রাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কী হচ্ছে : ইমেজ ক্ষুণœ’র দায় কার

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম সারওয়ার


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের দু’গ্রুপের মধ্যে বিস্ময়কর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সংবাদ সম্মেলনের  পর এবার ওই বিভাগের একজন ছাত্র অভিযোগ দিলেন এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। সহকারি অধ্যাপক রুখসানা পারভীন তাকে চরম মানসিক নির্যাতন এবং তার শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে- এই অভিযোগ এনে সোমবার (২১ আগস্ট) এর প্রতিকার চেয়ে মাস্টার্সের ওই ছাত্র ভিসি’র কাছে পত্র দিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দুই গ্রুপের শিক্ষক সম্প্রতি যে অপরিণামদর্শি কর্মকা- করেছেন সত্যিই তা হতাশাব্যঞ্জক এবং দুর্ভাগ্যজনক। তাঁরাতো সর্বোচ্চ শিক্ষালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, সবচেয়ে মেধাবি শিক্ষক সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। ‘দীপ্তিমান আলোর পথের যাত্রী’ খ্যাত এই সব শিক্ষক জাতির কাছে, সমাজের কাছে, তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীদের কী ম্যাসেজ দিলেন। একদিকে উম্মত্ত হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষাপরায়ণতা, পরনিন্দা, অপবাদ; অন্যদিকে মহান শিক্ষকতা পেশার অমর্যাদা, নীতিহীনতা এবং দায়িত্বহীনতা। দুই গ্রুপের শিক্ষকদের ভূমিকাই নেতিবাচক। এ প্রসঙ্গে একজন মহান কবির দু’টি চরণ মনে পড়ছে, “শিক্ষক মোরা শিক্ষক/ ধরণীর মোরা পরমাত্মীয়/ মানুষের মোরা দীক্ষক।” এই দুই গ্রুপের শিক্ষক সাম্প্রতিককালে যেসব কর্মকা- করলেন তাতে শিক্ষার্থীরা কোনো ইতিবাচক দীক্ষা পাবেন কি? প্রতিটি পেশারই কিছু না কিছু নৈতিক দিক রয়েছে, যেগুলো মেনে চলা পেশাদারদের কর্তব্য। নীতি হচ্ছে শৃংখলা, যা আইনের সমদর্শী। আইন যেমন ব্যক্তিকে শাসনে রাখে, নীতিমালাও তেমনি কোনো পেশাকে বা পেশাজীবীকে নিয়মনীতি গর্হিত কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণ করে। যে কোনো পেশাকে সুশৃংখলভাবে পরিচালনার জন্য কিছু নীতিমালা থাকে। এই নীতি না মেনে চললে পেশাজীবী পথভ্রষ্টের দিকে চলে যায় এবং পেশার সহজাত আনুগত্য নষ্ট হয়। আর এটা হলে পেশার গুণগত মান বিনষ্ট হয়ে দেশ, জাতি বা সমাজ হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দুই গ্রুপের শিক্ষকগণ দুই সপ্তাহের অধিককাল ধরে দৃশ্যমান যে সব অপ্রত্যাশিত, অশোভন, অনভিপ্রেত এবং অবিবেচনাপ্রসূত ঘটনা ঘটালেন এতে শুধু বিভাগের শিক্ষকদেরই মর্যাদা নষ্ট হয়নি, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। গত ৫ আগস্ট স্থানীয় একটি পত্রিকায় ওই বিভাগের কয়েকজন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী তাদের সাক্ষাৎকারে বলেছে, “শিক্ষকদের এ ধরনের আচরণ শিশুসুলভ। তাঁরা নোংরামির চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন। তাঁদের এইসব নেতিবাচক কর্মকা-ের জন্য ছাত্ররা বাইরে বিভাগের পরিচয়ও দিতে পারছে না। এমনকি অন্য বিভাগের বন্ধু ও সিনিয়র-জুনিয়ররা বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকরভাবে হাসি-ঠাট্টা করছে- যা লজ্জাজনক এবং অসহনীয়।” সব মিলিয়ে দুই গ্রুপের শিক্ষকগণ তাঁদের পেশাগত নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব  কাজ করেছেন তাতে শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার নয়, অত্রাঞ্চলবাসীসহ দেশবাসী নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের দুই পক্ষের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি অনেকদিন ধরে চলছে। বিভাগের নিয়মিত ১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে বর্তমান সভাপতি প্রফেসর নাসিমা জামান এবং সহকারী অধ্যাপক রুখসানা পারভীন একদিকে এবং বাকি ১১ জন আরেকদিকে। এদের মধ্যে প্রফেসর পদের সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষকও আছেন। দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে গত ২৭ জুলাই থেকে। এ পর্যন্ত প্রশাসনের কাছে পাল্টাপাল্টি তাঁদের ৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। ১১ জনের পক্ষ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ধর্মঘটও করেছেন। এই পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এরই মধ্যে সোমবার (২১ আগস্ট) বিভাগের নাদিম মোস্তফা নামের মাস্টার্সের এক ছাত্র শিক্ষক রুখসানা পারভীনের বিরুদ্ধে নানাভাবে হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন। উপাচার্যের কাছে পেশকৃত ওই অভিযোগ পত্রে ছাত্র উল্লেখ করেন, ‘আমার শিক্ষক রুখসানা পারভীন  পরীক্ষায় ফেল করে দেয়ার ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে আমাকে মানসিকভাবে চরম নির্যাতন করতেন। তিনি তাঁর বাসায় কাজের মেয়ে সরবরাহের জন্য আমাকে বাধ্য করতেন। অপারগতা প্রকাশ করলে ফেল করিয়ে দেবার ও পুলিশি হয়রানির হুমকি দিতেন। ৫/৬ বার কাজের মেয়ে সরবরাহ করেছি। পরবর্তিতে অপারগ হওয়ায় চতুর্থ বর্ষে তার ৪০৫ কোর্র্সের ইনকোর্স পরীক্ষা নেননি। ম্যাডামের হুমকি-ধামকির কারণে আমি শেষ পর্যন্ত ¯œাতকোত্তরে ভর্তিই হইনি’। রুখসানা পারভীন এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এগুলো সবই ওই ১১ শিক্ষকের ষড়যন্ত্র। তাঁরা ওই ছাত্রকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে’। জানা যায়, বিভাগের সভাপতির প্রতি কিছুসংখ্যক শিক্ষকের পূর্ব থেকেই অসন্তোষ ছিল। এর সাথে ঘৃতাহুতির মতো কাজ করেছে রুখসানা পারভীনের অপরিণত কর্মকা-। তাঁর বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ও বাইরে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে মর্যাদাহানিকর ও কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলার অভিযোগ রয়েছে। এ সব বিষয় নিয়ে বিভাগে অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রুখসানা পারভীনের বিরুদ্ধে ১১ জন শিক্ষকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ জুলাই বিভাগের একাডেমিক কমিটির তলবি সভা আহ্বান করেন সভাপতি ড. নাসিমা জামান। কিন্তু সভা শুরুর কিছু পূর্বে সভাপতি অজ্ঞাত কারণে ওই সভা স্থগিত করেন। এমতাবস্থায় ওই ১১ জন শিক্ষক ক্ষুব্ধ হয়ে ৩১ জুলাই পূর্বাহ্নে রুখসানা পারভীনের বিরুদ্ধে উপাচার্য দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই একই দিন অপরাহ্নে রুখসানা পারভীনও ওইসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দাখিল করেন। ওই অভিযোগ পত্রে তিনি ১১ জনের একজন শিক্ষক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক  প্রফেসর রহুল আমিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। ঠিক দুই দিন পর ২ আগস্ট ৭টি কারণ দেখিয়ে সভাপতি প্রফেসর ড. নাসিমা জামানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে ১১ জন শিক্ষক উপাচার্যের নিকট পত্র দেন। ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়, সভাপতি বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্ত সবার উপরে চাপিয়ে দেন। প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে জরুরি সভা ডেকে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, বিভাগের শিক্ষকদের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কথা অন্য বিভাগের শিক্ষকদের কাছে রটনা করেন। একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অবজ্ঞা করে বঙ্গবন্ধুর ছবি তাঁর দপ্তরে টাঙ্গাননি, কর্মস্থল ত্যাগ করার সময় তাঁর দায়িত্ব অন্য শিক্ষকের উপর ন্যস্ত করার বিধান থাকলেও তিনি তা করেন না। তাঁর পরিবার ঢাকায় থাকার কারণে তিনি প্রায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। পরদিন ৩ আগস্ট ওই ১১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে পাল্টা উপাচার্যের নিকট পত্র দেন সভাপতি ড. নাসিমা জামান। ওই পত্রে তিনি বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীদের নকলের মহোৎসব করার সুযোগ করে দেয়াসহ বিভিন্ন সময়ে বিভাগের অর্থ কেলেংকারিতে তাঁরা জড়িত বলে অভিযোগ করেন। তিনি জানান, নিজেদের বিরুদ্ধে জমে থাকা বিভিন্ন অপকর্ম থেকে রক্ষা পেতে এখন তাঁরা একজোট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অশিক্ষকসূলভ আচরণ করছেন। প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করে দায়িত্বহীনভাবে এখনও বিভিন্ন বর্ষের রেজাল্ট তাঁরা দেননি। উপরন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা না করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য এখন ক্লাস -পরীক্ষা বর্জন করছেন। ওই একই দিন অর্থাৎ ৩ আগস্ট বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন সহকারী অধ্যাপক রুখসানা পারভীন। তিনি সাংবাদিকদের সামনে স্পর্শকাতরভাবে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। তিনি জানান, প্রফেসর রুহুল আমিনের যৌন হয়রানি যখন সহ্যের বাইরে চলে যায়, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন যে,তাঁর তত্ত্বাবধানে আর কাজ করবেন না। তিনি অভিযোগ করেন, সুপারভাইজার হিসেবে তাঁর অধীনে কাজ করার আপত্তি জানানোর পর থেকেই বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে জোট বেঁধে তিনি নানাভাবে তাঁকে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করে আসছেন। দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা যদি প্রশাসন নিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ সেলে তিনি অভিযোগ দেবেন বলে সাফ জানিয়ে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর নাসিমা জামান।
পরের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় ওই ১১ জন শিক্ষক সভাপতি ড. জামান এবং রুখসানা পারভীনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন। এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, প্রফেসর ড. এম. আমিনুর রহমান, প্রফেসর ড. এস. এম রাজী, প্রফেসর ড. কফিল উদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর ড. মো. রুহুল আমিন, ড. ফারহাত তাসনীম, মো. তারেক নূর, মোসা. কামরুন নাহার, ড. এ কে এম মাহমুদুল হক এবং ড. মো. সুলতান মাহমুদ। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান প্রফেসর ড. এস এম এক্রাম উল্যাহ। বক্তব্যে তিনি প্রফেসর রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে রুখসানা পারভীনের আনা এ্যাকাডেমিক ও যৌন হয়রানির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এর প্রতিবাদ করেন। শিক্ষকদের তিনি পুলিশের ভয় দেখান বলে জানান। কারণ, তাঁর খুব কাছের লোক একজন পুলিশ অফিসার। সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে তিনি যৌন হয়রানির হুমকি দেন। বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন শিক্ষকের নামে তিনি ‘আপত্তিকর’ ও ‘মানহানিকর’ কথা ছড়িয়ে বেরিয়েছেন। সে সব কথার রেকর্ডিং সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন এবং অপসারণের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য রুখসানা পারভীনকে হাত করে তাঁকে ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করে সভাপতি যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এছাড়া রুখসানা পারভীনের বিরুদ্ধে বিধি বহির্ভুত, অশোভন, অশালীন, অমার্জিত এবং নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ করেন। তন্মধ্যে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা হলে আবাসিক শিক্ষক হিসেবে থাকাকালীন হলের প্রভোস্টের সাথে তাঁর নেতিবাচক কর্মকা-ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তিনি সেখানেও প্রভোস্টকে হুমকি-ধামকি দেন বলে জানানো হয়। সম্প্রতি স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রফেসর রুহুল আমিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমার আচার-আচরণ, শিক্ষা-দীক্ষা কেমন তা বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই জানেন। আমি এসবে অভ্যস্ত নই। ঝামেলা এড়িয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। রুখসানা পারভীন গবেষণার কাজ ঠিকমত করতেন না। হঠাৎ একদিন এসে তিনি আমাকে তাঁর অসম্পূর্ণ একটি থিসিস পেপার স্বাক্ষর করে দিতে জোরাজুরি করেন। তখন আমি তাকে অন্য সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে সরে যাই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রুখসানা পারভীন এ ধরনের অভিযোগ রটিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।’
গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ১১ জন শিক্ষক এক জরুরি সভায় পরের দিন ৬ আগস্ট থেকে বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. নাসিমা জামানকে অপসারণ না করা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাশ-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। ঘোষণা মোতাবেক তাঁরা ওইদিন বিভাগের সামনে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং সব ধরনের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেন। এই খবরটিও ছবিসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, ছাত্র-ছাত্রীদের জিম্মি করে তাদের শিক্ষাজীবনের কথা না ভেবে এইসব অবিবেচনাপ্রসূত ঘটনা নিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট আহবান করা কি তাঁদের পেশাগত নৈতিকতার মধ্যে পড়ে ? এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ’৭৩-এর অধ্যাদেশকে অবজ্ঞা করার শামিল নয় ? এটা কি তাঁদের মানায় ? শিক্ষকতা তো শুধু একটি বৃত্তি বা পেশা নয় বরং এটি আরাধনা। আদর্শ ও নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকদের জ্ঞান ও গুণে মুগ্ধ শিক্ষার্থী শিক্ষককে দেবতাতুল্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের এইসব কার্যকলাপে শিক্ষার্থিরা তাঁদের প্রতি কি ধারণা পোষণ করলো, তা ছাত্র-ছাত্রীদের মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়।  অবশেষে কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর আখতার ফারুককে প্রধান করে হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রফেসর মো. তাজুল ইসলাম এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মো. আব্দুল লতিফকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করায় এবং উপাচার্যের অনুরোধে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন ধর্মঘটি ১১ জন শিক্ষক। তবে সভাপতিকে অপসারণ না করা পর্যন্ত একাডেমিক ও প্লানিং কমিটির সভা বর্জনসহ বিভাগে তাকে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের দুই গ্রুপের অনাকাক্সিক্ষত, অশোভনীয় ঘটনায় গোটা ক্যাম্পাসে ঢি ঢি পড়ে যায়। সমস্ত প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাটে, মোড়ে-মোড়ে, চায়ের দোকানে, হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে সর্বত্র বিষয়টি বহুল আলোচিত হয়ে ওঠে। পুরো নগরীজুড়ে এই ঘটনাকে অনৈতিক, বিবেকবর্জিত বলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক কথাবার্তা শুরু হয়। তারা এও বলেন, এতোদিন শুনেছি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন হয়রানির কথা। এখন শুনছি শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষিকার যৌন হয়রানির অভিযোগ। তাও বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায়। বরাবর দেখে আসছি ডাক্তাররা রোগিকে জিম্মি করে ধর্মঘট করে কিন্তু এখন দেখছি মুক্ত চিন্তার অধিকারি, মুক্তবুদ্ধি চচার্র লালন ক্ষেত্রের সবচেয়ে মেধাবী, সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও গবেষকগণ শিক্ষার্থিদের জিম্মি করে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করছে। অনেক সচেতন নগরবাসি এই  ঘটনাটিকে সতর্কতার দৃষ্টিতে দেখছেন। তাঁরা কর্তৃপক্ষের বিলম্ব করাটাকে যুক্তিযুক্ত মনে করেননি। বিষয়টি দ্রুততার সাথে দেখা উচিত ছিল। কারণ, শকুনিরা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সুযোগ খুঁজছেন। ভিসি-প্রোভিসির যোগদান খুব বেশি দিন হয়নি। প্রশাসন একটা নাজুক অবস্থা থেকে যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে যাচ্ছে, হাজার হাজার স্তুপীকৃত ফাইল ধীরে ধীরে কমে আসছে, ঠিক সেই সময় এই ঘটনাকে অনেকে ভালো চোখে দেখছেন না। প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে লক্ষ্য করে দুই পক্ষের শিক্ষকদের বোঝা উচিত ছিল প্রশাসন এখন অপূর্ণাঙ্গ। দীর্ঘদিন ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদের শূন্যতাজনিত কারণে যে গ্যাপের সৃষ্টি হয়েছে- এই সময়ে এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। গত প্রশাসনের নিয়োগকৃত উর্ধতন কর্মকর্তাদের ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি অবস্থা। কখন আছেন, কখন নাই। ইতোমধ্যে তাঁদের পদত্যাগের হিড়িক পড়ে গেছে। অন্ততঃ যারা একই গ্রুপভুক্ত বলে দাবি করেন, তাঁদের চিন্তা করা উচিত ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় তথা নয়া প্রশাসনকে এখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। বেকায়দায় ফেলানো যাবে না। অবস্থাদৃষ্টে তাই অনেকেই বলার সুযোগ পাচ্ছেন ‘সর্ষের মধ্যেও ভূত আছে।’ এই মুহুর্তে এই ধরনের ঘটনাকে অনেকে ষড়যন্ত্র বলতেও ছাড়ছেন না।
বিভাগের শিক্ষকগণ তাঁদের পেশাগত হীনমন্যতা পরিহার করে চিহ্নিতদের গোপনীয়তা বজায় রেখে তাঁদের ক্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। পারস্পরিক সৌহার্দ্যভাব বজায় রেখে আক্রমণাত্মক ভাব ত্যাগ করে বিষয়গুলোর সমাধান করা যেতে পারতো। গীবত বা অপবাদ কিংবা পরনিন্দা, পরচর্চা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এসব নেতিবাচক দিকগুলো পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট করে। সামাজিক জীবনে, পেশাগত জীবনে ঘৃণা , হিংসা ও শত্রুতার উন্মেষ ঘটায়। প্রতিষ্ঠানে, সমাজে শান্তি-শৃংখলা ও  ভারসাম্য নষ্ট হয়। আল্লাহ পাক কোরআন মজিদে এরশাদ করেন, “তোমরা একে অন্যের গীবত করো না। কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে ? অবশ্য তোমরা তা অপছন্দই করবে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “গীবতকারীর কোনো দোয়া, তার  কোনো নেক কাজ কবুল হয়না। তার আমলনামায় পাপাধিক্য হয়।” তবে যাই হোক, একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তাঁরা চিরুণি অনুসন্ধান করে বিষয়গুলো অন্তর্ভেদি দৃষ্টি দিয়ে নিরপেক্ষভাবে দেখবেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। অনেক তদন্ত কমিটি স্বার্থের কারণে, দলীয় নোংরা রাজনীতির কারণে বছরের পর বছর আলোর মুখই দেখেনি। কিন্তু এই  বিষয়টি ভিন্ন। এটা শিক্ষকদের বিষয় বলে এড়িয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন পুলিশের তদন্ত করা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আছে, বিষয়টি সকলে এমনটিই মনে করছেন। কারণ, এখানে শিক্ষক সমাজের সুনাম-দুর্নামের বিষয় জড়িত। কিন্তু আইনের চোখে সকলেই সমান-কথাটি মহান বুদ্ধিজীবীদের মনে রাখা উচিত। একটি অনৈতিক কাজকে এড়িয়ে গেলে বহু অনৈতিক কাজ জন্ম নেবে। সংবিধানের মৌলিক অধিকারের চ্যাপ্টারে চিন্তার, বিবেকের এবং বলার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ৩৯ (২) (ক) ধারায় বর্ণিত আছে, “প্রত্যেক নাগরিকের বলার ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হলো। তবে শর্ত হলো, জনশৃংখলা, শালীনতা, নৈতিকতা রক্ষার স্বার্থে বা আদালত অবমাননা, মানহানি বা কোনো অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দিতে পারে এসব ক্ষেত্রে উক্ত অধিকারগুলোর ওপর আইন অনুসারে যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ আরোপ করা যাবে।” বিধায়, নিরপেক্ষ তদন্তে যদি প্রমাণ মেলে তবে সংবিধানেও আইন অনুসারে বাধা নিষেধ আরোপের কথা বলা আছে। সব চেয়ে বড় কথা, শিক্ষক সমাজকে যারা হেয় করেছে , সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা যারা ক্ষুণœ করেছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। কাকের মাংস যাতে কাক খাওয়ার চেষ্টা না করে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়তো রাজনীতির সূতিকাগার। এখানে দল আছে আবার দলের মধ্যে স্বার্থের হানাহানির কারণে বিভক্তিও বড় ধরনের আছে। তদন্ত কমিটিকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিত। নইলে এই দায়ভার কার স্কন্ধে চাপবে বলা মুশকিল। সচেতন জনগণ মনে করেন, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ এসব অশিক্ষকসূলভ মনোভাব ত্যাগ করে তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে আজকের রাজনৈতিক সংকট তথা সমগ্র সমাজকে নানা ধরনের রাহুগ্রাস থেকে তাঁরা বাঁচাতে পারেন। হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২১ হাজার শিক্ষক এবং সাড়ে ৬ লাখ ছাত্র-ছাত্রী আছেন। এসব শিক্ষকগণ-শিক্ষকতার ব্রত নিয়ে জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের আন্তরিকভাবে গড়ে তুলে তাদের মেধা মনন এবং শ্রম দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
পরচর্চা, পরনিন্দা, অসুস্থ রাজনীতি চর্চা, দলাদলি কিংবা সর্বদা ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যস্ত থাকা, বিভাগীয় রাজনীতি- এসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মানায় না। তাঁরা দিন-রাতের বড় একটি সময় নষ্ট করে ফেলে এসব চর্চায়। বিশ্ববিদ্যালয়েতো উচ্চশিক্ষা প্রদানসহ বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজকর্ম হয়। তাঁরা ইচ্ছা করলেই ওই সময়টুকু গবেষণার কাজে লাগাতে পারেন। যদি নিজেকে কেউ একজন সত্যিকারের শিক্ষক মনে করেন, তবে তিনি ওইসব নেতিবাচক কাজ করতে নিশ্চয় লজ্জিত হবেন। তিনি পেশাগত নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ বিশ্বমানের, বিশ্বজনিন। তাঁরা শুধু জ্ঞান দান করেন না, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন, জ্ঞানের সংমিশ্রন ঘটান। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে জ্ঞাননির্ভর সমাজ বিনির্মাণের প্রকৃত বোদ্ধা হিসেবে তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মূল কাজ নিরন্তর পড়াশোনার মাধ্যমে নতুন-নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার জন্য শিক্ষার্থীদের মানসভূমে জ্ঞানস্পৃহা জাগিয়ে তোলা। তাঁরা মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্রের কারিগর, যেখানে সত্যিকারের মানুষ তৈরি হয়, প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়া হয়। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকগণ যেসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠেছেন, তাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে কি ধরনের চেতনার জন্ম নেবে – প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁরাতো পৃথিবীর অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য গেছেন, সেখানে শিক্ষকতা করার জন্য বছরের পর থেকেছেন কিন্তু সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কি নিজেদের মধ্যে এই ধরনের কামড়াকামড়ি করতে দেখেছেন? অশোভনীয় বিষয় নিয়ে কি একে অপরের সম্ভ্রম নষ্ট করেছেন? মূলতঃ একজন শিক্ষকের নিজস্ব চারিত্রিক গুণ, শিক্ষাপদ্ধতি ও তাঁর যাপিত জীবনের আদর্শই শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে উঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা যা বলেন তা নয় বরং যা করেন তা-ই শিক্ষার্থীদের মনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।  ভাবতে কষ্ট হয়, যে জাতির বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিকতার জায়গাটা তছনছ হয়ে যায়, সে জাতি কত দিনে আলোর সন্ধান পাবে আমাদের জানা নেই।                                                     লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক