রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব রাজনীতি দ্বিধা-বিভক্ত কেন?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. সুলতান মাহমুদ রানা


দীর্ঘদিন থেকেই রোহিঙ্গা সমস্যাটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ মুহুর্তে যতগুলো রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কূটনৈতিক জটিলতা ও তৎপরতা বিদ্যমান আছে সেগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। এ সমস্যাটি শুধুমাত্র জাতীয় নয়। জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু। ক্রমেই এ সমস্যা আন্তর্জাতিক মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার মূলত দুটি দিক আছে। একটি মানবিক, অপরটি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট। রোহিঙ্গারা যে নিজ দেশে জাতিগত নিপীড়নের শিকার, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, বিতাড়িত করেনি। কিন্তু শরণার্থীদের সামগ্রিক বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে দেখভাল করার ন্যায্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে গভীর ষড়যন্ত্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে যথেষ্ট। সারা বিশ্বের কাছে এটি পরিস্কার যে, মিয়ানমার খনিজ সম্পদের অফুরন্ত সম্ভারের দেশ। ভৌগোলিকভাবেও এই দেশটি পরাশক্তির স্বার্থের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার প্রায় পুরোপুরি চিনের ছত্রছায়ায় এবং চিনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হচ্ছে। রাশিয়ার সাথেও তারা যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে। চিন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ায় মিয়ানমার ‘ডোন্ট কেয়ার’ স্টাইল অবলম্বন করছে। চিন ও রাশিয়া তাদের হাতে থাকলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো প্রস্তাবই জাতিসংঘে টিকবে না- এমন আত্মবিশ্বাসটাও তাদের রয়েছে। মিয়ানমার জান্তার এত বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটার পরও কতিপয় রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিশ্ব কিছুটা হলেও দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছে। এভাবে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমূহ পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থায় গেলে ক্রমেই এই ইস্যুটি আরো ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এই মুহুর্তে জাতিসংঘ যদি কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে না পারে তাহলে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতন কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে তা আন্দাজ করা মুশকিল। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অতীতের মতো এবারও বিশ্ব সম্প্রদায় ও প্রভাবশালী দেশগুলো বিভক্ত নিজ নিজ স্বার্থে। এ কারণে মিয়ানমারে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, এমনকি গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মতো ভয়াবহ অভিযোগ সত্ত্বেও তারা একে অগ্রাহ্য করছে।
রাখাইন রাজ্য ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের অবস্থানে চিন ও ভারত অনকেটা একাত্মতা রেখেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমার যেভাবে দেখছে, তারাও হয়তো সেভাবেই দেখছে। সঙ্গত কারণেই ভারত ও চিনের অবস্থানটি মিয়ানমারের পক্ষে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারত ও চিন বিশ্বের দুটি বড় শক্তি। আয়তনে, জনসংখ্যায় তো বটেই, এমনকি শক্তি-সামর্থ্যে, প্রভাব বিস্তারেও তারা সারা বিশ্বে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। বিশ্ব রাজনীতিতে এ দুটি দেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অঞ্চলে তারা ‘বড় ভাই’ হিসেবেই পরিচিত। রাষ্ট্র দুটি সবসময়ই নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্যের অংকটি ঠিক রাখার চেষ্টা করে। বিভিন্ন ইস্যুতে এই দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ঠাণ্ডা লড়াই বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অবস্থানে অনেক সময় অভিন্নতাও লক্ষ করা যায়। যেমনটি কিছুটা রোহিঙ্গা ইস্যুতে লক্ষ করছি। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চিনের অবস্থান এবং বাংলাদেশের অবস্থানে ভিন্নতা রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের যে অবস্থান সেই অবস্থান থেকে ভারত ও চিনের অবস্থান ভিন্ন। বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে ভারত ও চিন নেই। তবে ভারত ও চিন আছে না কি নেই এমন ধু¤্রজালও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট।
ভারত সরকার মনে করে, এই রোহিঙ্গারা তার দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়াতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার এরই মধ্যে অবৈধ রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কোনো অনুরোধ-আবেদনও তারা গায়ে মাখছে না। জাতিসংঘ বলেছিল, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দেওয়া যায় কি না, তা ভাবতে। ভারত এ ধরনের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য মনে করছে। উল্লেখ্য, রাখাইন রাজ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করছে ভারত। মিজোরাম থেকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত সড়ক বানানোর একটি পরিকল্পনাও ভারতের আছে। আমরা লক্ষ করছি, ভারত মিয়ানমার বিষয়ে যেকোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক, বিশেষ করে কোনো পক্ষ যেন সে অবস্থানকে ‘রোহিঙ্গাপন্থী’ বলে ব্যাখ্যা না করে।
এবার দেখা যাক চিনের অবস্থানটা। মিয়ানমারের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। কী সেনা আমল, কী গণতান্ত্রিক আমল, সব সময়ই এ সম্পর্ক অটুট ছিল। বলা যায়, মিয়ানমারের পরীক্ষিত বন্ধু চিন। মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যে দেশটির, তা হচ্ছে চিন। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩০ বছরে মিয়ানমারে চিনের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগ মিলিয়ে এর ধারেকাছেও নেই। উত্তর কোরিয়া হাজার অন্যায় করেও যেমন সমর্থন পায় চিনের, মিয়ানমারও তেমনি সব কাজে চিনের ভালোবাসা পেয়ে থাকে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একাধিকবার রাখাইন প্রদেশের অবস্থা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েও শুরু করতে পারেনি শুধু চিন ও রাশিয়ার বিরোধিতায়।
চিন বা ভারত তাদের স্বার্থে মিয়ানমারকে হয়তো এখনই কোনো চাপ দিতে রাজি হবে না। কিন্তু এই দেশ দুটি এটাও জানে যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশ যে বিপদের মধ্যে পড়েছে, তার কোনো দায় দেশটির নেই। মিয়ানমারকে সাম্প্রতিক সময়ে চিনের কূটনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার একাধিক কারণও রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফু এলাকায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় চিন। অবস্থান জোরদার করতে চায় ভারত মহাসাগরে। দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও দুই দেশের আলাপ-সালাপ হচ্ছে। অবশ্য ভারত প্রথম দিকে মিয়ানমারের প্রতি সরাসরি সমর্থন জানালেও সংকটের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে অবস্থান অস্পষ্টতায় রূপ নিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চলাকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। অং সান সুচির সঙ্গে মোদির বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দেবেন বলে ঘোষণা করলে মোদি তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়ে। রোহিঙ্গাদের ওপর এত অত্যাচার, নির্যাতন চলবে আর নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির হিসাবে চুপচাপ কিংবা কৌশলগত অবস্থানে কোনোভাইে ইতিবাচক রাজনীতির সাথে যায় না। ভারত ও চিন শক্ত অবস্থান নিলে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের বিদ্যমান মানসিকতা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনেকেই বাংলাদেশকে ভারত ও চিনের সাথে পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনায় নেমেছে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ অবশ্যই কোনো পক্ষ নয়, এটি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ইস্যু। বাংলাদেশের ভূমিকা এখানে কিছু বিপন্ন মানুষকে সহায়তা দেওয়া মানবিকতার, আশ্রয় দাতার। এর বাইরে বাংলাদেশ এখানে সম্পুর্ণ তৃতীয় পক্ষ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চিনের ভূমিকা যেমনটিই হোক না কেন মূলত বাংলাদেশের সাথে সার্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবেই জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, কিন্তু তারাও এ ইস্যুত চিন কিংবা মিয়ানমারের পাশেই থাকছে। ভারত ও চিন নিজস্ব স্বার্থ বা এজেন্ডা আমাদের অজানা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও বাংলাদেশের ভোগান্তির কথা একেবারেই ভুলে যাওয়াও তাদের উচিত হবে কিনা সেটি বিশেষ ভাবে ভাবতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

sultanmahmud.rana@gmail.com