রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে চার ব্যাংক

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের ওপরই নির্ভর করতে হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে। বছরের পর বছর ব্যাংকগুলোকে মূলধনের জোগানও দিয়ে আসছে সরকার। তবে মূলধনের জন্য সরকারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা। এরই অংশ হিসেবে সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক চারটি। এক ব্যাংকের ছাড়া বন্ড কিনবে অন্য ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণ হবে বলে মনে করছে ব্যাংকগুলো।
জানা গেছে, পর্ষদের অনুমোদনসাপেক্ষে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বন্ড ছাড়বে সোনালী ব্যাংক। জনতা ব্যাংক ছাড়বে ৭০০ কোটি ও রূপালী ব্যাংক ৬০০ কোটি টাকার বন্ড। মূলধন ঘাটতি মেটাতে অগ্রণী ব্যাংক এরই মধ্যে ৬০০ কোটি টাকার বন্ড ছেড়েছে। এ বন্ড কিনে নিয়েছে জনতা ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, মূলধনের জোগান দিতে চারটি ব্যাংকের ছাড়া বন্ড নিজেরাই কিনবে। এক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের বন্ড কিনবে অগ্রণী ব্যাংক, অগ্রণীর বন্ড কিনবে জনতা ব্যাংক আর জনতার বন্ড কিনবে সোনালী ব্যাংক। এছাড়া রূপালীর ছাড়া বন্ড সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক সমহারে কিনে নেবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে কেবল রূপালী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আতাউর রহমান প্রধান বণিক বার্তাকে বলেন, বন্ড ছেড়ে মূলধন সংস্থানের বিষয়টি নিয়ে চারটি ব্যাংকের এমডি পর্যায়ে কথা হয়েছে। বোর্ডসভায় অনুমোদন হলে তবেই সেটি কার্যকর হবে। প্রাথমিকভাবে রূপালী ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রূপালীর ছাড়া বন্ড বাকি তিনটি ব্যাংক কিনে নেবে।
প্রাথমিকভাবে জনতা ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বন্ড কিনবে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, বিদায়ী বছরের খেলাপি ঋণসহ ব্যাংকের অন্যান্য হিসাবায়ন এখনো শেষ হয়নি। চূড়ান্ত হিসাবে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দিলে তবেই জনতা ব্যাংক মার্চ নাগাদ সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যু করবে। বিদায়ী বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে ছিল সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির ২০১৭ সালের মূলধন ঘাটতিসহ চূড়ান্ত হিসাবায়ন শেষ করতে মার্চ পর্যন্ত সময় লাগবে। এ কারণে কত টাকার বন্ড ছাড়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসেনি ব্যাংকটি। তবে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের বন্ড ছাড়া হবে বলে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ছাড়া বন্ড অগ্রণী ব্যাংক কিনবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের বেসরকারি সব ব্যাংকের বন্ড কিনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এতদিন মূলধন জোগান দিয়ে আসছে। অথচ আমরা নিজেরাই অনেক দিন ধরে মূলধন ঘাটতিতে আছি। ঘাটতি পূরণে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এরই মধ্যে আবেদন করেছি। তবে এখন আমরা মূলধন জোগাতে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি কার্যকর হলে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকই মূলধন ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। মূলধন ঘাটতি মেটাতে আর সরকারের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ব্যাংকের মুনাফা থেকে পর্যায়ক্রমে বন্ডের টাকা পরিশোধ করে দেয়া হবে।
তবে অগ্রণী ব্যাংক এখনই বন্ড ছাড়বে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। ভবিষ্যতে মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকটি বন্ড ছাড়লে তা কিনে নেবে জনতা ব্যাংক। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ঘাটতি হতে পারে শঙ্কা থেকে আমরা আগেই বন্ড ছেড়ে ৬০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে ফেলেছি। অগ্রণী ব্যাংকের বন্ড জনতা ব্যাংক ও আইসিবি কিনে নিয়েছে। এজন্য অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন এ মুহূর্তে উদ্বৃত্ত রয়েছে। এখন অন্য চার ব্যাংকও একই পন্থায় নিজেদের মধ্য থেকে বন্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করতে চাইছে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে আমিও একমত। তবে ঘাটতি না থাকায় এখন আর অগ্রণী ব্যাংক বন্ড ছাড়বে না।
সূত্র বলছে, সোনালী ব্যাংক রূপালীর বন্ড কিনে আবার রূপালী ব্যাংক সোনালীর বন্ড কিনে মূলধন জোগান দেয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা আছে। অর্থাৎ মূলধন জোগান দেয়ার ক্ষেত্রে সবসময় ক্রস করা যায় না। এজন্য রূপালী ব্যাংক ৬০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়লে সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা করে সে বন্ড কিনবে। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকের বন্ড কিনবে জনতা ব্যাংক, জনতার বন্ড কিনবে সোনালী ব্যাংক এবং সোনালীর বন্ড কিনবে অগ্রণী ব্যাংক।
পারস্পরিক মূলধন জোগান দেয়ার পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার, বৃহৎ প্রকল্পে সমঝোতার ভিত্তিতে ঋণ প্রদানসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে এক প্লাটফর্মে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক চারটি। ব্যাংকগুলোর এমডিরা বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আর্থিক ভিত শক্ত হবে বলে মনে করছেন তারা। রূপালী ব্যাংকের এমডি এ বিষয়ে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রত্যেক ব্যাংকেরই নিজস্ব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা রয়েছে। খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে সম্মিলিতভাবে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের বড় অংশই স্বল্পসংখ্যক ব্যবসায়ী ও শিল্প গ্রুপের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। ঘুরে-ফিরে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহকরা প্রায় একই গ্রুপের। ব্যাংক চারটির শীর্ষ ঋণখেলাপিরাও প্রায় একই। এজন্য এ ব্যাংকগুলোর ঋণ বিকেন্দ্রীকরণের জন্য অনেক আগে থেকেই গভর্নর ফজলে কবির নির্দেশ দিয়ে আসছেন। ব্যাংকগুলোর এমডিরা বলছেন, চারটি ব্যাংক একই প্লাটফর্মে এলে শীর্ষ গ্রাহক ও খেলাপিদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া সহজ হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ