রিজার্ভের অর্থ চুরি আরসিবিসিকে দায়ী করার ভুল পথে হাঁটছে কি বাংলাদেশ?

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৮, ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নিউইয়র্ক ইউনিফর্ম কমার্শিয়াল কোডেই বলা আছে, কোনো ব্যাংক ধোঁকা খেয়ে চৌর্যবৃত্তির শিকার হলে ব্যাংকটি গ্রাহককে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। তবে পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রটোকলে পেমেন্ট মেসেজের যথার্থতা যাচাই হয়েছে প্রমাণ করতে পারলে ব্যাংক গ্রাহককে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য নয়।
নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে বাংলাদেশের করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং চুক্তি রয়েছে। শুরু থেকেই ব্যাংকটি বলে আসছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে পেমেন্ট মেসেজ তারা পেয়েছিল, সুইফটের মাধ্যমে তা যাচাই করেই পাঠানো হয়েছিল। তিনটি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক ওয়েলস ফার্গো, সিটিব্যাংক ও ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলনের মাধ্যমে ওই অর্থ আরসিবিসিতে প্রবেশ করেছিল। এরপর তা শুধু ছাড় করে আরসিবিসি।
এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আরসিবিসির দায়বদ্ধতা কতটুকু, সে অস্পষ্টতা থাকছেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের আইনও এখানে কতটুকু প্রযোজ্য; পরিষ্কার নয় সেটাও। তাই রিজার্ভ চুরির জন্য তাদের দায়ী করার আইনি কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করছে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি)।
গত সোমবারও এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আরসিবিসি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে তা উল্লেখও করেছে। বিবৃতিতে আরসিবিসি দাবি করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির জন্য কোনো আইনেই আরসিবিসিকে দায়ী করা চলে না। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের যে নির্দেশনা, তা বাস্তবায়নে আরসিবিসির কোনো হাত ছিল না।
এ বিষয়ে মার্কিন আইনজীবীদেরও পরামর্শ নিয়েছে আরসিবিসি। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে ফিলিপাইনের ব্যাংকটি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মামলা হলে তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী ও বৈধ যুক্তি আরসিবিসির কাছে রয়েছে।
এ অবস্থায় আরসিবিসির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, আইনি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এর ভিত্তি রয়েছে কিনা সময় হলেই তা জানা যাবে।
বিশেষজ্ঞ ব্যাংকার ও আইনজীবীদের অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা হলে বিষয়টি নিয়ে শুনানি করার পাশাপাশি চুরি যাওয়া অর্থ আটকে রাখা নিয়ে ম্যানিলাভিত্তিক আরসিবিসির কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা প্রমাণ করতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক ল ফার্ম ফ্রেশফিল্ডস ব্রুকহাউজ ডেরিঞ্জার এলএলপির সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট পিটার জেফ রয়টার্সকে বলেন, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য অনেক ধরনের আইন রয়েছে। যেগুলো এখানে কার্যকর হতেও পারে, আবার নাও পারে।
তার ভাষ্য, আরসিবিসি নিজে কিন্তু হ্যাকিংয়ের শিকার হয়নি। অনেকেই মনে করতে পারেন, ব্যাংকটি যখন দেখল, তার অ্যাকাউন্টগুলো দিয়ে এ অর্থ আসছে, তখন হয়তো আরসিবিসির ভিন্ন কিছু করা উচিত ছিল। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে বিষয়টি আর সাইবার নিরাপত্তার ইস্যুতে আটকে নেই। আমি মনে করি না, এক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা বা অধিকার নির্ধারণের জন্য সাইবার নিরাপত্তা আইনে (অথবা মার্কিন কমার্শিয়াল কোডে) নজর দেয়ার খুব একটা প্রয়োজন আছে।
রিজার্ভের অর্থ চুরির ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরসিবিসির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। সে দেশের আইনে এজন্য শাস্তিও পেতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অর্থদ-ে দ-িত হয়েছে আরসিবিসি। ২০১৬ সালেই রেকর্ড ১০০ কোটি পেসো (২ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ) জরিমানা গুনতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষপর্যায়েও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে এসব পরিপালন করলেও রিজার্ভ চুরির দায় নিতে নারাজ ব্যাংকটি। উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধেই প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ তুলেছে আরসিবিসি। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলার হুমকিও দিয়েছে তারা। সেই সঙ্গে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছে ব্যাংকটি। যদিও দুই বছর পেরোনোর পরও এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় অপরাধী চিহ্নিত করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি বাংলাদেশ।
আরসিবিসির ভাষ্য হলো, নিউইয়র্ক ফেড ও ফিলিপাইন সরকার চেয়ে পাঠানোর পরও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক, যা সন্দেহজনক। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আরসিবিসির লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান অ্যাটর্নি জর্জ দে লা কুয়েস্তা বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যতদিন প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য চলমান বৈশ্বিক প্রয়াসে সহযোগিতায় অস্বীকৃতি জানিয়ে যাবে, ততদিন এ সন্দেহ থেকেই যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরসিবিসির কাছে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত চাওয়ার জবাবে দে লা কুয়েস্তা বলেছিলেন, এর কোনো আইনি ও বাস্তব ভিত্তি নেই। যদি আপনাদের নিজেদের লোকই এ অর্থ চুরি করে, তাহলে আমাদের কাছে তা ফেরত চাইছেন কেন? আসলে আমরা এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার শিকার।
জালিয়াতির মাধ্যমে রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়টি জানাজানি হতেই নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হুমকি দেয় বাংলাদেশ। যদিও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। এমনকি চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এখন শুধু আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলার কথা বলা হচ্ছে।
আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলার জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। এরই মধ্যে আরসিবিসিকে জরিমানা করেছে ফিলিপাইন সরকার। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও দায়ী করা হয়েছে। ফলে এ ঘটনায় ব্যাংকটির অসৎ উদ্দেশ্য যে ছিল, সেটা প্রমাণিত। এসব বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে মামলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা