রাণীনগরের মৃত্যুফাঁদ ওভার ব্রিজ: দায় সারানো সাইন বোর্ড || এবার ঈদেও প্রাণহানীর আশঙ্কা

আপডেট: জুন ১৩, ২০১৮, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রউফ রিপন, নওগাঁ


রাণীনগরের স্টেশনের ওভার ব্রিজ-সোনার দেশ

দুর্ঘটনা ঘটার পর সবার টনক নড়ে। চলে দর্শন পরিদর্শন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কিন্তু আর ফিরে আসে না দুর্ঘটনায় হারানো জীবনগুলো। পূরণ হয় না স্বজন হারানো ক্ষতটি। রঙ্গিন স্বপ্নগুলো আর উড়ে না আকাশে-বাতাসে। দুয়ারে কড়া নাড়ছে আসন্ন ঈদের আনন্দ। নিজের স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে ঢাকা থেকে সবাই ফিরবে নিজ বাড়িতে। কেউ ফিরবে ট্রেনের ভিতরে ভিআইপি কায়দায় আবার কেউ ফেরার চেষ্টা করবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাঁদে। এটিই আমাদের দেশে ঈদের সময় ট্রেন যোগে বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক দৃশ্যপট।
সম্প্রতি রাণীনগর রেলওয়ে ওভার বিজে একটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেযা হয়েছে। সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন দ্রুতগামী ট্রেনের ছাদের যাত্রীরা কখন পড়বেন ওই সাইন বোর্ডটি। তার আগেই তো ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা। প্রতি বছরের মতো এবছরও গত ২ জুন থেকে বাস-ট্রেনের অগ্রিম টিকিট দেওয়া শুরু হয়। এবারে সড়ক পথের চেয়ে রেল পথে ভ্রমন করতে যাত্রীরা বেশি আগ্রহী।
কিন্তু উত্তর অঞ্চলের ট্রেনে ভ্রমণরত যাত্রীদের মৃত্যু ফাঁদ নামক স্থান রাণীনগর রেলওয়ে স্টেশনের ওভার ব্রিজ। নিজ বাড়িতে এসে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাবেন বলে টিকিট কেটেও আসন না পেয়ে আবার অনেকেই টিকিট ছাড়াই বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন। এসময়গুলোতে যাত্রীদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ছাদে ভ্রমণরত যাত্রীরা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে অসাবধানতাবসত রাণীনগরের ওভার ব্রিজের গার্ডারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে কিছু যাত্রীর ঈদ আনন্দ শোকে পরিনত হয়।
প্রায়শ দুর্ঘটনায় আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ দেখা না গেলেও এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ওই ওভার ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে সম্প্রতি সচেতনতামূলক একটি সাইন বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সাইন বোর্ডটি লাগানোর জায়গা নিয়েও এলাকায় চলছে নানা বিতর্ক।
স্থানীয়রা বলছেন, সচেতনতা মূলক এই সাইন বোর্ড যাত্রীদের নজরে পড়ার মত না, যদিও নজরে পড়ে তাহলে সাইন বোর্ড দেখতে বা পড়তে গিয়ে যাত্রীরা আরো বেশি দুর্ঘটনার শিকার হবেন বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। যখনই দুর্ঘটনা ঘটে তখনই ব্রিজটি সংস্কার করা হবে! এই হচ্ছে! কর্তৃপক্ষের এমন আশ্বাসই ট্রেন যাত্রীদের শেষ ভরসা!
প্রতি বছরই মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে সেতুর রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিহতদের তালিকা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় দুই ঈদ উৎসবসহ বিভিন্ন পূজা-পার্বনে রেলের যাত্রী বৃদ্ধি পাওয়ায় এক শ্রেণির যাত্রীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই ট্রেনের ছাদেই ভ্রমন করে। জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, চিলাহাটী, পার্বতীপুর, নিলফামারী, সান্তাহার, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুরসহ উত্তর জনপদের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী, যশোর, খুলনা, যমুনা সেতু পার হয়ে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত দিন রাতে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনসহ প্রায় ১১ টি ট্রেন নিয়মিত রাণীনগর রেলওয়ে স্টেশন হয়ে চলাচল করে। রেলওয়ের পশ্চিম অঞ্চলে স্টেশনের ক্যাটাগরি মোতাবেক অধিকাংশ স্থানে ওভার ব্রিজ আছে। সেই সব সেতুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রাণহানীর ঘটনা কম-বেশি থাকলেও রাণীনগর রেল স্টেশনে স্থাপিত ওভার ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা যাত্রীদের প্রতি মাসেই প্রায় আহত-নিহতর ঘটনা লেগেই আছে।
সান্তাহার রেলওয়ে জংশনের কর্মকর্তা বলেন, যদিও ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনে দ-নীয় অপরাধ। ছাদে ভ্রমণে যাত্রীদের বারবার নিষেধ করলেও এক শ্রেণির যাত্রীরা নিষেধ না মানার কারণে রাণীনগরের ওভার ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রাণহানীর মত ঘটনা ঘটেই চলেছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলগুলো সময়ের প্রয়োজনে নতুন করে নির্মাণ কিংবা সংস্কার করায় পাটাতনের উচ্চতা কিছুটা বৃদ্ধি হওয়ার ফলে ওভার ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে অসাবধানতাবসত ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ যাত্রীদের দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। স্বাভাবিক ভাবে প্রতিটি উড়াল সেতু প্রায় ১৭ ফিট থেকে সাড়ে ১৭ ফিট উঁচু হয়। কিন্তু রাণীনগরে রেল লাইন থেকে ওভার ব্রিজের উচ্চতা ১৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ট্রেনের উচ্চতা ১৩ ফিট ৬ ইঞ্চি। তাই ট্রেনের ছাদে যাত্রীরা যখন বাধ্য হয়ে ভ্রমণ করেন তখন ওভার ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বেশ কিছু দিন আগে রাণীনগর রেল স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মরত স্টেশন মাস্টার না থাকায় নজরদারী কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়েই চলছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা দিনাজপুর গামী দ্রুতযান আন্তঃনগর ট্রেনের ছাদে ভ্রমণরত যাত্রীদের মধ্যে ৭ জন যাত্রী ওভার ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই ৪ জন যাত্রী মারা যান এবং আরো ৩ জন গুরুত্বর আহত হন। আহতদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো দুই জন যাত্রী রাজশাহী মেডিকেকলেজ হাসপাতালে ঘটনার পরেদিন মারা যান। রাণীনগরে ৬ জন যাত্রী মারা যাওয়ার পর রেল বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে মৃত্যু ফাঁদ এই ওভার ব্রিজটি সংস্কারের আশ্বাস দেন । এরপর প্রায় ৪মাস অতিবাহিত হলেও রেল কর্তৃপক্ষের ওভার ব্রিজের সংস্কারের দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নজরে আনতে পড়েনি। অনতিবিলম্বে এই ওভার ব্রিজের সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ করার দাবি জানান এলাকাবাসি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী (ব্রিজ) মনিরুজ্জামান মুঠোফানে বলেন, রাণীনগর স্টেশনের ওভার ব্রিজ সংস্কারের মাধ্যমে উঁচু করার কাজের অফিসিয়াল প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। খুব দ্রুতই এর জন্য টেন্ডার আহবান করা হবে। অল্পদিনের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে। বর্তমান যে ১৬ ফুট উচ্চতা আছে তার থেকে বাড়িয়ে ২১ ফুট উচ্চতা করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ