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বক্স স্থাপন করতে হবে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ গঠিত কমিটি প্রাপ্ত অভিযোগ যাচাইপূর্বক অভিযোগের গুরুত্ব যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী কলেজ উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. আব্দুল খালেক বলেন, যৌন হয়রানি ও বুলিং হচ্ছে সামাজিক ব্যাধি। এখন দেখা যাচ্ছে, প্রাইমারি স্কুলেও এসব সমস্যাগুলো হচ্ছে। এবং বাচ্চারা বাবা-মাকেও বলতে পারছে না, শিক্ষককেও বলতে পারছে না। এজন্য সরকার সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বক্স স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। নির্দেশনা অনুুযায়ী, আমরা রাজশাহী কলেজে অভিযোগ বক্স স্থাপন করেছি।
তিনি আরো বলেন, আমাদের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা অভিযোগগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। যৌন হয়রানি ও বুলিং প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের ভূমিকাই মূখ্য। এছাড়াও শিক্ষার্থীদেরকে এসকল বিষয়ে অবহিত করতে প্রচারণার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। (লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ