রাজশাহী বেতারের নেতৃত্বে নারী কর্মকর্তারা || নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তবায়ন

আপডেট: জানুয়ারি ৩১, ২০১৮, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


আঞ্চলিক পরিচালক তৌহিদা চৌধুরী, আঞ্চলিক প্রকৌশলী ফারজানা আফরোজ ও আঞ্চলিক বার্তা নিয়ন্ত্রক উম্মে কুলসুম -সংগৃহীত

বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তিনটি শাখার প্রধান কর্মকর্তা হচ্ছেন তিন নারী। এই প্রথম বাংলাদেশ বেতারের কোনো একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান তিন শাখার দায়িত্ব পেলেন তিন নারী কর্মকর্তা। এটা বাংলাদেশ বেতারের ইতিহাসেরও প্রথম ঘটনা। তবে ওই তিন নারী কর্মকর্তা এটাকে বর্তমান সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বলে মনে করছেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান তিন নারী কর্মকর্তা হচ্ছেন, বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক তৌহিদা চৌধুরী, আঞ্চলিক প্রকৌশলী ফারজানা আফরোজ ও আঞ্চলিক বার্তা নিয়ন্ত্রক উম্মে কুলসুম। এছাড়া উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন তিনিও একজন নারী। তার নাম শিউলি রাণী বসু। এছাড়া সহকারী আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তিন জন নারী। তারা হচ্ছেন, নাসরীন বেগম, তনুশ্রী স্যানাল ও ফারজানা ইয়াসমিন।
রাজশাহী বেতার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশ বেতার প্রতিষ্ঠার পর বহু সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র গণমাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ বেতার অর্জন করেছে নানা স্বীকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ বেতারের রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকাও। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ বেতারের একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান তিন কর্মকর্তা হিসেবে নারী কর্মকর্তারা কখনো দায়িত্ব পাননি। তা-ও আবার একটি শাখায় নয়, একইসাথে বেতারের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তিন তিনটি শাখার প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে এই প্রথম দায়িত্ব পালন করছেন তিন নারী। শুধু বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর হিসেবেই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের বেতারের ১২টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম ঘটনা। তবে প্রথম ঘটনা হলেও ওই তিন নারী কর্মকর্তা এটাকে বর্তমানের সরকারের নারী ক্ষমতায়নের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলে মনে করেন।
তৌহিদা চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার যেসব এজেন্ডা নিয়ে দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ও ২০৩১ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে চান তার একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর তিনটি প্রধান শাখার দায়িত্বে তিন নারী কর্মকর্তা থাকার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয় এই সরকার নারীর ক্ষমতায়নে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
ফারজানা আফরোজ বলেন, সরকারের অনেকগুলো সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন তার মধ্যে একটি। এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও সমান দায়িত্ব নিয়ে যে কাজ করতে পারেন তারই প্রমাণ এটি। এর মধ্যে দিয়ে নারীরা আরো বেশি কাজে উৎসাহ পাবেন। উম্মে কুলসুম বলেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব সেক্টরেই নারীরা সমানভাবে কাজ করছেন। এটি সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের যে এজেন্ডা রয়েছে তারই বাস্তব প্রতিফলন।
১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতারের চাকরিতে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা তৌহিদা চৌধুরী। এরপর বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন কার্যালয়ের নানা শাখায় কাজ করেছেন। ২০১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকেই পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাখছেন দক্ষতার স্বাক্ষর। বেতার নিয়ে তার রয়েছে নানা স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। তৌহিদা বলেন, বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছেছে এমন একটি গণমাধ্যম বেতার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলাসহ সরকারের উন্নয়নমূলক নানা কর্মকাণ্ড প্রচার করছে বেতার। এককইসাথে শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড প্রচার করছে, একইসাথে সচেতন করছে জনসাধারণকেও। পাশাপাশি বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড তো রয়েছেই। আগামি দিনে বেতারকে যেন আরো বেশি গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে বেতার।
২০তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতারের প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্সে পড়াশোনা করা ফারজানা আফরোজ। প্রকৌশলী হিসেবে বেতারকে কত সহজভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায় তাই নিয়েই ভেবেছেন নিরন্তর। আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর সম্প্রচার শাখাকে করেছেন আরো বেশি গতিশীল। এছাড়া বেতার কার্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নেও রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর। পুরো কার্যালয়কে সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত করা, কার্যালয়ের ভেতরের এবং বাইরের সৌন্দর্য বর্ধন, কার্যালয়ে নতুন এসি লাগানো, তরঙ্গের মান উন্নয়নসহ সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রেখেছেন সম্প্রচার বিভাগকে।
ফারজানা আফরোজ জানান, আঞ্চলিক কার্যালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সবসময় ভাবনা থাকে সম্প্রচার বিভাগকে আরো বেশি গতিশীল করা। সেই দায়িত্ব নিয়েই সম্প্রচার বিভাগে কাজ করছি। আমি মনে করি রাজশাহী বেতারের সম্প্রচার বিভাগ অনেক উন্নত।
রাজশাহী কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা উম্মে কুলসুম বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থায় সহকারী বার্তা নিয়ন্ত্রকের পদবিতে যোগদান করেছেন ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে। ২০১১ সালে আগস্টে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর উপ-বার্তা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব নেন। এখন দায়িত্ব পালন করছেন আঞ্চলিক বার্তা নিয়ন্ত্রকের। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংবাদ শিল্পী গঠন, বেতারে সংবাদ প্রেরণকারীদের সম্মানী বৃদ্ধি, সংবাদ পাঠকদের মান উন্নয়ন থেকে শুরু করে নিউজের সংখ্যাও করেছেন বৃদ্ধি।
উম্মে কুলসুম জানান, ১৯৬৩ সালে যখন বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী যাত্রা শুরু করে তখন একটা নিউজ সম্প্রচার হতো। এখন চারটি নিউজ সম্প্রচার হয়। আরো দুইটি নিউজ সম্প্রচারের অনুমতি দিয়েছে সরকার। এছাড়া রাজশাহীবাসীর দাবি ছিলো, একটি ইংরেজি সংবাদ যেন সম্প্রচার হয়। তারও অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এছাড়া আগে হাতে লিখতে হতো সংবাদ। এখন কম্পিউটারেই লিখা হয়।
তিনটি শাখার প্রধান তিন নারী কর্মকর্তাকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত তার সহকর্মীরাও। তারাও এটিকে বর্তমান সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য ছিলো তার বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন। তিন নারী কর্মকর্তাকে পেয়ে খুশিই তারা। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসান আখতার বলেন, তিন নারী কর্মকর্তাকে পেয়ে আমরা খুশিই। তাদের নেতৃত্বে কাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পনামাফিক ও সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা সহকর্মীরা সবাই কাজকে দারুণভাবে উপভোগ করছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ