রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সোনালী ব্যাংক ছাড়া ব্যবসা করছে সবাই

আপডেট: মে ১৪, ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


অর্থের হিসাবে দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) দলিলে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়ের প্রকল্পটি ঘিরে ব্যবসা করছে রাশিয়া। প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতার নামে যুক্ত আছে ভারতও। নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আমদানিকৃত প্রযুক্তির পাশাপাশি লাগছে রড, সিমেন্ট, বালিসহ নানা উপকরণ। এসব সরবরাহের মাধ্যমে সবাই ব্যবসা করলেও ব্যতিক্রম কেবল সোনালী ব্যাংক। লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে এক টাকাও আয় নেই ব্যাংকটির। যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীদার সোনালী ব্যাংক সরঞ্জাম আমদানিতে এরই মধ্যে ৯৪ হাজার কোটি টাকার ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে।
সাধারণ ক্ষেত্রে আমদানি পণ্যের ঋণপত্রের জন্য প্রতি ত্রৈমাসিকে (৯০ দিন) ৪০ পয়সা কমিশন পায় ব্যাংকটি। এ হিসাবে ৯৪ হাজার কোটি টাকার এলসির জন্য প্রতি ত্রৈমাসিকে সোনালী ব্যাংকের ৩৭৬ কোটি টাকা কমিশন পাওয়ার কথা। ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলমান এ প্রকল্পের এলসির জন্য সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৫৫৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা কমিশন পেত সোনালী ব্যাংক। যদিও ব্যাংকটিকে এখন পর্যন্ত এ বাবদ কোনো অর্থই পায়নি।
বিনা কমিশনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলসি খোলার দায়িত্ব কেন নিলেন? জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের যে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে, সেখানে আমাদের কোনো কথা বলার সুযোগ ছিল না। এলসির কমিশনের অর্ধেকও যদি আমরা পেতাম, তাহলে সোনালী ব্যাংক পূর্ণোদ্যমে সামনে এগোতে পারত। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। চুক্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার ব্যয় উল্লেখ করা হয়। এ অর্থের ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেবে রাশিয়া। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ জোগাবে সরকার। প্রকল্পে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহে স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে। আমদানি হয়েছে উল্লেখযোগ্য যন্ত্রপাতিও। এ যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খুলেছে সোনালী ব্যাংক কোনো কমিশন ছাড়াই।
বিনা কমিশনে সোনালী ব্যাংক রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলসি খোলার বিষয়টি জ্ঞাত নন বলে জানান অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কেউ আমার কাছে অভিযোগ কিংবা দাবির কথা জানায়নি। তবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সবসময় ব্যবসার জন্য কাজ করে না। অনেক সময় বিনা অর্থেও কেউ কেউ সুনাম কিংবা নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে।
শুধু রূপপুর নয়, সরকারি অন্যান্য খাতে এলসির কমিশনও সেভাবে পাচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় ব্যাংকটি। সোনালী ব্যাংক সূত্রমতে, ২০১৭ সালে ব্যাংকটি সরকারি খাতের (রূপপুর প্রকল্পসহ) এলসি খুলেছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার। প্রচলিত হারে কমিশন আদায় হলে এ থেকে আয় হতো ১১ হাজার ৬৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বিপরীতে মাত্র ৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা কমিশন পেয়েছে ব্যাংকটি। এ হিসাবে বিদায়ী বছরে সোনালী ব্যাংক সরকারি খাতের এলসি থেকে ১০ হাজার ৯৮১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা কমিশনবঞ্চিত হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সোনালী ব্যাংক সরকারি খাতের এলসি খুলেছে ৯ হাজার ৮৩১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। ব্যাংকটির প্রচলিত হারে কমিশন আদায় হলে এ থেকে ৭১ কোটি ৫১ লাখ টাকা আয় হতো। কিন্তু ব্যাংকটি কমিশন পেয়েছে মাত্র ১৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের প্রথম তিন মাসেই সোনালী ব্যাংক সরকারি প্রকল্প থেকে ৫২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কমিশন পায়নি।
ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যাংককে ব্যবসা করতে দেয়া উচিত বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রকল্প। একসঙ্গে এত বড় অংকের অর্থের বিনিয়োগ অতীতে বাংলাদেশে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ আছে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষই যখন ব্যবসা করছে, তখন সোনালী ব্যাংক কেন কমিশনবঞ্চিত হবে? সোনালী ব্যাংক একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এলসিকৃত অর্থের পরিমাণ বড় হওয়ায় কম কমিশনে এটি করা যেত। এক্ষেত্রে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারত।
হলমার্কসহ ছোট-বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে পড়া সোনালী ব্যাংকের গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে মন্দ মানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে ৭ হাজার ১৮২ কোটি টাকার ঋণ। খেলাপি ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে সোনালী ব্যাংক। মূলধন জোগান দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে ব্যাংকটি। যদিও সোনালী ব্যাংককে ২০১০-১৭ সাল পর্যন্ত বাজেটের অর্থ থেকে ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা জোগান দেয়া হয়েছে। রূপপুরসহ সরকারি এলসির কমিশন পেলে সোনালী ব্যাংকের কোনো মূলধন ঘাটতি থাকত না বলে মনে করেন মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ। তিনি বলেন, কোনো কমিশন ছাড়াই আমরা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯৪ হাজার কোটি টাকার এলসি খুলেছি। এর বাইরে সরকারি অন্যান্য প্রকল্পের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার এলসি নামমাত্র কমিশনে খোলা হয়েছে। বিপুল অর্থের এ এলসির কমিশন পেলে মূলধন ঘাটতি পূরণ করে সোনালী ব্যাংক হাজার কোটি টাকা মুনাফা করতে পারত। তিনি বলেন, বিনা মাশুলে সোনালী ব্যাংক সারা দেশে সরকারের ৩৭টি সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি আমাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় এনেছে। আশার কথা হলো, সোনালী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ